আয়কর ও ই-টিআইএন

সম্পদ বিবরণী (IT-10B) কাদের দিতে হয়, ই-রিটার্নে পূরণ করবেন যেভাবে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
সম্পদ বিবরণী (IT-10B) কাদের দিতে হয়, ই-রিটার্নে পূরণ করবেন যেভাবে

সংক্ষেপে

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৭ ধারা অনুযায়ী পাঁচটি ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাকে পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণী, যাকে সবাই IT-10B বলেন, দিতেই হয়: আয়বর্ষের শেষ দিনে মোট সম্পদ ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে, বছরের যেকোনো সময় মোটরযানের মালিক হলে, সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ করলে, বিদেশে সম্পদ থাকলে, অথবা কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হলে। আর গণকর্মচারী হলে সম্পদ যত কমই হোক, বিবরণী বাধ্যতামূলক।

ই-রিটার্নে আলাদা ফরম ছাপাতে হয় না। শুরুতে IT-10B Requirements অংশের প্রশ্নের উত্তর দেন, পরে Asset & liabilities পাতায় সম্পদ আর দায় লেখেন। আগের বছর অনলাইনে রিটার্ন দিয়ে থাকলে Autofill চাপলেই পুরোনো তথ্য চলে আসে।

ই-রিটার্নে সম্পদ ও দায়ের হিসাব

রিটার্নের Asset & liabilities পাতায় সম্পদ, দায় আর নগদ টাকার তথ্য দিতে হয়।

e-Return খুলুন
এই লেখায়
  1. কাদের জন্য বিবরণী বাধ্যতামূলক
  2. মোট সম্পদ কীভাবে হিসাব হয়
  3. কোন সম্পদ কোন ঘরে লিখবেন
  4. ই-রিটার্নে পূরণের ধাপ
  5. সম্পদের ওপর সারচার্জ কখন লাগে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. কাদের জন্য বিবরণী বাধ্যতামূলক

নিচের যেকোনো একটি শর্ত আপনার ক্ষেত্রে খাটলে রিটার্নের সঙ্গে সম্পদ ও দায়ের বিবরণী দিতে হবে। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এও একই তালিকা আছে।

শর্তকখন ধরা হয়
মোট সম্পদ ৫০ লাখ টাকার বেশিআয়বর্ষের শেষ তারিখে, অর্থাৎ ৩০ জুন, দেশে ও বিদেশে থাকা সব সম্পদ মিলিয়ে
মোটরযানের মালিকআয়বর্ষের যেকোনো সময় মালিক থাকলেই
সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে বিনিয়োগ করলে
বিদেশে কোনো সম্পদআয়বর্ষের যেকোনো সময় মালিক হলে
কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালকপরিচালক থাকলে
গণকর্মচারীসম্পদের পরিমাণ যা-ই হোক

শর্ত না খাটলেও নিজের ইচ্ছায় বিবরণী দেওয়া যায়, আইনেই সে সুযোগ রাখা আছে। এতে পরে সম্পদ বাড়লে আগের বছরের সঙ্গে হিসাব মেলানো সহজ হয়।

নোটিশ পেলে দিতেই হবে

উপকর কমিশনার লিখিত নোটিশ দিয়ে যেকোনো আয়বর্ষের বিবরণী চাইতে পারেন, যেমন আগে দেননি বা অসম্পূর্ণ দিয়েছেন মনে হলে। নোটিশের পরও না দিলে আপনার দাখিল করা রিটার্নটিই অসম্পূর্ণ রিটার্ন বলে গণ্য হবে।

২. মোট সম্পদ কীভাবে হিসাব হয়

বিবরণীর মূল কাজ হলো দেখানো, বছরের আয় দিয়ে আপনার সম্পদ কতটা বেড়েছে। নির্দেশিকার ছক অনুযায়ী হিসাবটা এভাবে চলে:

  1. এ বছরের অর্জিত তহবিল বের করুন: রিটার্নে দেখানো মোট আয়, কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় আর দান বা অন্য প্রাপ্তি যোগ করে।
  2. এর সঙ্গে যোগ করুন আগের আয়বর্ষের শেষ দিনের নিট সম্পদ।
  3. যোগফল থেকে বাদ দিন বছরের জীবনযাপন খরচ, অর্থাৎ IT-10BB-তে দেখানো মোট খরচ, আর অন্য দান, ব্যয় বা ক্ষতি।
  4. যা থাকে, সেটাই এ বছরের শেষ দিনের নিট সম্পদ। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত দায়, যেমন ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ, অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ আর অন্যান্য দায় যোগ করলে আসে মোট সম্পদ।

তাই ঋণ নিয়ে কেনা ফ্ল্যাট বা গাড়ির পুরো দাম বসে সম্পদের ঘরে, আর ঋণের বাকি অঙ্ক বসে দায়ের ঘরে। দুই দিকের হিসাব মিলছে কি না, রিটার্ন জমার আগে নিজেই মিলিয়ে নিন।

৩. কোন সম্পদ কোন ঘরে লিখবেন

বাংলাদেশে থাকা সম্পদ খাত ধরে আলাদা আলাদা লিখতে হয়। নির্দেশিকায় যে খাতগুলো আছে:

  • ব্যবসার মূলধন: ব্যবসার মোট সম্পদ থেকে ব্যবসার দায় বাদ দিয়ে।
  • লিমিটেড কোম্পানিতে পরিচালক হিসেবে শেয়ার বিনিয়োগ, আর অংশীদারি ফার্মের মূলধনের জের।
  • অকৃষি সম্পত্তি, যেমন জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট: আইনসম্মত ব্যয়সহ কেনার দাম বা নির্মাণ খরচ, সঙ্গে অবস্থান আর বিবরণ।
  • কৃষি সম্পত্তি: আইনসম্মত ব্যয়সহ কেনার দাম, মোট জমির পরিমাণ আর অবস্থান।
  • আর্থিক সম্পদ: শেয়ার, ডিবেঞ্চার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ডিপোজিট পেনশন স্কিম, কাউকে দেওয়া ঋণ (গ্রহীতার নাম ও NID সহ), সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানত আর প্রভিডেন্ট ফান্ড।
  • মোটরযান: রেজিস্ট্রেশন খরচসহ কেনার দাম, গাড়ির ধরন আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর।
  • অলংকার (পরিমাণসহ), আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী আর অন্যান্য সম্পদ।
  • ব্যবসার বাইরের নগদ: ব্যাংকে জমা, হাতে নগদ আর অন্যান্য অর্থ।

বিদেশে সম্পদ থাকলে তা আলাদা লাইনে দেখাতে হয়। নিবাসী বাংলাদেশি দেশ-বিদেশের সব সম্পদ দেখাবেন, অনিবাসী বাংলাদেশি শুধু বাংলাদেশে থাকা সম্পদ। স্বামী, স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের আলাদা TIN না থাকলে তাঁদের সম্পদ ও দায়ও আপনার বিবরণীতে যাবে।

বাজারদর নয়, কেনার দাম

এনবিআরের ই-রিটার্ন প্রশ্নোত্তর বলছে, সোনা বা অন্য সম্পদের বাজারমূল্য দেখাতে হবে না। পুরোনো সম্পদ আগের বছরের মূল্যেই থাকবে, নতুন কেনা সম্পদ লিখবেন প্রকৃত ক্রয়মূল্যে।

৪. ই-রিটার্নে পূরণের ধাপ

  • ১
    IT-10B Requirements-এর উত্তর দিনরিটার্নের শুরুর অংশে জানতে চাওয়া হয় মোট সম্পদ ৫০ লাখ টাকার বেশি কি না, মোটরগাড়ি আছে কি না, গৃহসম্পত্তি কতটা। এর ওপরই ঠিক হয় বিবরণী বাধ্যতামূলক কি না, তাই সত্য উত্তর দিন।
  • ২
    আয়, রেয়াত আর খরচ আগে শেষ করুনIncome, Rebate আর Expenditure পাতা আগে পূরণ করলে সম্পদ মেলাতে সুবিধা হয়, কারণ বছরের আয় আর খরচ দিয়েই নিট সম্পদ বের হয়।
  • ৩
    Asset & liabilities পাতায় Autofill চাপুনআগের বছর অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করে থাকলে Autofill অপশনে পুরোনো সম্পদ-দায় চলে আসে, তারপর দরকারমতো এডিট, ডিলিট বা নতুন যোগ করুন। আগের বছর শুধু অনলাইনে তৈরি করে প্রিন্ট কপি অফিসে জমা দিলে সিস্টেমে তথ্য থাকে না, তখন নিজে লিখতে হবে।
  • ৪
    বিক্রি হওয়া সম্পদ বাদ দিনযে সম্পদ নগদায়ন বা হস্তান্তর হয়ে গেছে, যেমন ভাঙানো সঞ্চয়পত্র বা বিক্রি করা জমি, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি সব এ বছরও দেখাতে হবে।
  • ৫
    Return view-এ মিলিয়ে জমা দিনপুরো রিটার্ন একবার দেখে নিন, ভুল এন্ট্রি থাকলে ঠিক করুন, তারপর সাবমিট করুন। জমার পর প্রাপ্তি স্বীকারপত্র আর রিটার্নের কপি নামিয়ে রাখুন।

৫. সম্পদের ওপর সারচার্জ কখন লাগে

বিবরণীতে দেখানো নিট সম্পদের ভিত্তিতেই সারচার্জ ঠিক হয়। ২০২৬-২৭ করবর্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী হার এমন, আর তা বসে আপনার আয়করের ওপর, পরিবেশ সারচার্জ বাদে:

নিট সম্পদ বা শর্তসারচার্জ
৪ কোটি টাকা পর্যন্তনেই
৪ কোটির বেশি থেকে ১০ কোটি টাকা, অথবা নিজের নামে একাধিক মোটরগাড়ি, অথবা মোট ৮,০০০ বর্গফুটের বেশি গৃহসম্পত্তি১০%
১০ কোটির বেশি থেকে ২০ কোটি টাকা২০%
২০ কোটির বেশি থেকে ৫০ কোটি টাকা৩০%
৫০ কোটি টাকার বেশি৩৫%

এখানে মোটরগাড়ির হিসাবে বাস, মিনিবাস, ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা আর মোটরসাইকেল ধরা হয় না। এনবিআরের প্রশ্নোত্তরে উদাহরণও আছে: সম্পদ ৪ কোটির কম, ৮,০০০ বর্গফুটের বাড়ি নেই, একটি মোটরসাইকেল আর একটি গাড়ি আছে, এমন করদাতার সারচার্জ লাগবে না।

আন্দাজে বা শূন্য লিখবেন না

এ বছরের নিট সম্পদই পরের বছরের হিসাবের শুরু। এখন কম দেখালে পরে সম্পদ বাড়লে তার উৎস মেলানো কঠিন হবে। খটকা থাকলে এনবিআরের কল সেন্টারে ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১ নম্বরে, ছুটির দিন বাদে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে জিজ্ঞেস করুন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

আমার সম্পদ ৫০ লাখের কম, গাড়িও নেই। তবু কি সম্পদের তথ্য দিতে হবে?
১৬৭ ধারার কোনো শর্ত না খাটলে এবং আপনি গণকর্মচারী না হলে আলাদা বিবরণী বাধ্যতামূলক নয়, চাইলে স্বেচ্ছায় দিতে পারেন। তবে একই ধারায় নিবাসী করদাতার রিটার্নে দেশ-বিদেশের সম্পদ ও দায়ের বিবরণ দেওয়ার কথা আছে, তাই ই-রিটার্নের সম্পদ-দায় অংশ প্রকৃত তথ্য দিয়েই পূরণ করুন।
সোনার দাম বেড়েছে, নতুন দামে দেখাব?
না। এনবিআরের ই-রিটার্ন প্রশ্নোত্তর অনুযায়ী আগের বছর যে মূল্যে দেখিয়েছেন সেটাই থাকবে। নতুন কেনা হলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য লিখুন।
স্ত্রীর নামে কেনা জমি কার বিবরণীতে যাবে?
স্ত্রীর নিজের TIN থাকলে তাঁর রিটার্নে। আলাদা TIN না থাকলে আইন অনুযায়ী আপনার বিবরণীতে স্বামী বা স্ত্রী আর নাবালক সন্তানের সম্পদ ও দায়ও দেখাতে হবে।
সম্পদ বিবরণী ফরমের পিডিএফ কোথায় পাব?
অনলাইনে রিটার্ন দিলে আলাদা ফরম লাগে না, Asset & liabilities পাতাই বিবরণী। কাগজের রিটার্ন ফরম আইটি-১১গ (২০২৩)-এর আইটি-১০বি অংশে এই বিবরণী থাকে, আর এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এ পুরো ছকটি ছাপা আছে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন