
সংক্ষেপে
বাড়ি ভাড়ার পুরো টাকার ওপর কর বসে না। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩৮ অনুযায়ী বছরের মোট ভাড়া থেকে আবাসিক বাড়ির জন্য ২৫% আর বাণিজ্যিক ভবনের জন্য ৩০% সরাসরি বাদ যায়। এর বাইরে পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স, ভূমি উন্নয়ন কর, বাড়ির বীমার প্রিমিয়াম আর বাড়ি বানানোর ব্যাংক ঋণের সুদও বাদ দেওয়া যায়। যা থাকে, সেটাই ‘ভাড়া হতে আয়’।
এই আয় চাকরি, ব্যবসা বা অন্য আয়ের সঙ্গে যোগ হয়। মোট আয় করমুক্ত সীমা পেরোলে তবেই কর লাগে। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার সীমা ৪ লাখ টাকা, নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এবারের রিটার্নে ভাড়ার হিসাবে কয়েকটি নতুন নিয়ম যোগ হয়েছে, নিচে সেগুলো আলাদা করে দেখানো হলো।
রিটার্নের আয়ের অংশে ভাড়া হতে আয়ের খাতে মোট ভাড়া, বাদ যাওয়া খরচ আর উৎসে কাটা কর লিখুন।
এই লেখায়
১. ভাড়ার আয় হিসাবের সূত্র
এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এ হিসাবটা দুই ধাপে দেখানো হয়েছে। প্রথমে বের করতে হয় মোট ভাড়ামূল্য, তারপর তা থেকে অনুমোদিত খরচ বাদ দিয়ে, বিশেষ ভাড়া আয় থাকলে যোগ করে, পাওয়া যায় ভাড়া হতে আয়।
- মোট ভাড়ামূল্য: বার্ষিক মূল্যের সঙ্গে ভাড়াটিয়ার দেওয়া সার্ভিস চার্জ, মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ (যে নামেই নেওয়া হোক) যোগ করে, খালি থাকার জন্য শূন্যতা ভাতা বাদ দিয়ে।
- ভাড়া হতে আয়: মোট ভাড়ামূল্য থেকে অনুমোদিত খরচ বাদ দিয়ে, তার সঙ্গে বিশেষ ভাড়া আয় যোগ করে।
- শূন্যতা ভাতা মিলবে শুধু ওই সময়ের বিদ্যুৎ বিল দেখাতে পারলে, যাতে বোঝা যায় বাড়ি সত্যিই খালি ছিল।
আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী এই সংশোধিত বিধান ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে প্রযোজ্য, মানে এখন যে রিটার্ন দিচ্ছেন সেখানেই। সংজ্ঞাতেও বদল এসেছে: বাড়ির সঙ্গে দেওয়া আসবাব, ফিক্সচার, ফিটিংস আর বাড়ির নিচের জমিও গৃহসম্পত্তির অংশ, আর গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া স্থাপনাও গৃহসম্পত্তি ধরা হবে।
২. কোন খরচ বাদ যায়
| খরচ | কতটা বাদ যায় |
|---|---|
| মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার্ভিস চার্জ, ভাড়া তোলার খরচ | আবাসিক বা অবাণিজ্যিক বাড়িতে মোট ভাড়ামূল্যের ২৫%, বাণিজ্যিক ভবনে ৩০%। আসল খরচ যা-ই হোক, এই হারেই বাদ |
| পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স, ভূমি উন্নয়ন কর, বাড়ির ওপর অন্য বার্ষিক ফি | যা পরিশোধ করেছেন |
| বাড়ির ক্ষতি বা ধ্বংসের ঝুঁকির বীমা | পরিশোধিত প্রিমিয়াম |
| বাড়ি কেনা, বানানো বা সংস্কারের জন্য ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণ | বছরে পরিশোধিত সুদ বা মুনাফা |
| ভাড়া শুরুর আগের সময়ে দেওয়া ওই ঋণের সুদ | ভাড়া শুরুর বছর থেকে টানা ৩ বছরে সমান কিস্তিতে |
বাড়ির একাংশে নিজে থাকলে বা বছরের কিছু অংশ ভাড়া দিলে খরচও সেই অনুপাতে বাদ যাবে। যেমন তিনতলা বাড়ির দুই তলা ভাড়া দিলে পৌরকর আর সুদের দুই-তৃতীয়াংশ বাদ যাবে। ২৫% বা ৩০% হারটা মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণের সব খরচ ধরে নিয়েই, তাই রংমিস্ত্রি বা প্লাম্বারের বিল আলাদা করে বাদ দেওয়া যায় না।
৩. অগ্রিম আর সেলামি এখন বিশেষ ভাড়া আয়
ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম নিয়েও এবার পরিষ্কার নিয়ম এসেছে। যে অগ্রিম মাসে মাসে ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় হয়, অর্থবছর শেষে তার যত টাকা বাকি থাকে তার ১০% বিশেষ ভাড়া আয় ধরা হবে।
যে টাকা ফেরত দিতে হয় না বা সমন্বয় হয় না, যেমন সেলামি বা প্রিমিয়াম, তার পুরোটাই সেই বছরের বিশেষ ভাড়া আয়। তবে ভাড়া বা লিজের মেয়াদ বা ৫ বছর, যেটি কম, সেই সময়ে আয়টা ভাগ করে দেখানোর সুযোগ আছে। পরে ওই টাকার কিছু ফেরত দিলে, যে বছর ফেরত দিলেন সেই বছরের ভাড়ার আয় থেকে তা বাদ যাবে।
খালি জমি, যন্ত্রপাতির মতো গৃহসম্পত্তি ছাড়া অন্য সম্পত্তির ভাড়ার আয়ে খরচ বাদের নিয়ম আলাদা। সেখানে খরচের টাকা ব্যাংক ট্রান্সফারে দিতে হয়, আর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসে কর না কাটলে সেই খরচ উল্টো বিশেষ ভাড়া আয় ধরা হয়।
৪. একটি উদাহরণে হিসাব
ধরা যাক, আপনার দুই ইউনিটের একটি আবাসিক বাড়ি আছে, পুরো বছর দুটিই ভাড়া ছিল। প্রতিটির ভাড়া মাসে ২০,০০০ টাকা। বছরে পৌরকর দিয়েছেন ১২,০০০ টাকা, খাজনা ৬০০ টাকা, আর বাড়ি বানানোর ব্যাংক ঋণের সুদ ৬০,০০০ টাকা। ভাড়াটিয়াদের সমন্বয়যোগ্য অগ্রিমের অর্থবছর শেষের স্থিতি ১,২০,০০০ টাকা।
| বিবরণ | টাকা |
|---|---|
| মোট ভাড়ামূল্য (২০,০০০ × ২ × ১২) | ৪,৮০,০০০ |
| বাদ: ২৫% সংবিধিবদ্ধ খরচ | ১,২০,০০০ |
| বাদ: পৌরকর ও খাজনা | ১২,৬০০ |
| বাদ: গৃহঋণের সুদ | ৬০,০০০ |
| যোগ: অগ্রিমের স্থিতির ১০% (বিশেষ ভাড়া আয়) | ১২,০০০ |
| ভাড়া হতে আয় | ২,৯৯,৪০০ |
এই ২,৯৯,৪০০ টাকা আপনার অন্য আয়ের সঙ্গে যোগ হবে। শুধু এটুকুই আয় হলে তা করমুক্ত সীমার নিচে থাকে। তবে চাকরি বা ব্যবসার আয় যোগ করে সীমা পেরোলে স্তর অনুযায়ী কর বসবে। হারগুলো আমাদের করমুক্ত আয়সীমা ও করহারের গাইডে আছে।
৫. মাসে ২৫ হাজারের বেশি ভাড়া হলে ব্যাংকে নিন
আয়কর নির্দেশিকায় স্পষ্ট লেখা আছে, এক বা একাধিক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে মাসে সব মিলিয়ে ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া পেলে বাড়ির মালিককে সেই ভাড়া ব্যাংক হিসাবে জমা নিতে হবে। না নিলে গৃহসম্পত্তির আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০% অথবা ৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি, জরিমানা হতে পারে। ওপরের উদাহরণে দুই ভাড়াটিয়া মিলে মাসে ৪০ হাজার, তাই হাতে হাতে নগদ নেওয়া চলবে না।
ভাড়াটিয়া যদি কোনো কোম্পানি, এনজিও বা এমন প্রতিষ্ঠান হয়, যাকে আইনে ‘নির্দিষ্ট ব্যক্তি’ বলা হয়েছে, তারা ভাড়া দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখে। আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ বলছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পুরোপুরি গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত ভবনের ভাড়া থেকেও ১০% হারে কর কাটতে হবে। আপনার ভাড়া থেকে কত হারে কাটা হলো, সনদে দেখে নিন। কাটা করের সনদ নিয়ে রাখুন, রিটার্নে এটা আপনার পরিশোধিত কর হিসেবে সমন্বয় হবে।
- ১বছরের ভাড়ার হিসাব মেলান১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিটি ইউনিটের ভাড়া, সার্ভিস চার্জ আর খালি থাকার মাস আলাদা করে লিখুন।
- ২খরচের রসিদ জোগাড় করুনপৌরকর, খাজনার দাখিলা, বীমার প্রিমিয়াম আর ব্যাংক থেকে গৃহঋণের সুদের সনদ নিন।
- ৩অগ্রিমের স্থিতি বের করুন৩০ জুন তারিখে কোন ভাড়াটিয়ার কত অগ্রিম বাকি, চুক্তি দেখে হিসাব করুন। ফেরত না দেওয়া সেলামি থাকলে সেটাও লিখুন।
- ৪রিটার্নের ভাড়ার খাতে লিখুনe-Return-এ লগইন করে আয়ের অংশে ভাড়া হতে আয় পূরণ করুন। উৎসে কাটা কর থাকলে সনদের তথ্য দিয়ে সমন্বয় করুন।
- ৫সম্পদ বিবরণীতে বাড়ি দেখানবাড়ির মূল্য আর গৃহঋণের বাকি টাকা সম্পদ ও দায়ের বিবরণীতে লিখে রিটার্ন জমা দিন, প্রাপ্তি স্বীকারপত্র নামিয়ে রাখুন।
ভাড়ার আয়ের কাগজ
৬. অনেকে যা জানতে চান
বাড়ি ভাড়ার উপর আয়কর কত শতাংশ?
নিজের ফ্ল্যাটে নিজে থাকলে কি ভাড়ার আয় দেখাতে হয়?
আসল মেরামত খরচ ২৫%-এর বেশি হলে কি বেশি বাদ দেওয়া যাবে?
ভাড়াটিয়া কোম্পানি উৎসে কর কেটে নিলে কি আবার কর দিতে হবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।