
সংক্ষেপে
শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরিসহ ছুটি মূলত পাঁচ রকম: বছরে ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, ১৪ দিন পীড়া ছুটি, কাজের দিনের হিসাবে অর্জিত বা বাৎসরিক ছুটি, ১৩ দিন উৎসব ছুটি আর নারী শ্রমিকের প্রসূতি ছুটি। সাপ্তাহিক ছুটি আলাদা ধারায় আসে।
১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর সংশোধনী আইনে উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বেড়ে ১৩ দিন হয়েছে, আর প্রসূতি কল্যাণ সুবিধার মেয়াদ হয়েছে প্রসবের আগে ৬০ দিন ও পরে ৬০ দিন।
২০০৬ সালের মূল আইন আর ২০১৩, ২০১৮, ২০২৬ সালের সংশোধনী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন পাতায় আছে।
এই লেখায়
১. শ্রম আইন অনুযায়ী ছুটি কত প্রকার ও কি কি
| ছুটি | কত দিন | মূল শর্ত |
|---|---|---|
| নৈমিত্তিক ছুটি (ধারা ১১৫) | পঞ্জিকা বছরে ১০ দিন, পূর্ণ মজুরিতে | জমে না, পরের বছরে নেওয়া যায় না; চা-বাগানের শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য নয় |
| পীড়া ছুটি (ধারা ১১৬) | পঞ্জিকা বছরে ১৪ দিন, পূর্ণ মজুরিতে | রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রত্যয়ন লাগে; জমে না |
| অর্জিত বা বাৎসরিক ছুটি (ধারা ১১৭) | কাজের দিনের হিসাবে, নিচের ছকে | এক বছর অবিচ্ছিন্ন চাকরির পর; না নিলে জমে |
| উৎসব ছুটি (ধারা ১১৮) | পঞ্জিকা বছরে ১৩ দিন, মজুরিসহ | ২০২৬ সালের সংশোধনে ১১ থেকে ১৩ দিন |
| প্রসূতি কল্যাণ ছুটি (ধারা ৪৬) | প্রসবের আগে ৬০ দিন, পরে ৬০ দিন | ২০২৬ সালের সংশোধনে আট সপ্তাহের জায়গায় ৬০ দিন |
সংবাদপত্র শ্রমিকদের পীড়া ছুটির হিসাব আলাদা: চাকরির মেয়াদের অন্তত আঠারো ভাগের এক ভাগ, অর্ধ মজুরিতে। সরকারি অফিসের কর্মচারীদের ছুটি চলে সরকারি চাকরির আলাদা বিধিতে, এই লেখা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য।
আইনে পঞ্জিকা বছর মানে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। তাই নৈমিত্তিক আর পীড়া ছুটির ১০ ও ১৪ দিন প্রতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন করে শুরু হয়, আগের বছরের বাকি দিন যোগ হয় না। ২০২৬ সালের সংশোধনে মাস শব্দের সংজ্ঞাও যোগ হয়েছে: খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জির মাস।
২. অর্জিত ছুটির হিসাব: কত দিন কাজ করলে এক দিন
কোনো প্রতিষ্ঠানে এক বছর অবিচ্ছিন্নভাবে চাকরি পূর্ণ হলে পরের ১২ মাসে আগের ১২ মাসের কাজের ভিত্তিতে মজুরিসহ ছুটি পাওয়া যায়। প্রাপ্তবয়স্ক আর অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের হার আলাদা।
| প্রতিষ্ঠান | প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক | অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক |
|---|---|---|
| দোকান, বাণিজ্য বা শিল্প প্রতিষ্ঠান, কারখানা, সড়ক পরিবহন | প্রতি ১৮ দিন কাজে ১ দিন | কারখানায় প্রতি ১৪ দিনে ১ দিন (২০২৬ থেকে); দোকান বা বাণিজ্যে প্রতি ১৪ দিনে ১ দিন |
| চা-বাগান | প্রতি ২২ দিন কাজে ১ দিন | প্রতি ১৮ দিনে ১ দিন |
| সংবাদপত্র শ্রমিক | প্রতি ১১ দিন কাজে ১ দিন | আইনে আলাদা হার দেওয়া নেই |
উদাহরণ: কারখানার একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক বছরে ২৭০ দিন কাজ করলে ১৮ দিনে ১ দিন হিসাবে ১৫ দিনের অর্জিত ছুটি পাবেন। কোনো বছরে ছুটি না নিলে বা কম নিলে বাকিটা পরের বছরের সঙ্গে যোগ হয়।
- জমার সর্বোচ্চ সীমা, প্রাপ্তবয়স্ক: কারখানা ও সড়ক পরিবহনে ৪০ দিন; চা-বাগান, দোকান, বাণিজ্য বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৬০ দিন।
- অপ্রাপ্তবয়স্ক: কারখানা ও চা-বাগানে ৬০ দিন; দোকান, বাণিজ্য বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৮০ দিন।
- আপনি দরখাস্ত করার পর মালিক ছুটি না-মঞ্জুর করলে সেই দিনগুলো সীমার বাইরে অতিরিক্ত পাওনা হিসেবে যোগ হয়।
- প্রসূতি ছুটি, পীড়া বা দুর্ঘটনার ছুটি, লে-অফ, মজুরিসহ ছুটি বা বন্ধের দিনগুলো অবিচ্ছিন্ন চাকরি গোনায় বাধা হয় না। ২০২৬ সালের সংশোধনে এই তালিকায় প্রসূতিকালীন ছুটি লেখা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২০ দিন।
৩. শ্রম আইন অনুযায়ী উৎসব ছুটি কতদিন
২০২৬ সালের সংশোধনী আইনের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ১১৮ ধারার এগারো শব্দের জায়গায় ১৩ বসানো হয়েছে। তাই এখন প্রত্যেক শ্রমিক পঞ্জিকা বছরে ১৩ দিনের মজুরিসহ উৎসব ছুটি পাবেন। কোন দিন উৎসব ছুটি হবে, বিধি অনুযায়ী তা ঠিক করেন মালিক।
১১৮(৩) ধারায় উৎসব ছুটির দিনে কাউকে কাজ করানো যায়, তবে তাঁকে দুই দিনের মজুরিসহ ক্ষতিপূরণ ছুটি আর একটি বিকল্প ছুটি দিতে হবে।
৪. ছুটির দিনে মজুরি কীভাবে হিসাব হয়
১১৯ ধারা অনুযায়ী ছুটি বা বন্ধের দিনের মজুরি হবে ছুটির ঠিক আগের মাসে যত দিন কাজ করেছেন, সেই দিনগুলোর পূর্ণ সময়ের মজুরির দৈনিক গড়। এই গড়ে অধিকাল ভাতা আর বোনাস ধরা হয় না, তবে মহার্ঘ ভাতা আর এডহক বা অন্তর্বর্তী মজুরি থাকলে ধরা হয়।
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে একসঙ্গে অন্তত ৪ দিনের, বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে অন্তত ৫ দিনের বাৎসরিক ছুটি দিলে, সম্ভব হলে ছুটি শুরুর আগেই ছুটির মজুরি দিতে হয়।
৫. সরকারি চাকরির ছুটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না
অনেকে সরকারি চাকরির ছুটির খবর দেখে বেসরকারি অফিসে একই দাবি করেন। সরকারি কর্মচারীদের ছুটি, যেমন ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি, চলে সরকারি চাকরির নিজস্ব বিধিতে। বেসরকারি কারখানা, দোকান বা প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইনের হিসাবই ন্যূনতম।
প্রতিষ্ঠান চাইলে আইনের চেয়ে বেশি ছুটি দিতে পারে, অনেক অফিসের চাকরির বিধিতে তা লেখাও থাকে। তাই নিজের নিয়োগপত্র আর প্রতিষ্ঠানের ছুটির নীতিমালা দেখে নিন, সেখানে বেশি থাকলে সেটাই পাবেন।
৬. ছুটি চাইবেন যেভাবে, না দিলে কী করবেন
- ১লিখিত দরখাস্ত দিনকোন ধরনের ছুটি, কত দিন আর কোন তারিখ থেকে, লিখে জমা দিন। পীড়া ছুটি হলে চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র সঙ্গে দিন।
- ২জমার প্রমাণ রাখুনদরখাস্তের কপিতে গ্রহণের সই নিন বা ইমেইলের কপি রাখুন। পরে ছুটি না-মঞ্জুর হলে এটাই আপনার পাওনার প্রমাণ।
- ৩ছুটির হিসাব মিলিয়ে নিনবছর শেষে বা চাকরি ছাড়ার সময় কত দিন অর্জিত ছুটি জমা আছে লিখিত হিসাব চান। চাকরি শেষে অব্যবহৃত অর্জিত ছুটির টাকা চূড়ান্ত পাওনায় ধরা হয় কি না, হিসাবে দেখুন।
- ৪সমাধান না হলে অভিযোগকলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ নম্বরে জানান। মজুরি কাটা বা না দেওয়ার বিরোধে শ্রম আদালতেও যাওয়া যায়।
৭. অনেকে যা জানতে চান
শ্রম আইন অনুযায়ী উৎসব ছুটি কতদিন?
বেসরকারি চাকরিতে নৈমিত্তিক ছুটি কত দিন?
অর্জিত ছুটির হিসাব কিভাবে করে?
শ্রম আইনে প্রসূতি ছুটি কত দিন?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।