
সংক্ষেপে
প্রবাসীদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম বুঝতে আগে দেখতে হয় আয়বর্ষে আপনি নিবাসী না অনিবাসী। আয়কর আইন অনুযায়ী বছরে ১৮৩ দিন বা তার বেশি দেশে থাকলে, অথবা বছরে ৯০ দিন আর আগের ৪ বছরে মোট ৩৬৫ দিন থাকলে আপনি নিবাসী। এর কম হলে অনিবাসী, আর অনিবাসীর শুধু বাংলাদেশে উদ্ভূত বা প্রাপ্ত আয় করের আওতায় আসে, বিদেশের বেতন নয়।
বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ভিত্তি বা স্থায়ী স্থাপনা নেই এমন অনিবাসী ব্যক্তির রিটার্ন আইনে বাধ্যতামূলক নয়। তবে দেশে ফ্ল্যাট কেনা বা বড় অঙ্কের সঞ্চয়পত্রের মতো কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগে। তখন বিদেশে বসেই ইমেইলে OTP নিয়ে e-Return-এ রিটার্ন দেওয়া যায়।
প্রবাসীদের জন্য ইমেইল যাচাই দিয়ে বিশেষ নিবন্ধনের ব্যবস্থা আছে।
এই লেখায়
১. আগে দেখুন আপনি নিবাসী না অনিবাসী
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২ ধারায় নিবাসীর সংজ্ঞা দেওয়া আছে। পাসপোর্টে কোন দেশের ভিসা, তা দিয়ে নয়, হিসাব হয় আয়বর্ষে (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) আপনি কত দিন বাংলাদেশে ছিলেন তা দিয়ে।
| আয়বর্ষে দেশে অবস্থান | আপনার মর্যাদা |
|---|---|
| ১৮৩ দিন বা তার বেশি | নিবাসী |
| ৯০ দিন বা তার বেশি, এবং আগের ৪ বছরে মোট ৩৬৫ দিন বা তার বেশি | নিবাসী |
| ৯০ দিনের কম | অনিবাসী |
| ৯০ দিনের বেশি কিন্তু আগের ৪ বছরে মোট ৩৬৫ দিনের কম | অনিবাসী |
উদাহরণ: সৌদি আরবে কাজ করা করিম ভাই এ বছর ছুটিতে ৪০ দিন দেশে ছিলেন। তিনি অনিবাসী। আর মালয়েশিয়া ফেরত সুমি আপা দেশে ফিরে ২০০ দিন আছেন, এ বছর তিনি নিবাসী, তাঁর ক্ষেত্রে সাধারণ করদাতার নিয়ম খাটবে।
২. প্রবাসী হলে কোন আয়ে কর, কোনটায় নয়
আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী অনিবাসী ব্যক্তির মোট আয়ে ধরা হয় শুধু সেই আয়, যা বাংলাদেশে উপচিত বা উদ্ভূত, অথবা বাংলাদেশে তাঁর বা তাঁর পক্ষে গৃহীত। বিদেশে কাজ করে বিদেশে পাওয়া বেতন এতে পড়ে না।
- দেশে বাড়ি বা দোকান ভাড়া দিয়ে যে আয়, তা বাংলাদেশে উদ্ভূত আয়।
- দেশের ব্যাংকে জমার সুদ আর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, যেখান থেকে সাধারণত উৎসে কর কাটা হয়।
- দেশে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির লাভ।
- ২০২৬-২৭ অর্থবিলের করহার তফসিলে অনিবাসী বাংলাদেশিদেরও সাধারণ করধাপের আওতায় রাখা হয়েছে, তাই দেশের আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে কর আসে না। সাধারণ করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা।
বিদেশে উপার্জন করে বৈধ পথে দেশে আনা টাকাও আলাদা করে করমুক্ত। ষষ্ঠ তফসিলের দফা ১৭ বলছে, বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে যে আয় করেন এবং রেমিট্যান্সের প্রচলিত আইন মেনে দেশে আনেন, তা মোট আয়ে ধরা হয় না। আইনের ৭৬(৫) ধারায় রিটার্ন না দিলে অব্যাহতি হারানোর যে নিয়ম আছে, দফা ১৭ তার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রিটার্ন না দিলেও ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা বিদেশি আয়ের অব্যাহতি থাকে।
ষষ্ঠ তফসিলের দফা ৩৫ অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী, মা-বাবা বা সন্তানের কাছ থেকে উপহার করমুক্ত, যদি দাতা ও গ্রহীতার রিটার্নে দেখানো থাকে। তবে বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো হলে দাতার রিটার্নে দেখানোর শর্ত খাটে না। তাই বৈধ পথে টাকা পাঠান আর পরিবারের রিটার্নে তা উপহার হিসেবে দেখাতে বলুন।
৩. প্রবাসীদের রিটার্ন কখন বাধ্যতামূলক নয়, কখন লাগে
আয়কর আইনের ১৬৬(২) ধারায় যাদের রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, সেই তালিকায় আছেন বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ভিত্তি নেই এমন অনিবাসী ব্যক্তি। ২০২৬-২৭ অর্থবিলে এই শব্দ বদলে স্থায়ী স্থাপনা (permanent establishment) করা হয়েছে। দেশে আপনার অফিস বা ব্যবসার স্থায়ী জায়গা না থাকলে সাধারণত এই ছাড় পাবেন।
কিন্তু আইনের ২৬৪ ধারা বলছে, কিছু কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) দেখাতেই হবে, অন্য ধারায় যা-ই থাকুক। প্রবাসীদের প্রায়ই যেসব কাজে এটি লাগে:
- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা-বেচা, বায়না বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধন
- ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনা
- ১০ লাখ টাকার বেশি মেয়াদি আমানত খোলা ও বহাল রাখা
- ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ নেওয়া
এসব কাজের পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই রিটার্ন দিন। তালিকা অর্থ আইনে মাঝে মাঝে বদলায়, তাই কাজের আগে এনবিআরের সর্বশেষ তালিকা দেখে নিন।
৪. প্রবাসীদের ই রিটার্ন: ইমেইলে OTP নিয়ে নিবন্ধন
সাধারণ নিয়মে e-Return নিবন্ধনে NID-তে বায়োমেট্রিক যাচাই করা বাংলাদেশি মোবাইল নম্বরে OTP আসে। বিদেশে সেই সিম বন্ধ থাকলে আটকে যেতেন অনেকে। এনবিআরের ২০২৬-২৭ নির্দেশিকায় এখন অনিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ইমেইল যাচাই দিয়ে বিশেষ নিবন্ধনের কথা আছে।
- ১TIN হাতে রাখুনরিটার্ন দিতে TIN লাগে। না থাকলে আগে ই-টিআইএন নিবন্ধন সেরে নিন।
- ২নিজের ইমেইল থেকে যাচাইয়ের অনুরোধ পাঠানবিডিনিউজ২৪-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী অনুরোধ যায় ereturn@etaxnbr.gov.bd ঠিকানায়। সঙ্গে দিন পাসপোর্ট, NID ও ভিসার পাতার কপি, বিদেশের ঠিকানা, বিদেশের ফোন নম্বর আর শেষবার দেশ ছাড়ার তারিখ।
- ৩ইমেইলে আসা OTP দিয়ে নিবন্ধনএনবিআর ইমেইল যাচাই করলে সেই ইমেইলে OTP আসে। তা দিয়ে নিবন্ধন সম্পূর্ণ করুন বা পাসওয়ার্ড বদলান।
- ৪রিটার্ন পূরণ করুনশুধু বাংলাদেশের আয়, উৎসে কাটা কর আর দেশের সম্পদ-দায় লিখুন। কর থাকলে অনলাইনে পরিশোধ করুন।
- ৫সনদ নামিয়ে রাখুনজমার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আর রিটার্ন জমার সনদ সঙ্গে সঙ্গে নামানো যায়, পরে জমি বা সঞ্চয়পত্রের কাজে লাগবে।
আয়কর আইনের ২ ধারায় কর দিবসের সংজ্ঞা অনুযায়ী উপার্জনের জন্য বৈধ ভিসা ও পারমিট নিয়ে বিদেশে থাকা ব্যক্তির রিটার্নের শেষ দিন দেশে ফেরার দিন থেকে ৯০তম দিন। উচ্চশিক্ষার ছুটিতে বা চাকরির প্রেষণে বিদেশে থাকলেও একই নিয়ম। অন্যদের জন্য সাধারণ তারিখ ৩০ নভেম্বর, আর প্রথমবার রিটার্ন দিলে পরের ৩০ জুন।
৫. অনেকে যা জানতে চান
প্রবাসীদের কি আয়কর রিটার্ন দিতে হয়?
প্রবাসীদের রিটার্ন দাখিলের নিয়ম কী?
বিদেশের আয়ে কি বাংলাদেশে কর দিতে হবে?
প্রবাসী আয়কর রিটার্ন কি অনলাইনেই দিতে হবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।