
সংক্ষেপে
কোম্পানি বেতন না দিলে করণীয় শুরু হয় আইনটা জানা দিয়ে: শ্রম আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী মজুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের ৭ কর্মদিবসের মধ্যে বেতন দিতে হয়, আর মজুরির মেয়াদ এক মাসের বেশি হতে পারে না। মানে অক্টোবরের বেতন নভেম্বরের প্রথম ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়ার কথা।
সময়মতো না পেলে লিখিতভাবে চান, প্রমাণ গুছিয়ে রাখুন, তারপর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ নম্বরে অভিযোগ করুন। শেষ পথ শ্রম আদালত, যেখানে ১২ মাসের মধ্যে দরখাস্ত করলে বকেয়ার সঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫% ক্ষতিপূরণের আদেশ হতে পারে।
হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ আর অনলাইনে অভিযোগ পাঠানোর লিংক অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে আছে।
এই লেখায়
১. বেতন কবের মধ্যে দিতে হয়: আইন যা বলে
শ্রম আইনের ১২১ ধারায় প্রত্যেক মালিক তাঁর নিযুক্ত শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের জন্য দায়ী। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ হলেও ঠিকাদার টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠানের মালিককে দিতে হবে। এরপর সময়ের নিয়ম:
| পরিস্থিতি | সময়সীমা | আইনের জায়গা |
|---|---|---|
| মজুরির মেয়াদ | এক মাসের বেশি নয় | ধারা ১২২(২) |
| নিয়মিত মাসের বেতন | মেয়াদ শেষের পরের ৭ কর্মদিবসের মধ্যে | ধারা ১২৩(১) |
| চাকরি শেষ হলে (অবসর, ছাঁটাই, ডিসচার্জ, অপসারণ, ইস্তফা বা অন্য কারণে) | ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে | ধারা ১২৩(২), ২০১৩ সালের সংশোধনসহ |
১২০ ধারায় মজুরির সংজ্ঞাও বড়। চুক্তি অনুযায়ী বোনাস, ছুটি বা অধিকাল কাজের পারিশ্রমিক, আর চাকরি অবসানের কারণে প্রাপ্য টাকাও এই অধ্যায়ের মজুরির মধ্যে পড়ে। তাই এই নিয়ম শুধু মূল বেতনে আটকে নেই।
২. কোম্পানি বেতন না দিলে প্রথমে কী করবেন
রাগ করে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আগে কাগজ গুছিয়ে নিন। পরে অভিযোগ বা মামলায় প্রমাণই আপনার শক্তি।
- ১লিখিতভাবে বেতন চানমানবসম্পদ বিভাগ বা ব্যবস্থাপকের কাছে তারিখসহ চিঠি বা ইমেইল দিন: কোন মাসের কত টাকা বাকি আর কবে পাওয়ার কথা ছিল। গ্রহণের কপি রাখুন।
- ২প্রমাণ জমা করুননিয়োগপত্র, আগের মাসগুলোর বেতনের স্লিপ বা ব্যাংকে টাকা ঢোকার রেকর্ড, হাজিরার কার্ড আর অফিসের সঙ্গে বেতন নিয়ে কথাবার্তার মেসেজ রেখে দিন।
- ৩সহকর্মীদের খোঁজ নিনএকাধিক শ্রমিকের বেতন আটকে থাকলে একসঙ্গে লিখিত আবেদন দিন। প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে তাদের জানান।
- ৪হেল্পলাইনে অভিযোগ করুনকলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭, সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা। প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, কত জনের কত মাসের বেতন বাকি, গুছিয়ে বলুন। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে অনলাইনে অভিযোগ পাঠানোর লিংকও আছে।
- ৫শ্রম আদালতে যানসমাধান না হলে শ্রম আদালতে দরখাস্ত করুন। নিচের অংশে সময়সীমা আর নিয়ম দেওয়া আছে।
অধিদপ্তরের পরিদর্শকেরা কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে আইন মানা হচ্ছে কি না দেখেন। হেল্পলাইনে আসা অভিযোগের প্রতিবেদনও তারা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। কত দিনে সমাধান হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময় সেখানে লেখা নেই।
হেল্পলাইনে ফোন করার আগে লিখে রাখুন
৩. শ্রম আদালতে বেতনের মামলা: কে, কবে, কোথায়
১৩২ ধারা বলছে, আইন ভেঙে মজুরি থেকে টাকা কাটা হলে, মজুরি না দিলে বা দেরিতে দিলে, কিংবা গ্র্যাচুইটি বা ভবিষ্য তহবিলের টাকা দিতে দেরি করলে শ্রমিক শ্রম আদালতে দরখাস্ত করতে পারেন। শ্রমিক মারা গেলে তাঁর উত্তরাধিকারী বা আইনসম্মত প্রতিনিধিও পারেন। ২০২৬ সালের সংশোধনে এই তালিকায় পরিদর্শকও যোগ হয়েছেন।
- দরখাস্ত করতে হয় সেই শ্রম আদালতে, যার এলাকায় আপনি কাজ করতেন বা যেখানে আপনাকে বেতন দেওয়া হতো।
- সময়সীমা ১২ মাস: টাকা কাটার তারিখ, অথবা মজুরি যেদিন দেওয়ার কথা ছিল সেদিন থেকে। যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে পারলে আদালত দেরির দরখাস্তও নিতে পারে।
- আদালত দুই পক্ষকে শুনে বকেয়া পরিশোধের আদেশ দেবে, সঙ্গে বকেয়ার সর্বোচ্চ ২৫% পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
- দেরির কারণ সৎ ভুল, প্রকৃত বিরোধ বা মালিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরের জরুরি অবস্থা হলে এই ক্ষতিপূরণের আদেশ না-ও হতে পারে।
- এই আদেশ মালিকের বিরুদ্ধে আইনের অন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে বাধা দেয় না।
মামলার কাগজ সাজাতে একজন শ্রম আইনজীবীর সাহায্য নিন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে অসচ্ছল মানুষ বিনা খরচে আইনি সহায়তা চাইতে পারেন।
৪. চাকরি ছাড়ার পর শেষ বেতন না দিলে
অনেক প্রতিষ্ঠান ইস্তফার পর শেষ মাসের বেতন আর পাওনা আটকে রাখে, বলে ক্লিয়ারেন্স হয়নি। আইনে দুটি জায়গায় সময় বাঁধা আছে: ১২৩(২) ধারায় মজুরি ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে, আর ৩০ ধারায় সব চূড়ান্ত পাওনা চাকরি ছেদ ঘটার পর সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে। অফিসের জিনিস ফেরত দিয়ে লিখিত প্রমাণ রাখলে টাকা আটকানোর অজুহাত কমে যায়।
দাবি করার সময় যা হাতে রাখবেন
বেতন না পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলে মনে রাখুন, ইস্তফার নোটিশের নিয়ম তখনও খাটে। স্থায়ী শ্রমিকের ৬০ দিন, অস্থায়ীর ৩০ বা ১৪ দিন। নোটিশ ছাড়া চলে গেলে মালিক নোটিশের মেয়াদের মজুরি কেটে নিতে পারেন। তবে আগের মাসগুলোর বকেয়া বেতন চাকরি ছাড়লেও মাফ হয়ে যায় না, ১২ মাসের মধ্যে শ্রম আদালতে দাবি করা যায়।
৫. কারা এই আইনের সুরক্ষা পান
শ্রম আইন প্রযোজ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য। ২০২৬ সালের সংশোধনে শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে বাদ শুধু তাঁরা, যাঁদের লিখিতভাবে ব্যবস্থাপনা, প্রধান নির্বাহী, ব্যবস্থাপক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন চলে আলাদা বিধিতে। আপনি কোন দলে পড়েন নিশ্চিত না হলে নিয়োগপত্রের পদবি আর দায়িত্বের বিবরণ দেখিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
শ্রম আইন অনুযায়ী বেতন কত তারিখের মধ্যে দিতে হয়?
বেতন না দিলে শ্রম আইনে কী শাস্তি?
বেতনের অভিযোগ কোন নম্বরে করব?
কত দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা করতে হয়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।