আয়কর ও ই-টিআইএন

গৃহিণীর আয়কর রিটার্ন: কখন নিজের রিটার্ন লাগে, আর স্ত্রীর নামে সম্পদ স্বামীর রিটার্নে দেখাবেন কীভাবে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
গৃহিণীর আয়কর রিটার্ন: কখন নিজের রিটার্ন লাগে, আর স্ত্রীর নামে সম্পদ স্বামীর রিটার্নে দেখাবেন কীভাবে

সংক্ষেপে

গৃহিণীর আয়কর রিটার্ন দিতে হয় তখন, যখন তাঁর নিজের নামে আয়, যেমন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, ব্যাংকের সুদ বা বাড়িভাড়া মিলে বছরে সাড়ে ৪ লাখ টাকা ছাড়ায়। ২০২৬-২৭ করবর্ষে নারী করদাতার করমুক্ত সীমা এটাই। আয় কম হলেও তাঁর নিজের TIN থাকলে, বা কোনো সেবা নিতে রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগলে, আইনে রিটার্ন দেওয়ার কথা বলা আছে।

স্ত্রীর আলাদা TIN না থাকলে তাঁর নামের জমি, ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র বা সোনা স্বামীর সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হয়। TIN থাকলে স্ত্রী নিজের রিটার্নে নিজের সম্পদ দেখাবেন।

এনবিআরের ই-রিটার্ন সিস্টেম

TIN আর মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করে ঘরে বসে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়।

ই-রিটার্নে যান
এই লেখায়
  1. গৃহিণীর কি আয়কর রিটার্ন দিতে হয়
  2. স্ত্রীর নামে সম্পদ: স্বামীর রিটার্নে, না আলাদা রিটার্নে
  3. স্বামীর দেওয়া টাকা বা সোনায় কি কর লাগে
  4. একটি উদাহরণ: আলাদা TIN নেবেন কি না
  5. গৃহিণী নিজে রিটার্ন দেবেন যেভাবে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. গৃহিণীর কি আয়কর রিটার্ন দিতে হয়

অনেক পরিবারে স্ত্রী কোনো চাকরি বা ব্যবসা করেন না, তবু তাঁর নামে সঞ্চয়পত্র, মেয়াদি আমানত বা বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া জমি থাকে। প্রশ্নটা তাই 'গৃহিণী' পরিচয় নিয়ে নয়, তাঁর নিজের আয় আর অবস্থা নিয়ে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারায় যেসব ক্ষেত্রে রিটার্ন দিতে হয়, তার কয়েকটি একজন গৃহিণীর বেলায়ও খাটতে পারে।

আপনার অবস্থারিটার্ন লাগবে কি
নিজের মোট আয় বছরে সাড়ে ৪ লাখ টাকার বেশিলাগবে, ১৬৬(১)(ক) ধারা
আগের ৩ বছরের কোনো বছরে আপনার কর নির্ধারণ হয়েছিললাগবে, ১৬৬(১)(খ)
নিজের নামে TIN আছেলাগবে, ১৬৬(১)(ঙ) ধারায় নিবন্ধিত করদাতার কথা বলা আছে
কোনো সেবায় রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) দেখাতে হবেলাগবে, ১৬৬(১)(চ)
কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালকলাগবে, ১৬৬(১)(গ)
আয় সীমার নিচে, TIN নেই, ওপরের কোনোটি খাটে নাআইনে বাধ্যতামূলক নয়

এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী নারী আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আয় এর নিচে হলে কর শূন্য, তবে TIN থাকলে রিটার্ন জমা দেওয়ার দায় থেকে যায়। নিজের TIN আছে কি না মনে না থাকলে আমাদের টিন সার্টিফিকেট হারানো নিয়ে লেখাটি দেখুন।

২. স্ত্রীর নামে সম্পদ: স্বামীর রিটার্নে, না আলাদা রিটার্নে

আয়কর আইনের ১৬৭(৬) ধারা পরিষ্কার: কোনো ব্যক্তি করদাতার সম্পদ ও দায়ের বিবরণীতে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী আর নাবালক সন্তানের সম্পদ ও দায়ও দেখাতে হবে, যদি তাঁদের আলাদা TIN না থাকে। এখানেই 'স্ত্রীর নামে সম্পদ কেনার বিধান' নিয়ে বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর।

  • স্ত্রীর TIN নেই: স্ত্রীর নামের জমি, ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক জমা আর সোনা স্বামী নিজের সম্পদ বিবরণীতে দেখাবেন।
  • স্ত্রীর TIN আছে: স্ত্রী নিজের রিটার্নে নিজের সম্পদ দেখাবেন। স্বামীর বিবরণীতে একই সম্পদ আবার দেখানোর দরকার নেই।
  • স্বামীর টাকায় স্ত্রীর নামে কিছু কিনলে, টাকাটা কোথা থেকে এল তা যেন দুজনের হিসাবেই মেলে। স্বামীর রিটার্নে সেটা দান বা হস্তান্তর হিসেবে আর স্ত্রীর রিটার্নে প্রাপ্তি হিসেবে আসবে।
আয়ও যোগ হতে পারে

আইনের ৩১(১)(খ) ধারা অনুযায়ী স্ত্রী যদি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হন, বা স্ত্রীর আয়ের ওপর স্বামীর যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ থাকে, বা স্বামী রাজি থাকেন, তাহলে স্ত্রীর আয় স্বামীর মোট আয়ে যোগ হতে পারে। স্ত্রীর কর আলাদাভাবে নির্ধারণ হলে এই নিয়ম খাটে না।

৩. স্বামীর দেওয়া টাকা বা সোনায় কি কর লাগে

দানকর আইন, ১৯৯০-এর ৪ ধারায় স্বামী বা স্ত্রীকে দেওয়া দান দানকরের বাইরে রাখা আছে। তাই স্বামী স্ত্রীকে টাকা, সোনা বা জমি দিলে দানকর লাগে না।

নগদ টাকার বেলায় আয়কর আইনের ৬৭(১৩) ধারাও মনে রাখুন। কেউ ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ, অগ্রিম বা জমা নিলে তা তাঁর আয় হিসেবে গণ্য হয়। তবে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের কাছ থেকে নেওয়া টাকায় এই নিয়ম খাটে না, যদি টাকাটা দাতা আর গ্রহীতা দুজনের রিটার্নেই দেখানো থাকে। মানে, স্ত্রীর TIN থাকলে লেনদেনটা দুজনের রিটার্নেই মিলিয়ে লিখুন।

শুধু নামে কিনলে ঝামেলা বাড়ে

স্বামীর আয় দিয়ে স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র বা জমি কিনে কোথাও না দেখালে পরে উৎস দেখানো কঠিন হয়। কেনার বছরেই সঠিক রিটার্নে লেনদেনটি তুলুন।

৪. একটি উদাহরণ: আলাদা TIN নেবেন কি না

রিনা গৃহিণী। বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে বছরে ধরুন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পান। তাঁর TIN নেই। স্বামী চাকরিজীবী, প্রতি বছর রিটার্ন দেন।

রিনার আয় সাড়ে ৪ লাখ টাকার অনেক নিচে, TIN নেই, আর ওপরের তালিকার অন্য কোনো শর্তও খাটছে না। তাই তাঁর নিজের রিটার্ন আইনে বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ১৬৭(৬) ধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাটটি তখন স্বামীর সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হবে। ভাড়ার আয় স্বামীর আয়ের সঙ্গে যোগ হবে কি না, তা ৩১ ধারার শর্তের ওপর নির্ভর করে, এ নিয়ে কর আইনজীবী বা নিজের কর সার্কেলের পরামর্শ নিন।

রিনা চাইলে নিজের TIN নিয়ে প্রতি বছর রিটার্ন দিতে পারেন। তাতে কর শূন্য আসবে, ফ্ল্যাট আর ভাড়ার হিসাব থাকবে তাঁর নিজের নামে, আর ভবিষ্যতে সঞ্চয়পত্র কেনা বা ব্যাংকে বড় আমানত রাখতে রিটার্নের প্রমাণ হাতে থাকবে। শুধু মনে রাখুন, একবার TIN নিলে প্রতি বছর রিটার্ন দিতে হবে।

৫. গৃহিণী নিজে রিটার্ন দেবেন যেভাবে

  • ১
    TIN নিননিজের NID আর নিজের ব্যবহার করা চালু মোবাইল নম্বর দিয়ে ই-টিআইএন সাইটে নিবন্ধন করে TIN সনদ নামান। TIN নিতে টাকা লাগে না।
  • ২
    ই-রিটার্নে নিবন্ধনTIN আর একই মোবাইল নম্বর দিয়ে ই-রিটার্ন সিস্টেমে অ্যাকাউন্ট খুলুন, ওটিপি দিয়ে যাচাই করুন।
  • ৩
    আয়ের কাগজ জোগাড় করুনসঞ্চয়পত্রের মুনাফা আর ব্যাংক সুদের উৎসে কাটা করের প্রত্যয়নপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর বাড়িভাড়া থাকলে তার হিসাব হাতে নিন।
  • ৪
    আয়, খরচ আর সম্পদ লিখুনআয়ের ঘরে প্রতিটি উৎস আলাদা লিখুন। সম্পদের ঘরে নিজের নামের সব সম্পদ, আর স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া টাকা বা সোনা প্রাপ্তি হিসেবে দেখান।
  • ৫
    জমা দিয়ে প্রমাণ রাখুনকর শূন্য হলেও রিটার্ন জমা দিয়ে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র নামিয়ে রাখুন। পরে সঞ্চয়পত্র বা আমানতে এটাই রিটার্নের প্রমাণ।

সঙ্গে রাখুন

৬. অনেকে যা জানতে চান

গৃহিণীদের আয়কর রিটার্ন কি বাধ্যতামূলক?
সবার জন্য নয়। নিজের আয় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ছাড়ালে, নিজের TIN থাকলে বা কোনো সেবায় রিটার্নের প্রমাণ লাগলে আইনে রিটার্ন দেওয়ার কথা আছে। এর কোনোটি না খাটলে বাধ্যতামূলক নয়।
স্ত্রীর নামে সম্পদ কেনার বিধান কী?
স্ত্রীর আলাদা TIN না থাকলে তাঁর নামের সম্পদ স্বামীর সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হয়। TIN থাকলে স্ত্রী নিজের রিটার্নে দেখাবেন, আর টাকার উৎস দুজনের হিসাবে মিলিয়ে লিখবেন।
housewife can file income tax return, আয় না থাকলেও?
পারেন। আয় না থাকলেও TIN নিয়ে প্রকৃত তথ্যসহ রিটার্ন দেওয়া যায়, কর শূন্য আসবে। তবে TIN নেওয়ার পর থেকে প্রতি বছর রিটার্ন দেওয়ার দায় তৈরি হয়, সেটা মাথায় রাখুন।
স্বামী স্ত্রীকে টাকা দিলে কি কর লাগে?
দানকর লাগে না, কারণ দানকর আইনে স্বামী বা স্ত্রীকে দান অব্যাহতিপ্রাপ্ত। ব্যাংক ছাড়া ৫ লাখের বেশি নগদ দিলে লেনদেনটি দুজনের রিটার্নেই দেখান।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন