
সংক্ষেপে
বেতন, ব্যাংক সুদ বা সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে যে কর কাটা হয়, তা আপনার আসল করের চেয়ে বেশি হলে বাড়তি অংশ ফেরত পাওয়ার অধিকার আছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২২৪ ধারায় এই অধিকার দেওয়া আছে। ফেরত পেতে রিটার্ন দাখিল করতে হয় এবং রিটার্নে নিজের ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে হয়।
উপ কর কমিশনার রিটার্ন প্রক্রিয়া শেষ করে ফেরতযোগ্য অঙ্ক পেলে আইনের ২১৫ ধারা অনুযায়ী তা ৬০ দিনের মধ্যে রিটার্নে উল্লেখ করা ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক উপায়ে পাঠানোর কথা। আগের কোনো বকেয়া কর থাকলে সেটি আগে কেটে রাখা হয়। টাকা না এলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে দাবি করা যায়।
রিটার্ন জমার সময় উৎসে কাটা কর দাবি করলে ই-রিটার্নই পরিশোধযোগ্য বা ফেরতযোগ্য অঙ্ক দেখায়।
এই লেখায়
১. কখন আয়কর ফেরত পাওনা হয়
সহজ হিসাব: বছরে আপনার নামে মোট যত কর জমা হয়েছে, তা থেকে আইন অনুযায়ী প্রকৃত কর বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই ফেরতযোগ্য। জমা হওয়া করের মধ্যে পড়ে উৎসে কাটা কর, অগ্রিম কর আর রিটার্নের সঙ্গে দেওয়া কর। ২২৪ ধারা বলছে, এক বছরে দেওয়া বা দেওয়া বলে গণ্য কর ওই বছরের দাবি করা করের চেয়ে বেশি হলে উপ কর কমিশনারকে সন্তুষ্ট করতে পারলে বাড়তি অঙ্ক ফেরত পাবেন।
একটা উদাহরণ ধরুন। নাসরিন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বছরে তাঁর বেতন থেকে ২৪ হাজার টাকা আর এফডিআরের সুদ থেকে ৬ হাজার টাকা কাটা হয়েছে, মোট ৩০ হাজার। রিটার্নে আয়, ছাড় আর রেয়াত হিসাব করে দেখা গেল তাঁর প্রকৃত কর ২২ হাজার টাকা। বাকি ৮ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য।
উৎসে কাটা কর রিটার্নে নিজে দাবি করতে হয়। এনবিআরের ই-রিটার্ন প্রশ্নোত্তর অনুযায়ী ব্যাংক সুদ বা সঞ্চয়পত্রের কাটা কর e-Return Ledger-এর Claim source tax অংশে Sync From Income চেপে তুলতে হয়।
২. কাদের ফেরত পাওনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
নিচের যেকোনো একটি আপনার সঙ্গে মিললে রিটার্ন জমার আগে হিসাবটা ভালো করে দেখুন। ফেরত হবে কি না, তা ঠিক হবে আপনার মোট আয়, ছাড় আর কাটা করের অঙ্ক মিলিয়ে।
- মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে, যা ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার জন্য ৪ লাখ টাকা, অথচ ব্যাংক সুদ বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর কাটা হয়েছে।
- বছরের মাঝখানে চাকরি বদলেছেন, আর দুই অফিসই পুরো বছরের আয় ধরে কর কেটেছে।
- বিনিয়োগ বা দানের রেয়াত অফিস হিসাবে না ধরেই মাসে মাসে কর কেটেছে।
- আগের বছরে অগ্রিম কর বা রিটার্নের সঙ্গে কর বেশি দিয়ে ফেলেছিলেন।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা কর এখন রিটার্নে সমন্বয় করা যায়, সেই হিসাব আমাদের সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর নিয়ে লেখায় আলাদা করে দেওয়া আছে।
৩. আয়কর ফেরত পাওয়ার নিয়ম: ধাপগুলো
- ১কাটা করের প্রমাণ জোগাড় করুনঅফিসের উৎসে কর কর্তনের সনদ, ব্যাংকের সুদের বিবরণী আর সঞ্চয়পত্রের প্রত্যয়নপত্র নিন। অঙ্ক আর তারিখ যেন আয়ের তথ্যের সঙ্গে মেলে।
- ২রিটার্নে আয় আর কাটা কর একই রকম লিখুনআয়ের অংশে যে সুদ দেখাবেন, কর দাবির অংশেও সেই অঙ্কের কাটা কর দেখান। এনবিআরের প্রশ্নোত্তর বলছে, দুই জায়গায় আলাদা তথ্য দিলে Bank TDS claimed more than declared income ধরনের ত্রুটি দেখায়।
- ৩ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিনআইনে ফেরতের টাকা যায় রিটার্নে উল্লেখ করা ব্যাংক হিসাবে। নিজের নামের সচল হিসাবের নম্বর, ব্যাংক আর শাখা নির্ভুল লিখুন।
- ৪জমা দিয়ে কপি রাখুনপ্রাপ্তিস্বীকারপত্র আর রিটার্নের কপি নামিয়ে রাখুন। ফেরত না এলে এগুলোই লাগবে।
আগের বছরের বেশি দেওয়া কর এ বছরের করের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইলে e-Return Ledger-এর বাঁ পাশের Adjustment of tax refund মেনু ব্যবহার করা যায়। এনবিআর জানিয়েছে, উপ কর কমিশনার পরে যাচাই করার পরই এই সমন্বয় পুরোপুরি কার্যকর হয়।
৪. ফেরতের টাকা কবে আসে, কেন কম আসতে পারে
রিটার্ন জমা দেওয়ার পর উপ কর কমিশনার ১৮১ ধারায় সেটি প্রক্রিয়া করেন। গাণিতিক ভুল বা রিটার্ন থেকেই স্পষ্ট এমন ভুল দাবি থাকলে ঠিক করে আয় ও কর নতুন করে হিসাব হয়, তারপর উৎসে কাটা ও অগ্রিম করের ক্রেডিট দিয়ে পরিশোধযোগ্য বা ফেরতযোগ্য অঙ্ক ঠিক হয়। হিসাবে ফেরত কমে গেলে আপনাকে নোটিশ দিয়ে লিখিত ব্যাখ্যার সুযোগ দেওয়ার কথা।
| পরিস্থিতি | আইনে যা বলা আছে |
|---|---|
| রিটার্ন প্রক্রিয়ায় ফেরতযোগ্য অঙ্ক পাওয়া গেছে | ৬০ দিনের মধ্যে রিটার্নে দেওয়া ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক উপায়ে (ধারা ২১৫) |
| আপনার আগের কোনো বকেয়া কর আছে | ফেরতের আগে সেই বকেয়া সমন্বয় করা হয়, সমন্বিত অঙ্ক পরিশোধিত বলে গণ্য (ধারা ২২৫) |
| আপিল বা অন্য আদেশে ফেরত পাওনা হয়েছে | দাবি ছাড়াই ৬০ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা (ধারা ২২৯) |
| ফেরত ব্যাংকে আসেনি | নির্ধারিত পদ্ধতিতে দাবি করা যায় (ধারা ২২৬) |
আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১৫% বেশি আয় দেখালে সাধারণত অডিটে বাছাই না করার যে সুবিধা ১৮২ ধারায় আছে, ফেরত দাবি করা রিটার্নে তা প্রযোজ্য নয়। তাই কাটা করের প্রতিটি সনদ গুছিয়ে রাখুন।
৫. আয়কর ফেরত বিলম্ব হলে কী করবেন
- প্রথমে ই-রিটার্নে লগইন করে আপনার রিটার্নের অবস্থা আর কোনো নোটিশ এসেছে কি না দেখুন। হিসাব বদলালে নোটিশেই কারণ লেখা থাকে।
- রিটার্নে দেওয়া ব্যাংক হিসাব সচল আছে কি না, নাম মেলে কি না, ব্যাংকে খোঁজ নিন।
- এনবিআরের কল সেন্টারে ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১ নম্বরে ফোন করুন। ছুটির দিন বাদে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আয়কর কর্মকর্তারা ই-রিটার্নের প্রশ্নের উত্তর দেন। অনলাইনে ই-রিটার্ন সাপোর্টে টিকিটও খোলা যায়।
- তবু সমাধান না হলে টিআইএন সনদে লেখা নিজের কর সার্কেলে লিখিতভাবে ফেরতের দাবি জমা দিন, সঙ্গে রিটার্ন, প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আর কাটা করের সনদের কপি দিন। রিসিভ কপি রাখুন।
করদাতা মারা গেলে বা অক্ষম হলে তাঁর পাওনা ফেরত দাবি করতে পারেন আইনগত প্রতিনিধি, অভিভাবক বা ট্রাস্টি, ২২৭ ধারায় তা বলা আছে। আর মনে রাখবেন, ফেরতের দাবির মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া কর নির্ধারণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলা যায় না, সেটা আলাদা আপিলের বিষয়।
৬. অনেকে যা জানতে চান
আয়কর ফেরত পেতে কি রিটার্ন দিতে হয়?
আয়কর ফেরত কত দিনে পাওয়া যায়?
আয়কর ফেরত কোন হিসাবে বসে?
আগের বছরের বাড়তি কর কি এ বছরে সমন্বয় করা যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।