
সংক্ষেপে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি, মানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের পরিচিতি পাতায় লেখা, জাতীয় সংসদের ১৯৯২ সালের ৩৭ নম্বর আইনে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর এটি প্রতিষ্ঠিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রধান কার্যালয় গাজীপুরের বোর্ডবাজারে।
বিভ্রান্তি তৈরি হয় অধিভুক্ত কলেজ নিয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২,২৫৭টি কলেজ ও প্রতিষ্ঠান, এর মধ্যে সরকারি ৫৫৫, বেসরকারি ১,৩৬১, অন্যান্য ৩৪১। কলেজ বেসরকারি হতে পারে, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা, ফল আর সনদ দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজে। তাই সরকারি কলেজ আর বেসরকারি কলেজের অনার্স সনদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
প্রতিষ্ঠার আইন, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষার্থীর হিসাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের পাতায়।
এই লেখায়
১. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
হ্যাঁ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে, কোনো ট্রাস্ট বা উদ্যোক্তার মালিকানায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তেমন নয়। এটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নিজস্ব আইনে গড়া, যাকে বলা হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত ইতিহাসেও লেখা, এটি সংসদের আইনে প্রতিষ্ঠিত একটি অধিভুক্তকারী বিশ্ববিদ্যালয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকি করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এর বাইরে নয়। ইউজিসির বার্ষিক হিসাবে অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের তুলনা আসে। ২০২০ সালে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে এসেছিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি বছরে ব্যয় মাত্র ৭৪১ টাকা।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠা | ২১ অক্টোবর ১৯৯২, জাতীয় সংসদের ১৯৯২ সালের ৩৭ নম্বর আইনে |
| ধরন | পাবলিক, অধিভুক্তকারী বিশ্ববিদ্যালয় |
| প্রধান ক্যাম্পাস | বোর্ডবাজার, গাজীপুর, ২০.৫৪ একর |
| আঞ্চলিক কেন্দ্র | চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে ৬টি অস্থায়ী কেন্দ্র |
| শিক্ষার্থী | ৩৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৩২ জন |
আকারে এটি দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে শিক্ষার্থী ৩৪ লাখের বেশি, তবে ক্যাম্পাসে শিক্ষক মাত্র ৮২ জন। কারণ স্নাতক আর স্নাতকোত্তর পাঠদান হয় সারা দেশের কলেজে। গাজীপুরের মূল ক্যাম্পাসে সীমিত পরিসরে এমফিল, পিএইচডি আর এমএএস প্রোগ্রাম চলে।
২. কলেজ বেসরকারি, বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি: তফাতটা কোথায়
ধরুন রুমানা পড়েন জেলা শহরের একটি বেসরকারি কলেজে, অনার্সে। তাঁর বন্ধু পড়েন একটি সরকারি কলেজে। দুজনেরই রেজিস্ট্রেশন কার্ড, প্রবেশপত্র আর নম্বরপত্র দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পরীক্ষা হয় একই রুটিনে, একই প্রশ্নে, খাতা দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ করা পরীক্ষক। শেষে মূল সনদে নামও থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের।
তফাতটা পড়ার পরিবেশ আর খরচে। সরকারি আর বেসরকারি কলেজে বেতন, ভর্তির খরচ, শিক্ষক আর ক্লাসের সুবিধা আলাদা হতে পারে। কিন্তু সনদের মূল্য বা ধরন কলেজের মালিকানায় বদলায় না।
- ১রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেখুনঅনার্সে ভর্তির পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেয়। কার্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, আপনার কলেজ, বিষয় আর শিক্ষাবর্ষ থাকে।
- ২ফল কোথায় আসে মিলিয়ে নিনঅনার্সের ফল প্রকাশ হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল সাইটে, কলেজের সাইটে নয়। রোল আর রেজিস্ট্রেশন দিয়ে নিজের ফল খুঁজে দেখুন।
- ৩সনদ তুলবেন কার কাছ থেকেসাময়িক সনদ, মূল সনদ আর ট্রান্সক্রিপ্টের আবেদন হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে, কলেজের মাধ্যমে। কলেজ নিজে কোনো স্নাতক সনদ দেয় না।
- সরকারি কলেজ: ৫৫৫টি
- বেসরকারি কলেজ: ১,৩৬১টি
- অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: ৩৪১টি
- মোট অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান: ২,২৫৭টি
ভর্তির আগে দেখে নিন কলেজটি আপনার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কি না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ওয়েবসাইটে শুধু অধিভুক্ত কলেজ আর বিষয়ই আবেদনের তালিকায় আসে। তালিকার বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করবেন না।
৩. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের ভেতরে প্রশ্নটার উত্তর সহজ। সংসদের আইনে গড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিয়ে স্নাতক চাওয়া সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়, স্নাতক ডিগ্রি আর শ্রেণি বা সিজিপিএ চাওয়া হয়। তাই আবেদনের আগে বিজ্ঞপ্তির শ্রেণি বা সিজিপিএর শর্ত মিলিয়ে নেওয়াই আসল কাজ।
বিদেশের বেলায় হিসাব দেশভেদে আলাদা। কোনো দেশ নিজস্ব তালিকা বা ডেটাবেস দেখে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মূল্যায়ন করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজের পাতায় এমন কোনো দেশভিত্তিক তালিকা দেয় না। তাই যে দেশে পড়তে বা কাজে যেতে চান, সেই দেশের দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি দপ্তর থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
সত্যায়নের কথা আসে বিদেশে আবেদনের সময়। দেশের ভেতরে চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় সাধারণত মূল সনদ আর নম্বরপত্র দেখানোই যথেষ্ট। বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা নিয়োগকর্তা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সরাসরি সনদ যাচাই চাইতে পারে, তাই নিজের রোল, রেজিস্ট্রেশন আর পাসের সাল একটি কাগজে লিখে রাখুন, আর সব সনদের স্ক্যান কপি ফোনে ও ইমেইলে রেখে দিন।
বিদেশে আবেদনের আগে হাতে রাখুন
৪. ইউজিসির সঙ্গে মতবিরোধ কেন হয়েছিল
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ মূলত কলেজের মাধ্যমে। ২০২৩ সালে গাজীপুরের মূল ক্যাম্পাসে কয়েকটি অনার্স প্রোগ্রামে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দিলে ইউজিসি তা স্থগিত করতে বলে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে এসেছিল, ইউজিসির মতে আইনের ৮(১) ধারায় ডিগ্রির পাঠদান সাধারণত কলেজের মাধ্যমে হওয়ার কথা, আর মূল ক্যাম্পাসের প্রধান কাজ অধিভুক্ত কলেজ তদারকি আর এমফিল-পিএইচডি গবেষণা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তি ছিল আইনের ৪১(১) ধারায় ভর্তির নিয়ম ঠিক করার ক্ষমতা তার একাডেমিক কাউন্সিলের। এই বিতর্ক থেকেও বোঝা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি আইনে চলা প্রতিষ্ঠান, আর ইউজিসি অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই এর কোর্স ও কার্যক্রম দেখে।
নামের মিলেও কেউ কেউ গুলিয়ে ফেলেন। ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, এর ভর্তি হয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গাজীপুরের এই অধিভুক্তকারী বিশ্ববিদ্যালয়কেই বোঝায়।
সব মিলিয়ে উত্তরটা এক লাইনে: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি, সংসদের আইনে চলে, ইউজিসির তদারকিতে থাকে। আপনার কলেজ সরকারি হোক বা বেসরকারি, অনার্স বা ডিগ্রির সনদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের, একই মর্যাদার। কলেজ বাছাইয়ের সময় তাই মালিকানার চেয়ে বিষয়ের অধিভুক্তি, শিক্ষক আর যাতায়াতের সুবিধা বেশি গুরুত্ব দিন।
৫. অনেকে যা জানতে চান
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি সরকারি নাকি বেসরকারি?
বেসরকারি কলেজ থেকে অনার্স করলে কি সনদ আলাদা হয়?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি ইউজিসি অনুমোদিত?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ কি বিদেশে চলে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।