
সংক্ষেপে
আয়কর রিটার্নে লোন দেখানো হয় সম্পদ ও দায়ের বিবরণীর দায় অংশে: ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ এক ঘরে, ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ধার আরেক ঘরে, বছরের শেষ দিনে যত টাকা বাকি ছিল সেই অঙ্কে। ঋণের টাকায় কেনা সম্পদ পুরো দামে সম্পদের ঘরে বসে।
সবচেয়ে বড় সাবধানতা আয়কর আইনের ৬৭(১৩) ধারায়: কেউ ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ, অগ্রিম বা জমা নিলে সেই টাকা তাঁর ওই বছরের আয় হিসেবে গণ্য হয়। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ছাড় পায়, যদি দুজনের রিটার্নেই তা দেখানো থাকে।
Asset & liabilities পাতায় ঋণ আর দায়ের তথ্য লিখে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়।
এই লেখায়
১. আয়কর রিটার্নে লোন কোথায় দেখাবেন
লোন আপনার আয় নয়, আবার খরচও নয়। এটা দায়। তাই রিটার্নে এর জায়গা সম্পদ ও দায়ের বিবরণী, যাকে IT-10B বলে। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী এই বিবরণীতে ব্যক্তিগত দায় তিন ভাগে লেখা হয়: ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ, অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ আর অন্যান্য দায়।
| কী ধরনের ঋণ | রিটার্নে কোথায় | কোন অঙ্ক লিখবেন |
|---|---|---|
| ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লোন, যেমন হোম লোন, গাড়ির লোন, পার্সোনাল লোন | দায়: ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ | আয়বর্ষের শেষ দিন, ৩০ জুন, যত বাকি ছিল |
| আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিতের কাছ থেকে নেওয়া ধার | দায়: অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ | ৩০ জুন যত বাকি ছিল |
| কাউকে আপনি ধার দিয়েছেন | সম্পদ: আর্থিক সম্পদের মধ্যে দেওয়া ঋণ | ৩০ জুন যত পাওনা ছিল |
ঋণ নিয়ে কিছু কিনলে কেনা জিনিসটি পুরো দামে সম্পদের ঘরে বসবে, আর ঋণের বাকি অঙ্ক বসবে দায়ের ঘরে। দুই দিকের হিসাব না মিললে রিটার্ন ভুল দেখায়। সম্পদ বিবরণী কাদের দিতে হয়, তা আমাদের IT-10B নিয়ে লেখায় বিস্তারিত আছে। মনে রাখুন, স্ত্রী বা স্বামী আর নাবালক সন্তানের আলাদা TIN না থাকলে তাঁদের সম্পদ আর দায়ও আপনার বিবরণীতে যায়।
২. ৫ লাখ টাকার বেশি নগদ ধার নিলে কী হয়
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৬৭ ধারা কিছু প্রাপ্তিকে 'অন্যান্য উৎস থেকে আয়' হিসেবে ধরে। এর ১৩ উপধারা বলে, কোনো ব্যক্তি করদাতা কারও কাছ থেকে ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া অন্য উপায়ে কোনো অঙ্ক বা মোট অঙ্ক ৫ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম, ঋণ বা যেকোনো ধরনের জমা হিসেবে নিলে, যে আয়বর্ষে নিয়েছেন সেই বছরের আয় হিসেবে তা গণ্য হবে।
একটা উদাহরণ ধরুন। করিম সাহেব দোকান বড় করতে চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে হাতে হাতে নগদ ৬ লাখ টাকা ধার নিলেন, কোনো ব্যাংক লেনদেন নেই। চাচাতো ভাই আইনের ছাড়ের তালিকায় নেই। এই অবস্থায় আইনের ভাষায় পুরো ৬ লাখ টাকাই করিম সাহেবের ওই বছরের আয় হিসেবে ধরা যায়, যদিও টাকাটা তাঁকে ফেরত দিতে হবে। একই টাকা চাচাতো ভাই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রান্সফার করলে নিয়মটি খাটত না, তখন এটি শুধু অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ হিসেবে দায়ের ঘরে যেত।
আইনে 'কোনো অঙ্ক বা মোট অঙ্ক' লেখা। তাই একবারে নয়, কয়েক কিস্তিতে নগদে নিয়ে মোট ৫ লাখ ছাড়ালেও ঝুঁকি থাকে। বড় অঙ্কের ধার নিলে ব্যাংকের মাধ্যমে নিন।
৩. কোন ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না
- স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের কাছ থেকে নেওয়া টাকা, যদি দাতা আর গ্রহীতা দুজনের রিটার্নেই তা দেখানো থাকে। ২০২৪ সালের অর্থ আইনে এই শর্ত যোগ হয়েছে, আগে শর্ত ছিল দাতার ব্যাংক হিসাব থেকে তোলা টাকা।
- ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি বা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান যে জমা গ্রহণ করে।
- ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে নেওয়া যেকোনো ঋণ, যত বড়ই হোক। তবে সেটিও দায়ের ঘরে দেখাতে হবে।
পরিবারের ছাড় নিতে হলে দাতারও রিটার্ন থাকা লাগে। বাবা যদি রিটার্ন না দেন, অথচ নগদে ৮ লাখ টাকা দেন, তাহলে আইনের শর্ত পূরণ হয় না। এমন ক্ষেত্রে টাকাটা ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়াই নিরাপদ।
৪. লোন শোধ হলে আর বাকিতে কেনাকাটা
যে বছর লোনের কিছু অংশ শোধ করেছেন, সে বছরের শেষে দায়ের ঘরে শুধু বাকি অঙ্কটি থাকবে। শোধের টাকা কোথা থেকে এল, তা আয় আর খরচের হিসাবে মিলতে হবে, তাই কিস্তির ব্যাংক স্টেটমেন্ট রেখে দিন। লোন পুরো শোধ হলে পরের বছরের বিবরণীতে তা আর থাকবে না।
বাড়ি বানানোর সময় বাকিতে রড, সিমেন্ট বা অন্য উপকরণ কিনলেও সাবধান। ৬৭(১৪) উপধারা অনুযায়ী আবাসন ব্যবসায় নেই এমন করদাতা বাড়ি নির্মাণের উপকরণ বাকিতে কিনে যে আয়বর্ষে কিনেছেন তার শেষ থেকে ২ বছরের মধ্যে টাকা না দিলে, সেই অঙ্ক পরের আয়বর্ষে তাঁর আয় হিসেবে ধরা হয়।
৫. ধার নেওয়া থেকে রিটার্ন পর্যন্ত যা করবেন
- ১ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা নিন৫ লাখের কাছাকাছি বা বেশি অঙ্ক হলে চেক, অনলাইন ট্রান্সফার বা ব্যাংকের অন্য মাধ্যমে নিন, যাতে লেনদেনের রেকর্ড থাকে।
- ২লিখিত রাখুনকার কাছ থেকে, কত টাকা, কবে নিলেন আর কবে ফেরত দেবেন, তা লিখে দুজনে সই করে রাখুন। হাওলাতের চুক্তিপত্র আইনে রিটার্নের শর্ত নয়, তবে কর অফিস প্রশ্ন করলে এটাই প্রমাণ।
- ৩ঋণদাতার তথ্য সংগ্রহ করুনঋণদাতার নাম, ঠিকানা আর TIN থাকলে তা লিখে রাখুন। পরিবারের সদস্য হলে তিনি নিজের রিটার্নে টাকাটা দেওয়া ঋণ হিসেবে দেখাচ্ছেন কি না, নিশ্চিত হন।
- ৪রিটার্নের দায়ের ঘরে লিখুনই-রিটার্নের Asset & liabilities পাতায় ৩০ জুনের বাকি অঙ্ক ঠিক ঘরে লিখুন, ব্যাংক লোন হলে ব্যাংকের স্টেটমেন্ট মিলিয়ে।
রিটার্নের আগে হাতে রাখুন
৬. অনেকে যা জানতে চান
personal loan in income tax return দেখাতে হয়?
home loan in tax return: লোনে কেনা ফ্ল্যাট কীভাবে দেখাব?
আত্মীয়ের কাছ থেকে নগদে ধার নিলে কি কর লাগে?
হাওলাত টাকার চুক্তিপত্র কি লাগে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।