
সংক্ষেপে
সাধারণ কারণে জিপিএফ থেকে অগ্রিম নিলে সর্বোচ্চ পাবেন তিন মাসের বেতন অথবা জমা টাকার অর্ধেক, যেটি কম। বাড়ি কেনা বা বানানোর জন্য সীমা বেশি, ৩৬ মাসের বেতন অথবা জমার ৮০%, যেটি কম। ৫২ বছর বয়স হলে জমার ৮০% পর্যন্ত অফেরতযোগ্য অগ্রিম নেওয়া যায়, যা আর ফেরত দিতে হয় না।
ফেরতযোগ্য অগ্রিম বেতন থেকে সমান মাসিক কিস্তিতে কাটা হয়, কিস্তির সংখ্যা সাধারণত ১২টির কম নয় আর ৫০টির বেশি নয়। আবেদন করতে হয় নিজের অফিসে, নির্ধারিত ফরমে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতামতসহ।
প্রধান হিসাবরক্ষণ অফিসের সাইটে জিপিএফ আইন, ফরম আর প্রশ্নোত্তর পাওয়া যায়।
এই লেখায়
১. জিপিএফ অগ্রিম কোন কোন কাজে নেওয়া যায়
সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বিধিমালা, ১৯৭৯ এর বিধি ১৩ তে অগ্রিমের কারণগুলো নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট হতে হয় যে আপনার আর্থিক অবস্থায় অগ্রিম দরকার, আর টাকাটা এই কাজগুলোর কোনোটিতেই খরচ হবে।
- নিজের বা নির্ভরশীল কারও দীর্ঘ অসুস্থতার খরচ। নির্ভরশীল বলতে পরিবারের সদস্য, বাবা-মা, নাবালক ভাই, অবিবাহিত বোন বোঝায়।
- স্বাস্থ্য বা শিক্ষার কারণে নিজের বা নির্ভরশীলের বিদেশযাত্রার খরচ।
- ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিতে আপনার ওপর বর্তানো বিয়ে, দাফন বা অনুষ্ঠানের খরচ।
- জীবনবিমার প্রিমিয়াম।
- বসতবাড়ির জমি কেনা, বাড়ি বানানো, কেনা বা মেরামত, কিংবা এসব কাজে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণ শোধ।
- মুসলিম চাঁদাদাতার প্রথমবার হজের খরচ।
- মুসলিম চাঁদাদাতার স্ত্রীর দাবি করা বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ, শর্তসাপেক্ষে।
দেনমোহরের অগ্রিমে শর্ত কড়া। আগে একবার বিয়ের খরচে অগ্রিম নিয়ে থাকলে পরে আর দেনমোহরের জন্য পাবেন না। নির্ধারিত দেনমোহরের অঙ্কের প্রমাণ দিতে হয়, আর টাকা তোলার এক মাসের মধ্যে পরিশোধের প্রমাণ না দিলে পুরো অগ্রিম একবারে কেটে নেওয়া হয়।
২. জিপিএফ অগ্রিম কত টাকা পাবেন
| অগ্রিমের ধরন | সর্বোচ্চ সীমা |
|---|---|
| সাধারণ অগ্রিম | তিন মাসের বেতন অথবা জমার অর্ধেক, যেটি কম |
| বিশেষ বিবেচনায়, লিখিত কারণসহ | জমার ৭৫% পর্যন্ত, একসঙ্গে সর্বোচ্চ তিনটি অগ্রিম |
| বাড়ি বানানো বা কেনা | ৩৬ মাসের বেতন অথবা জমার ৮০%, যেটি কম |
| বসতবাড়ি মেরামত | ১২ মাসের বেতন অথবা জমার ৭৫%, যেটি কম |
| ৫২ বছরের পর অফেরতযোগ্য অগ্রিম | প্রতিবার জমার ৮০% পর্যন্ত |
একটা হিসাব দেখি। নাসরিনের মূল বেতন ৩০,০০০ টাকা, জিপিএফে জমা ২,০০,০০০ টাকা। তিন মাসের বেতন হয় ৯০,০০০ টাকা, জমার অর্ধেক ১,০০,০০০ টাকা। দুটোর মধ্যে কম যেটি, অর্থাৎ ৯০,০০০ টাকা পর্যন্ত সাধারণ অগ্রিম পেতে পারেন। বাড়ি বানানোর জন্য হলে সীমা হতো ৩৬ মাসের বেতন ১০,৮০,০০০ অথবা জমার ৮০% মানে ১,৬০,০০০, তাই ১,৬০,০০০ টাকা।
বিধিমালায় বেতন বলতে চাকরির বিধিতে যে বেতনের সংজ্ঞা আছে সেটাই বোঝানো হয়েছে। অঙ্ক ঠিক করার সময় মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষকে আপনার জিপিএফ স্থিতি বিবেচনায় নিতে হয়, আর মঞ্জুরির আদেশে কারণ লিখতে হয়। তাই আবেদনের আগে হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে হালনাগাদ স্থিতি জেনে নিলে চাওয়া অঙ্কটা বাস্তবসম্মত হয়।
মঞ্জুরির মাসের আগের তিন মাসের চাঁদা জমার হিসাবে ধরা হয় না। তাই ব্যালেন্স দেখে যে অঙ্ক ভাবছেন, অগ্রিমের হিসাব তার চেয়ে কিছুটা কম জমা ধরে হতে পারে।
৩. জিপিএফ অগ্রিম উত্তোলনের আবেদন যেভাবে করবেন
- ১নিজের অফিসে আবেদনবিধিমালার তৃতীয় তফসিলের ফরমে আবেদন লিখুন। আবেদন যায় আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে, তিনি অগ্রিমের প্রয়োজন আর কত টাকা দরকার সে বিষয়ে মতামত লেখেন।
- ২প্রমাণ জুড়ে দিনকারণের পক্ষে কাগজ থাকলে সঙ্গে দিন, যেমন চিকিৎসার কাগজ বা হজের নিবন্ধন। বাড়ির অগ্রিমে জমি বা বাড়ির মালিকানা মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হয়, বিধিমালায় এটা বাধ্যতামূলক।
- ৩মঞ্জুরিনন-গেজেটেড কর্মচারীর সাধারণ অগ্রিম মঞ্জুর করেন অফিস প্রধান, গেজেটেড কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধান। বাড়ির অগ্রিম আর বিশেষ বিবেচনার অগ্রিম মঞ্জুর করেন তার পরের ধাপের কর্তৃপক্ষ। অফেরতযোগ্য অগ্রিম বিভাগীয় প্রধানের নিচের কেউ মঞ্জুর করতে পারেন না।
- ৪বিল যায় হিসাবরক্ষণ অফিসেমঞ্জুরির পর আপনার দপ্তর জিপিএফ অগ্রিমের বিল হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠায়। হিসাবরক্ষণ অফিস আপনার জিপিএফ হিসাবের পাতায় নোট রেখে টাকা পরিশোধ করে।
বাড়ি বানানোর অগ্রিম সাধারণত কিস্তিতে তোলা হয়, প্রতিটি কিস্তি পরের তিন মাসের খরচের মতো। পুরো টাকা একসঙ্গে লাগবে বলে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে এক কিস্তিতেও দেওয়া যায়। ব্যক্তিগত ঋণ শোধের অগ্রিম পেতে হলে ঋণটি আবেদনের ১২ মাসের মধ্যে নেওয়া হতে হবে।
৪. কিস্তিতে ফেরত আর সুদের হিসাব
- ফেরতযোগ্য অগ্রিম কাটা হয় সমান মাসিক কিস্তিতে। কিস্তির সংখ্যা ১২টির কম হয় না, যদি না আপনি নিজে কম চান, আর কোনো অবস্থাতেই ৫০টির বেশি নয়।
- চাইলে এক মাসে একাধিক কিস্তি শোধ করা যায়।
- বাড়ি বানানোর অগ্রিম কাটা শুরু হয় টাকা তোলার পর ১২তম বেতন থেকে, বেতনের ১০% হারে।
- ছুটিতে থাকার সময় আপনার সম্মতি ছাড়া কিস্তি কাটা হয় না।
- আসল শোধ হওয়ার পর বিধিমালার পাঠ অনুযায়ী বছরে ৫% হারে সুদ দিতে হয়, সাধারণত পরের মাসে এক কিস্তিতে।
দ্বিতীয় অগ্রিম নিয়েও নিয়ম আছে। প্রথম অগ্রিম সুদসহ পুরো শোধের এক বছরের মধ্যে বিশেষ বিবেচনা ছাড়া দ্বিতীয় অগ্রিম মেলে না। তবে প্রথমবার পুরো প্রাপ্য টাকা না নিয়ে থাকলে প্রথম অগ্রিম চলাকালেই দ্বিতীয়টি নেওয়া যায়, একই সীমার মধ্যে। প্রধান হিসাবরক্ষণ অফিসের প্রশ্নোত্তরে বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ৪টি অগ্রিম নেওয়ার সুযোগ আছে, আর ৫২ বছর পূর্ণ হলে অফেরতযোগ্য অগ্রিমের সংখ্যা নির্দিষ্ট নেই। বিধিমালার সংখ্যার সঙ্গে এই ব্যাখ্যার পার্থক্য আছে, তাই নিজের হিসাবরক্ষণ অফিসে চলতি নিয়মটা জেনে নিন।
৫. ৫২ বছরের পর জিপিএফ অফেরতযোগ্য অগ্রিম উত্তোলন
৫২ বছর পূর্ণ হলে যেকোনো সৎ উদ্দেশ্যে, কৃষিজমি কেনাসহ, জমার ৮০% পর্যন্ত অফেরতযোগ্য অগ্রিম নেওয়া যায়। এই টাকা বেতন থেকে কাটা হয় না, অবসরের সময় চূড়ান্ত পরিশোধের অংশ হিসেবে ধরা হয়। প্রতিবার সেই সময়ের জমার ৮০% সীমায় একাধিকবারও নেওয়া যায়।
আগে নেওয়া ফেরতযোগ্য অগ্রিমের বাকি টাকাও ৫২ বছরের পর চাইলে অফেরতযোগ্য অগ্রিমে বদলে নেওয়া যায়। তখন বাকি কিস্তি আর কাটা হয় না। মনে রাখবেন, এতে অবসরের সময় হাতে পাওয়া চূড়ান্ত টাকা ততটাই কমে যায়।
অবসরে পুরো জিপিএফ তোলার জন্য আলাদা আবেদন লাগে, ৬৬৩ নম্বর ফরমে। হিসাবরক্ষণ অফিস সুদ ও আসল হিসাব করে অথরিটি দেয়, তারপর আপনার দপ্তর মঞ্জুরিসহ বিল পাঠালে টাকা পরিশোধ হয়।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জিপিএফ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা অগ্রিম নেওয়া যায়?
জিপিএফ অগ্রিম কত কিস্তিতে ফেরত দিতে হয়?
অগ্রিমের টাকা কি একবারে চালানে জমা দিয়ে শোধ করা যায়?
জিপিএফ অফেরতযোগ্য অগ্রিম উত্তোলন কখন করা যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।