
সংক্ষেপে
দানকর দেন দাতা, যিনি দান পান তিনি নন। দানকর আইন, ১৯৯০-এর ধারা ৪ অনুযায়ী পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, আপন ভাই বা আপন বোনকে দান করলে কোনো দানকর নেই। অন্য কাউকে দিলে বছরে মোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করমুক্ত, তার ওপরের অংশে প্রথম ৫ লাখে ৫%, পরের ১০ লাখে ১০%, পরের ২০ লাখে ১৫% আর বাকি অংশে ২০% দানকর।
২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বড় বদল হলো জমি বা ফ্ল্যাটের হেবা ও দান দলিলে। এনবিআরের ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী এখন সাব-রেজিস্ট্রার নিজেই দাতার কাছ থেকে প্রযোজ্য দানকর ই-চালানে নেবেন, আর হেবা বা দানে আয়কর আইনের ধারা ১২৫-এর উৎসে কর লাগবে না। বিক্রির দলিলে উল্টোটা: উৎসে কর আছে, দানকর নেই।
অব্যাহতির পুরো তালিকা, রিটার্ন আর জরিমানার বিধান আইনের মূল পাঠে আছে।
এই লেখায়
১. কোন দানে দানকর নেই
আইনে ‘দান’ মানে কোনো প্রতিদান ছাড়া স্বেচ্ছায় স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্যকে দিয়ে দেওয়া। জমি, ফ্ল্যাট যেমন, তেমনি নগদ টাকা, সোনা বা শেয়ারও এর মধ্যে পড়ে। তবে ধারা ৪-এ যেসব দানকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো:
- পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, আপন ভাই বা আপন বোনকে দান।
- বাংলাদেশের বাইরে থাকা সম্পত্তির দান।
- সরকার বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দান।
- স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি স্বীকৃত বা সাহায্যপ্রাপ্ত হাসপাতাল, সরকারি বন্যা বা দুর্যোগ তহবিলে দান।
- অনুমোদিত বা নিবন্ধিত ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান, তবে মোট আয়ের ২০% বা ১ লাখ টাকা, যেটি কম, সে পর্যন্ত।
- ভরণপোষণে নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিয়েতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান।
- উইলের মাধ্যমে দান, আর মৃত্যুচিন্তায় করা দান।
অব্যাহতির তালিকায় শুধু সন্তান, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী আর আপন ভাইবোনের কথা আছে। নাতি-নাতনি, ভাইপো, ভাগনে, জামাই বা পুত্রবধূকে জমি বা টাকা দিলে তালিকার বাইরে পড়ে, তখন হার অনুযায়ী দানকর প্রযোজ্য।
২. দান করের হার কত
ছাড়ের দানগুলো বাদ দিয়ে এক আর্থিক বছরে আপনার মোট দান থেকে আগে ২০ হাজার টাকা বাদ যায় (ধারা ৪ এর উপ-ধারা ২)। বাকি অংশে আইনের তফসিল অনুযায়ী ধাপে ধাপে কর হয়।
| করমুক্ত সীমার পরের অংশ | দানকরের হার |
|---|---|
| প্রথম ৫ লাখ টাকা | ৫% |
| পরের ১০ লাখ টাকা | ১০% |
| পরের ২০ লাখ টাকা | ১৫% |
| বাকি অংশ | ২০% |
উদাহরণ: একজন চাচা তাঁর ভাতিজাকে ১০ লাখ টাকা মূল্যের জমি হেবা করলেন, সে বছরে আর কোনো দান নেই। ২০ হাজার বাদে করযোগ্য অংশ ৯,৮০,০০০ টাকা। প্রথম ৫ লাখে ৫% হিসেবে ২৫,০০০ টাকা আর বাকি ৪,৮০,০০০ টাকায় ১০% হিসেবে ৪৮,০০০ টাকা। মোট দানকর ৭৩,০০০ টাকা, যা দেবেন চাচা।
আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী নগদ ছাড়া অন্য সম্পত্তির মূল্য ধরা হয় দানের দিনে খোলা বাজারে সেটি যে দামে বিক্রি হতে পারত, সেই দামে। রেজিস্ট্রির সময় কোন মূল্য ধরে দানকর হিসাব হবে, দলিল লেখানোর আগেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে লিখিত হিসাব নিয়ে নিন।
৩. ২০২৬ থেকে হেবা দলিলে যা বদলেছে
অর্থ আইন, ২০২৬ আয়কর আইনের ধারা ১২৫-এ নতুন উপ-ধারা (২ক) যোগ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনের সময় নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা দানকর আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে দানকর ই-চালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করবেন। এনবিআর স্পষ্ট করেছে, এই বিধান শুধু হেবা বা দানের দলিলের জন্য।
| দলিলের ধরন | উৎসে কর (ধারা ১২৫) | দানকর |
|---|---|---|
| বিক্রয় বা সাফ কবলা | লাগবে, বিক্রেতা দেবেন | লাগবে না |
| হেবা বা দান, তালিকার আপনজনকে | লাগবে না | ধারা ৪ অনুযায়ী অব্যাহতি |
| হেবা বা দান, অন্য কাউকে | লাগবে না | লাগবে, দাতা দেবেন |
বিডিনিউজ২৪-এর ৭ জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদনেও এনবিআরের বরাতে বলা হয়েছে, বাবা-মা ও সন্তান, স্বামী-স্ত্রী এবং আপন ভাইবোনের মধ্যে হস্তান্তরে উৎসে কর বা দানকর কোনোটিই লাগবে না। আর উৎসে কর লাগলে প্রতিটি দলিলের জন্য আলাদা ই-চালানে দিতে হয়, এটাও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন নিয়ম।
- ১সম্পর্কটা আগে মিলিয়ে নিনদাতা আর গ্রহীতার সম্পর্ক তালিকার মধ্যে পড়ে কি না দেখুন। প্রমাণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন বা ওয়ারিশ সনদের মতো কাগজ সঙ্গে রাখুন।
- ২দলিলের মূল্য ঠিক করুনদলিল লেখককে দিয়ে হেবা বা দানপত্র লেখানোর সময় সম্পত্তির মূল্য পরিষ্কার লিখুন। এর ভিত্তিতেই রেজিস্ট্রি ফি আর প্রযোজ্য দানকরের হিসাব হবে।
- ৩দানকরের হিসাব লিখিতভাবে নিনসাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দানকর কত আসছে জেনে নিন। দাতার নামে ই-চালানে টাকা জমা দিন, চালানের কপি রাখুন।
- ৪রেজিস্ট্রি শেষে কাগজ গুছিয়ে রাখুনদলিলের রসিদ, ই-চালান আর দলিলের নকল একসঙ্গে রাখুন। গ্রহীতা পরে নামজারি আর নিজের রিটার্নে সম্পদ দেখানোর সময় এগুলো কাজে লাগাবেন।
৪. টাকা বা সোনা দান করলে: দানের রিটার্ন
জমি ছাড়া অন্য দান, যেমন বড় অঙ্কের নগদ টাকা বা সোনা, রেজিস্ট্রি অফিসে যায় না। এসব ক্ষেত্রে দানকর আইনের ধারা ৭ প্রযোজ্য: কোনো আর্থিক বছরে করযোগ্য দান করলে দাতাকে পরের করবর্ষের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগে উপকর কমিশনারের কাছে দানের রিটার্ন দিতে হয়। ধারা ৮ অনুযায়ী রিটার্ন দেওয়ার দিন বা তার আগে কর পরিশোধ করতে হয়, না দিলে খেলাপি করদাতা গণ্য হবেন।
এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এর পরিশিষ্ট ৩-এ দানের রিটার্নের ছক আছে। তাতে লিখতে হয় সব দানের মোট মূল্য, অব্যাহতি দাবি করা দানের মূল্য, করযোগ্য দানের মূল্য আর দানের বিবরণ। ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দিলে বা নোটিশ পাওয়ার পরও রিটার্ন না দিলে ধারা ১১ অনুযায়ী নির্ধারিত দানকরের সর্বোচ্চ ৫০% জরিমানা হতে পারে।
হেবা দলিলে রেজিস্ট্রির সময় দানকর দিয়ে দিলে একই দানের জন্য আলাদা রিটার্ন কীভাবে দিতে হবে, নতুন বিধানে বিস্তারিত বলা নেই। দাতা নিজের কর সার্কেলে ই-চালানের কপি দেখিয়ে জেনে নিন।
দাতা যা রাখবেন
৫. অনেকে যা জানতে চান
দানকর কে দেয়, দাতা না গ্রহীতা?
ছেলেমেয়েকে জমি হেবা করলে কি কোনো কর লাগে?
নাতিকে জমি দিলে দানকর কত?
দানকর আইন কি ২০২৬ সালে বদলেছে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।