আয়কর ও ই-টিআইএন

জমি বিক্রি করলে কি ট্যাক্স দিতে হয়: রেজিস্ট্রির উৎসে কর ন্যূনতম, ৫ বছর পর মুনাফায় ১৫%

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
জমি বিক্রি করলে কি ট্যাক্স দিতে হয়: রেজিস্ট্রির উৎসে কর ন্যূনতম, ৫ বছর পর মুনাফায় ১৫%

সংক্ষেপে

হ্যাঁ, জমি বিক্রির লাভে আয়কর আছে। রেজিস্ট্রির সময় আয়কর আইনের ১২৫ ধারায় দলিল মূল্যের ওপর উৎসে কর কাটা হয়। আইনের ১৬৩ ধারা অনুযায়ী এই কর ওই আয়ের ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য। মুনাফা হিসাব করে কর বেশি এলে বাড়তি অংশ রিটার্নের সঙ্গে দিতে হয়।

আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭ অনুযায়ী জমি কেনার পাঁচ বছরের মধ্যে বিক্রি করলে মুনাফা মোট আয়ে যোগ হয়ে সাধারণ হারে কর, পাঁচ বছর পর হলে মুনাফায় ১৫%। দলিল মূল্যের বাইরে বাড়তি টাকা নিলে সেটাও মূলধনি আয়, আর তা ব্যাংক বিবরণী দিয়ে প্রমাণ করতে হয়।

ই-রিটার্নে জমি বিক্রির আয় দেখান

বিক্রির বছরেই রিটার্নে মূলধনি আয় আর উৎসে কাটা কর লিখে দিন।

ই-রিটার্ন
এই লেখায়
  1. জমি বিক্রি করলে কি ট্যাক্স দিতে হয়: দুই ধাপে কর
  2. মুনাফা কীভাবে বের করবেন: কেনা জমি, হেবা আর ওয়ারিশি জমি
  3. এনবিআরের উদাহরণে জমি বিক্রির কর হিসাব
  4. জমি বিক্রির টাকা রিটার্নে দেখাবেন যেভাবে
  5. অনেকে যা জানতে চান

১. জমি বিক্রি করলে কি ট্যাক্স দিতে হয়: দুই ধাপে কর

অনেকে ভাবেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যে উৎসে কর কাটা হয়েছে, সেটাই শেষ। আসলে কর দুই ধাপে আসে। প্রথম ধাপে রেজিস্ট্রির সময় বিক্রেতার পক্ষে দলিল মূল্যের ওপর উৎসে কর দেওয়া হয়, হার এলাকাভেদে আলাদা। দ্বিতীয় ধাপে বিক্রির বছরের রিটার্নে আসল মুনাফা হিসাব করে দেখতে হয়, কর আরও বাকি থাকল কি না।

  • আয়কর আইনের ১৬৩ ধারায় ১২০ থেকে ১২৯ ধারায় সংগ্রহ করা কর সংশ্লিষ্ট আয়ের ন্যূনতম কর বলে গণ্য, ১২৫ ধারা এর মধ্যে পড়ে।
  • সাধারণ নিয়মে হিসাব করা কর এই ন্যূনতম করের চেয়ে বেশি হলে বেশিটাই দিতে হয়।
  • রিটার্নে উৎসে কাটা কর ‘ক্রেডিট’ হিসেবে বাদ যায়, নির্দেশিকার উদাহরণে যেমন দেখানো আছে।

রেজিস্ট্রির খরচে উৎসে কর কোন এলাকায় কত, সেটা জমি রেজিস্ট্রি খরচের হিসাবের বিষয়। এই লেখা বিক্রির পরের অংশ নিয়ে: আপনার রিটার্নে কী দেখাবেন আর কত কর আসতে পারে।

২. মুনাফা কীভাবে বের করবেন: কেনা জমি, হেবা আর ওয়ারিশি জমি

মুনাফা = বিক্রির মূল্য থেকে জমির অর্জন মূল্য বাদ। কেনা জমিতে অর্জন মূল্য হলো কেনার দাম, কেনার সময়ের সংশ্লিষ্ট খরচ আর উন্নয়নের খরচ, যেমন মাটি ভরাট। দান, হেবা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে অর্জন মূল্য ধরা হয় মালিক হওয়ার দিনের ন্যায্য বাজারমূল্য।

অবস্থাকরের নিয়ম (নির্দেশিকা ২০২৬-২৭)
কেনা বা পাওয়ার ৫ বছরের মধ্যে বিক্রিমুনাফা মোট আয়ের সঙ্গে যোগ, সাধারণ করহারে কর
৫ বছর পার হওয়ার পর বিক্রিমুনাফার ওপর ১৫%
দলিল মূল্যের বাইরে বাড়তি টাকা নেওয়াবাড়তি টাকাও মূলধনি আয়, একই হারে কর, ব্যাংক বিবরণী দিয়ে প্রমাণ লাগবে
রেজিস্ট্রির সময় কাটা উৎসে করন্যূনতম কর, রিটার্নে ক্রেডিট হিসেবে বাদ

ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমিতে সমস্যাটা বেশি হয়, কারণ অনেকের কাছে মালিক হওয়ার দিনের মূল্যের কোনো কাগজ থাকে না। বণ্টননামা, হেবা দলিল বা নামজারির সময়ের কাগজে মূল্য লেখা থাকলে সেটা রেখে দিন, আর আগের বছরের সম্পদ বিবরণীতে জমিটা কোন মূল্যে দেখিয়েছিলেন, মিলিয়ে নিন।

আরেকটা কথা মনে রাখুন। পাঁচ বছরের হিসাব শুরু হয় জমি অর্জন বা প্রাপ্তির তারিখ থেকে। কেনা জমিতে সেটা দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ, হেবায় হেবা দলিলের তারিখ। তারিখটা বিক্রির দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে কোন হার বসবে, আগেই বোঝা যায়।

৩. এনবিআরের উদাহরণে জমি বিক্রির কর হিসাব

আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এর উদাহরণ ১৩-তে একজন আইনজীবী ১ জুন ২০২৬ তারিখে গুলশানের একটি প্লট ৭ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। দলিলে মূল্য দেখানো হয় ৫ কোটি, বাকি ২ কোটি টাকা তিনি ব্যাংকের মাধ্যমে নেন আর বায়না দলিল ও ব্যাংক বিবরণী জমা দেন। রেজিস্ট্রির সময় উৎসে কর দেন ২৫ লাখ টাকা। প্লটটি তিনি ২০১৭ সালে বাবার কাছ থেকে হেবা সূত্রে পান, হেবা দলিলে মূল্য ছিল ২৫ লাখ টাকা।

  • ১
    দলিল মূল্যের মুনাফা৫ কোটি থেকে হেবা দলিলের মূল্য ২৫ লাখ বাদে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
  • ২
    দলিলের বাইরের টাকা যোগবাড়তি ২ কোটি টাকা যোগ করে মোট মূলধনি আয় ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
  • ৩
    হার বসানজমিটি পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে পাওয়া, তাই ১৫% হারে কর ১,০১,২৫,০০০ টাকা। পেশার আয়ের কর ৪৫,০০০ টাকা যোগ করে মোট কর ১,০১,৭০,০০০ টাকা।
  • ৪
    উৎসে কর বাদ দিনরেজিস্ট্রির সময় দেওয়া ২৫,০০,০০০ টাকা বাদ দিয়ে রিটার্নের সঙ্গে দিতে হবে ৭৬,৭০,০০০ টাকা।

অঙ্কটা বড়, কিন্তু নিয়মটা ছোট জমিতেও একই। ধরুন আপনি ১০ বছর আগে ১০ লাখ টাকায় কেনা জমি এখন ২৫ লাখে বিক্রি করলেন। মুনাফা ১৫ লাখ, তার ১৫% এর সঙ্গে রেজিস্ট্রিতে কাটা উৎসে কর মিলিয়ে দেখুন। উৎসে করটাই বেশি হলে নতুন করে দেওয়ার কিছু থাকে না। হিসাবের চূড়ান্ত অঙ্ক নিজের কর সার্কেল বা কর আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

৪. জমি বিক্রির টাকা রিটার্নে দেখাবেন যেভাবে

বিক্রির বছরের রিটার্নের আগে যা জোগাড় করবেন

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আর পরিশোধের চালান রেখে দিন। পরে ব্যাংক ঋণ, নতুন জমি কেনা বা সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার সময় এই কাগজ দিয়েই দেখানো যায় যে বিক্রির টাকা বৈধ পথে এসেছে।

রিটার্নে মূলধনি আয় আলাদা খাতে লিখুন আর উৎসে কাটা কর পরিশোধিত করের ঘরে দিন। সম্পদ বিবরণী থেকে জমিটা বাদ দিন আর বিক্রির টাকা কোথায় গেল, যেমন ব্যাংকে জমা বা অন্য সম্পদ কেনা, সেটা দেখান। জমি চলে গেল অথচ টাকার খোঁজ নেই, এমন রিটার্নেই পরে প্রশ্ন ওঠে।

বিনিয়োগ করলে কর মাফ, এমন কথা নির্দেশিকায় নেই

জমি বিক্রির টাকা কোথাও বিনিয়োগ করলে মূলধনি আয়ের কর মাফ হয়, এমন কোনো সুবিধা নির্দেশিকার মূলধনি আয় অংশে নেই। কেউ এমন প্রতিশ্রুতি দিলে লিখিত আইনি সূত্র চেয়ে নিন।

৫. অনেকে যা জানতে চান

জমি বিক্রির উৎসে কর দিয়েছি, আবার রিটার্নে কর দিতে হবে কেন?
উৎসে কর ন্যূনতম কর। মুনাফার হিসাবে কর এর চেয়ে বেশি এলে বাকিটা রিটার্নের সঙ্গে দিতে হয়। কম এলে উৎসে কাটা করই থেকে যায়।
জমি বিক্রির টাকা রিটার্নে না দেখালে কী হবে?
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডে বিক্রির তথ্য থাকে। রিটার্নে না দেখালে আয় গোপনের প্রশ্ন ওঠে, যার জরিমানা আলাদা। বিক্রির বছরেই দেখানো নিরাপদ।
ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রিতে কি কর কম?
অর্জন মূল্য ধরা হয় মালিক হওয়ার দিনের ন্যায্য বাজারমূল্য। সেই মূল্যের প্রমাণ থাকলে মুনাফা কম আসে। মালিক হওয়ার পাঁচ বছর পার হলে হার ১৫%।
জমি বিক্রির টাকা কোথায় ইনভেস্ট করলে ট্যাক্স দিতে হবে না?
নির্দেশিকার মূলধনি আয় অংশে পুনর্বিনিয়োগে কর মাফের কোনো সুবিধা লেখা নেই। কর রেয়াতের বিনিয়োগ আলাদা বিষয়, সেটা করের একটা অংশ কমায়, মূলধনি আয়কে করমুক্ত করে না।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন