আয়কর ও ই-টিআইএন

ফ্রিল্যান্সিং আর ইউটিউবের আয়ে কি ট্যাক্স লাগে: জুন ২০২৭ পর্যন্ত করমুক্ত, তবে রিটার্ন দিতেই হবে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
ফ্রিল্যান্সিং আর ইউটিউবের আয়ে কি ট্যাক্স লাগে: জুন ২০২৭ পর্যন্ত করমুক্ত, তবে রিটার্ন দিতেই হবে

সংক্ষেপে

এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রির মতো কাজের আয় করমুক্ত। শর্ত একটাই: সব আয় শতভাগ ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে। সুবিধাটি নিবাসী ব্যক্তি আর অনিবাসী বাংলাদেশি, দুজনের জন্যই।

করমুক্ত মানে রিটার্ন থেকে ছুটি নয়। একই নির্দেশিকায় বলা আছে, কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় থাকলে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, আর রিটার্নে সেই আয় উল্লেখ করতে হয়। তাই ইউটিউব, আপওয়ার্ক বা ফাইভারের আয়ে কর না লাগলেও বছর শেষে ই-রিটার্ন দিন।

ই-রিটার্নে করমুক্ত আয় দেখান

ই-রিটার্নের আয়ের পাতায় করমুক্ত আয়ের জন্য Tax Exempted Income নামে আলাদা অংশ আছে।

e-Return খুলুন
এই লেখায়
  1. কোন আয় করমুক্ত, শর্তটা কী
  2. কর না লাগলেও রিটার্ন কেন দিতে হবে
  3. ই-রিটার্নে ফ্রিল্যান্সিং আয় দেখাবেন যেভাবে
  4. যে আয় এই ছাড়ের বাইরে
  5. রিটার্নের আগে যা গুছিয়ে রাখবেন
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. কোন আয় করমুক্ত, শর্তটা কী

আয়কর নির্দেশিকার করমুক্ত আয়ের তালিকায় একটি দফায় কিছু ব্যবসার আয়কে ছাড় দেওয়া হয়েছে। সময়সীমা ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৭। তালিকায় যেসব কাজ আছে, তার কয়েকটি:

  • ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন
  • সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও কাস্টমাইজেশন, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস, সফটওয়্যার টেস্ট ল্যাব সার্ভিস
  • মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব লিস্টিং, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট ও সার্ভিস
  • ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল অ্যানিমেশন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি ও প্রসেসিং
  • ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, এআই ও ব্লকচেইনভিত্তিক সলিউশন
  • আইটি সহায়তা ও সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ই-পাবলিকেশন, কল সেন্টার, ডকুমেন্ট কনভারশন ও ডিজিটাল আর্কাইভিং

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, আগে শুধু আইটি ফ্রিল্যান্সিংয়ে ছাড় ছিল, এখন তা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আর কনটেন্ট তৈরির আয়ে বাড়ানো হচ্ছে। এনবিআরের নতুন নির্দেশিকার তালিকায় ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন এখন আলাদা দফা হিসেবে আছে।

হুন্ডি বা নগদে আনলে ছাড় নেই

ছাড়ের শর্ত হলো সব আয় শতভাগ ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসা। হুন্ডি, হাতে হাতে নগদ বা অন্যের মাধ্যমে আনা টাকায় এই সুবিধা দাবি করা ঝুঁকিপূর্ণ। প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজের নামের ব্যাংক হিসাবে টাকা আনুন, যাতে প্রতিটি লেনদেনের প্রমাণ থাকে।

২. কর না লাগলেও রিটার্ন কেন দিতে হবে

আয়কর নির্দেশিকায় যেসব ক্ষেত্রে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক তার তালিকা আছে। সেখানে স্পষ্ট লেখা, কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা হ্রাসকৃত হারে করযোগ্য আয় থাকলে রিটার্ন দিতে হবে। নির্দেশিকার আরেক জায়গায় বলা আছে, করমুক্ত আয় থাকলে তা রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে।

রিটার্ন দিলে আরেকটি লাভও আছে। বছর বছর আয় দেখানো থাকলে পরে জমি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কেনার সময় টাকার উৎস দেখানো সহজ হয়। ব্যাংক ঋণ বা অনেক সরকারি সেবায় রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) চাওয়া হয়, যা রিটার্ন দিলেই পাওয়া যায়।

কখন রিটার্ন দিচ্ছেন (২০২৬-২৭ করবর্ষ)ফল
১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬প্রণোদনাও নেই, বাড়তি করও নেই
১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭প্রদেয় করের ২% অথবা ৩,০০০ টাকা, যেটি বেশি, বাড়তি কর
১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন ২০২৭প্রদেয় করের ৫% অথবা ৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি, বাড়তি কর
৩০ জুন ২০২৭-এর পর, নিজে থেকেপ্রদেয় করের ১০% অথবা ৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি, বাড়তি কর

৩. ই-রিটার্নে ফ্রিল্যান্সিং আয় দেখাবেন যেভাবে

  • ১
    TIN আর ই-রিটার্ন নিবন্ধন সেরে নিনরিটার্ন দিতে TIN লাগে। না থাকলে আগে ই-টিআইএন নিন, তারপর নিজের NID দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে etaxnbr.gov.bd-তে নিবন্ধন করুন।
  • ২
    বছরের আয়ের কাগজ জোগাড় করুন১ জুলাই থেকে ৩০ জুনের প্ল্যাটফর্ম আয়ের বিবরণী (আপওয়ার্ক, ফাইভার, ইউটিউবের পেমেন্ট রিপোর্ট), আর যে ব্যাংক হিসাবে টাকা এসেছে তার বিবরণী ও ব্যাংকের দেওয়া বৈদেশিক আয় প্রাপ্তির সনদ হাতে রাখুন।
  • ৩
    আয়ের পাতায় করমুক্ত অংশে লিখুনIncome অংশে Tax Exempted Income নামে আলাদা ট্যাব আছে। ব্যাংকে আসা ফ্রিল্যান্সিং আয় সেখানে দেখান। কোন ঘরে লিখবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে এনবিআরের কল সেন্টারে ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১ নম্বরে জিজ্ঞেস করে নিন।
  • ৪
    অন্য আয় আলাদা করে দেখানব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের সুদ, বাড়িভাড়া, চাকরির বেতনের মতো আয় করমুক্ত নয়। এগুলো নিজ নিজ খাতে লিখুন। উৎসে কাটা কর থাকলে তার সনদও যোগ করুন।
  • ৫
    সম্পদ ও খরচ মিলিয়ে জমা দিনজীবনযাপনের খরচ আর সম্পদ-দায়ের পাতায় বছরের সঞ্চয়, কেনা ল্যাপটপ বা ব্যাংকের জমা লিখুন। আয়ের সঙ্গে সম্পদের বৃদ্ধি মিলছে কি না দেখে সাবমিট করুন, তারপর প্রাপ্তি স্বীকারপত্র নামিয়ে রাখুন।

৪. যে আয় এই ছাড়ের বাইরে

ছাড়টা নির্দিষ্ট কাজের আয়ের জন্য, আপনার সব আয়ের জন্য নয়। নিচের আয়গুলোতে সাধারণ নিয়মে কর হিসাব হবে:

  • ফ্রিল্যান্সিং থেকে জমানো টাকার ব্যাংক সুদ, এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা।
  • বাড়ি বা দোকান ভাড়ার আয়, জমি বা শেয়ার বিক্রির লাভ।
  • পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে সেই বেতন।
  • ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া অন্য পথে আসা আয়, কারণ সেখানে ছাড়ের শর্ত পূরণ হয় না।

এসব আয় মিলিয়ে করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা পার হলে কর দিতে হবে। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা, নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সাড়ে ৪ লাখ টাকা।

জুন ২০২৭-এর পর কী হবে

নির্দেশিকায় ছাড়ের শেষ তারিখ ৩০ জুন ২০২৭। এরপর সুবিধা থাকবে কি না, তা ঠিক হবে পরের বাজেট আর অর্থ আইনে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেট এলে এনবিআরের নতুন নির্দেশিকা দেখে নেবেন।

৫. রিটার্নের আগে যা গুছিয়ে রাখবেন

ফ্রিল্যান্সারের রিটার্নের কাগজ

টাকা আসার সময় ব্যাংক হিসাবে নিজের নাম আর প্ল্যাটফর্মে দেওয়া নাম একই রাখুন। নাম না মিললে পরে আয়ের উৎস প্রমাণে ঝামেলা হয়।

৬. অনেকে যা জানতে চান

ইউটিউব বা ফেসবুকের আয়ও কি করমুক্ত?
এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এর তালিকায় ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েশনও আছে। শর্ত হলো আয় শতভাগ ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে, আর ছাড়ের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত।
সব আয় করমুক্ত, তবু কি রিটার্ন দিতে হবে?
হ্যাঁ। নির্দেশিকায় যেসব ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক তার মধ্যে কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় থাকা একটি। রিটার্নে আয়টি করমুক্ত আয় হিসেবে দেখাবেন।
বিকাশ বা নগদে আনা আয়ে কি ছাড় মিলবে?
নির্দেশিকায় শর্তটি লেখা আছে ব্যাংক ট্রান্সফারের কথা বলে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সরাসরি আনা আয় এর মধ্যে পড়ে কি না, স্পষ্ট বলা নেই। ঝুঁকি এড়াতে নিজের নামের ব্যাংক হিসাবে আয় আনুন, আর সন্দেহ থাকলে কর অঞ্চলে লিখিতভাবে জেনে নিন।
দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করে দিলে সেই আয়ও কি করমুক্ত?
ছাড়টি তালিকায় থাকা কাজের আয়ের জন্য, ক্লায়েন্ট দেশি না বিদেশি তা আলাদা করে বলা নেই। তবে শতভাগ ব্যাংক ট্রান্সফারের শর্ত এখানেও খাটে। প্রতিষ্ঠান উৎসে কর কেটে থাকলে তার সনদ নিয়ে রাখুন এবং কর অফিসে পরামর্শ নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন