
সংক্ষেপে
বেসরকারি চাকরিতে ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্নে (জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ সালের বেতন) বছরে মোট বেতন-ভাতা ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে আয়কর লাগে না। বোনাস না থাকলে এর মানে মাসে ৫০ হাজার টাকা। কারণ মোট বেতনের এক-তৃতীয়াংশ (সর্বোচ্চ ৫ লাখ) করমুক্ত, আর বাকি অংশের প্রথম ৪ লাখ টাকায় কর শূন্য।
সীমা একটু পার হলেই হিসাব বদলে যায়। করযোগ্য আয় ৪ লাখের বেশি হলে কর অন্তত ৫,০০০ টাকা, নতুন করদাতার ক্ষেত্রে ১,০০০ টাকা। নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার ক্ষেত্রে সীমা মাসে ৫৬,২৫০ টাকা। সরকারি বেতন আদেশভুক্ত চাকরিতে হিসাব আলাদা।
রিটার্ন জমার সময় ই-রিটার্ন নিজেই আপনার কর হিসাব করে দেখায়।
এই লেখায়
১. বেতন কত হলে আয়কর দিতে হবে: মূল হিসাব
এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী সাধারণ করদাতার প্রথম ৪ লাখ টাকা আয়ে কর শূন্য। কিন্তু বেতনভোগীর জন্য আরেকটা সুবিধা আছে। নির্দেশিকার বেসরকারি চাকরিজীবীর উদাহরণে চাকরি থেকে মোট প্রাপ্তির ১/৩ অংশ অথবা ৫ লাখ টাকা, যেটি কম, তা করমুক্ত আয় হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশই চাকরি থেকে করযোগ্য আয়।
তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায় এমন: বছরে মোট বেতন ৬ লাখ টাকা হলে এক-তৃতীয়াংশ ২ লাখ বাদ যায়, করযোগ্য থাকে ঠিক ৪ লাখ। এতে কর শূন্য। এর ওপরে গেলেই কর শুরু। মনে রাখবেন, মোট বেতন মানে শুধু মূল বেতন নয়। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, উৎসব বোনাস, সব মিলিয়ে বছরে যা পান।
ধরুন মাসে মোট বেতন ৪৬,০০০ টাকা, আর বছরে দুটি উৎসব বোনাস ২৩,০০০ টাকা করে। বছরে মোট ৫,৫২,০০০ যোগ ৪৬,০০০, অর্থাৎ ৫,৯৮,০০০ টাকা। এটি ৬ লাখের নিচে, তাই কর নেই। কিন্তু মাসের বেতন ৫০ হাজার আর সঙ্গে বোনাস থাকলে বছরের মোট ৬ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
২. মাসিক বেতন অনুযায়ী কত কর: একটি সারণি
নিচের হিসাব বেসরকারি চাকরিজীবী সাধারণ করদাতার, ধরে নেওয়া হয়েছে বছরে ১২ মাসের বেতন ছাড়া আর কোনো আয় বা বোনাস নেই, আর কোনো বিনিয়োগ রেয়াত নেওয়া হয়নি। করের ধাপ নির্দেশিকা অনুযায়ী: প্রথম ৪ লাখে শূন্য, পরের ৩ লাখে ১০%, পরের ৪ লাখে ১৫%, পরের ৫ লাখে ২০%।
| মাসিক মোট বেতন | বছরে মোট | করমুক্ত অংশ | করযোগ্য আয় | কর |
|---|---|---|---|---|
| ৪০,০০০ | ৪,৮০,০০০ | ১,৬০,০০০ | ৩,২০,০০০ | শূন্য |
| ৫০,০০০ | ৬,০০,০০০ | ২,০০,০০০ | ৪,০০,০০০ | শূন্য |
| ৫৫,০০০ | ৬,৬০,০০০ | ২,২০,০০০ | ৪,৪০,০০০ | হিসাবে ৪,০০০, তবে ন্যূনতম ৫,০০০ |
| ৬০,০০০ | ৭,২০,০০০ | ২,৪০,০০০ | ৪,৮০,০০০ | ৮,০০০ |
| ৭৫,০০০ | ৯,০০,০০০ | ৩,০০,০০০ | ৬,০০,০০০ | ২০,০০০ |
| ১,০০,০০০ | ১২,০০,০০০ | ৪,০০,০০০ | ৮,০০,০০০ | ৪৫,০০০ |
| ১,৫০,০০০ | ১৮,০০,০০০ | ৫,০০,০০০ (সর্বোচ্চ) | ১৩,০০,০০০ | ১,৩০,০০০ |
সারণিটা দেখার মতো একটা জায়গা হলো মাসে ৫০ থেকে ৫৬ হাজারের মাঝামাঝি বেতন। এখানে হিসাবে কর ৫ হাজারের কম আসে, কিন্তু নির্দেশিকা বলছে করমুক্ত সীমার ওপরে আয় থাকলে কর ৫,০০০ টাকার কম হলেও ৫,০০০ টাকা দিতে হবে। প্রথমবারের করদাতা হলে ন্যূনতম কর ১,০০০ টাকা, তাই তিনি হিসাবের অঙ্কটাই দেবেন। দেশের যেকোনো এলাকায় এই ন্যূনতম কর একই।
৩. নারী, প্রবীণ আর অন্য বিশেষ করদাতার সীমা
নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার করমুক্ত সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একই এক-তৃতীয়াংশ ছাড় ধরলে বেসরকারি চাকরিতে বছরে ৬,৭৫,০০০ টাকা, মানে মাসে ৫৬,২৫০ টাকা পর্যন্ত বেতনে কর নেই।
| করদাতা | করমুক্ত সীমা | বেসরকারি চাকরিতে মাসিক বেতনের সীমা (বোনাস ছাড়া) |
|---|---|---|
| সাধারণ করদাতা | ৪,০০,০০০ | ৫০,০০০ |
| নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী | ৪,৫০,০০০ | ৫৬,২৫০ |
| তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী | ৫,২৫,০০০ | ৬৫,৬২৫ |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা | ৫,৫০,০০০ | ৬৮,৭৫০ |
প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের মা-বাবা অথবা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তানের জন্য সীমা আরও ৫০,০০০ টাকা বেশি। মা-বাবা দুজনই করদাতা হলে সুবিধাটা একজন নেবেন।
৪. সরকারি চাকরিজীবীদের আয়কর হিসাব আলাদা কেন
সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ ছাড়ের হিসাব চলে না। নির্দেশিকার উদাহরণে তাঁদের করযোগ্য আয় ধরা হয়েছে মূল বেতন, উৎসব বোনাস আর ইনসেনটিভ বোনাস। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা বাংলা নববর্ষ ভাতার মতো বেতন আদেশে থাকা ভাতাগুলোয় কর লাগেনি।
ধরুন মূল বেতন মাসে ২৫,০০০ টাকা আর দুটি উৎসব বোনাস মূল বেতনের সমান। বছরে করযোগ্য ১২ গুণ ২৫,০০০ যোগ ৫০,০০০, মোট ৩,৫০,০০০ টাকা, যা ৪ লাখের নিচে। এভাবে নিজের মূল বেতন আর বোনাস যোগ করে দেখুন ৪ লাখ পার হয় কি না। তবে মনে রাখবেন, গণকর্মচারী হলে আয় সীমার নিচে থাকলেও রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৫. কর না লাগলেও কি রিটার্ন দিতে হবে, আর কীভাবে মেলাবেন
নির্দেশিকা অনুযায়ী আয় করমুক্ত সীমা পার হলে রিটার্ন দিতে হয়। এর বাইরে গণকর্মচারী, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী, আর ব্যবসায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মীদের আয় যা-ই হোক, রিটার্ন দিতে হয়। বেতন সীমার নিচে হলেও এই তালিকায় পড়লে রিটার্ন দিন, তাতে কর শূন্য দেখাবে।
- ১বছরের মোট বেতন বের করুনজুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ সময়ের বেতন বিবরণী অফিস থেকে নিন। সব ভাতা আর বোনাস যোগ করুন।
- ২করমুক্ত অংশ বাদ দিনবেসরকারি চাকরিতে মোট অঙ্কের এক-তৃতীয়াংশ বা ৫ লাখ টাকা, যেটি কম। সরকারি বেতন আদেশে থাকলে শুধু করযোগ্য অংশগুলো ধরুন।
- ৩অন্য আয় যোগ করুনবাড়িভাড়া, ব্যাংক সুদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থাকলে সেগুলোও যোগ হবে। তখন বেতন কম হলেও মোট আয় সীমা পেরোতে পারে।
- ৪ধাপ অনুযায়ী কর ধরুনপ্রথম ৪ লাখে শূন্য, তারপর ১০%, ১৫% এভাবে। বিনিয়োগ রেয়াত বাদ দিন, তবে ন্যূনতম করের নিচে নামবে না। অফিস বেতন থেকে যে কর কেটেছে, তা বাদ দিয়ে বাকিটা রিটার্নের সঙ্গে দিন।
এই সব অঙ্ক ২০২৬-২৭ করবর্ষের, অর্থাৎ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বেতনের। জুলাই ২০২৬ থেকে যে বেতন পাচ্ছেন, তার রিটার্ন পরের বছর। সেই বছরের হার আর ছাড় এনবিআরের পরের নির্দেশিকায় মিলিয়ে নেবেন। সরকারি চাকরিতে নতুন পে স্কেল হলে মূল বেতন বদলাবে, হিসাবও বদলাবে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
মাসিক কত টাকা বেতন হলে আয়কর দিতে হবে?
মাসে ৫৫ হাজার টাকা বেতনে কত কর?
অফিস তো বেতন থেকে কর কেটে রাখে, তবু রিটার্ন লাগবে?
কত টাকা বেতন হলে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় সরকারি চাকরিতে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।