আয়কর ও ই-টিআইএন

কর রেয়াত ২০২৬-২৭: কোন বিনিয়োগে রেয়াত, কত টাকা রাখলে পুরো সুবিধা

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
কর রেয়াত ২০২৬-২৭: কোন বিনিয়োগে রেয়াত, কত টাকা রাখলে পুরো সুবিধা

সংক্ষেপে

২০২৬-২৭ করবর্ষে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত হবে তিনটির মধ্যে যেটি কম: করমুক্ত ও বিশেষ হারের আয় বাদ দিয়ে মোট আয়ের ৩%, বছরে রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১০%, অথবা ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭-এর উদাহরণে এই হিসাবই দেখানো হয়েছে। এর আগে আইনে বিনিয়োগের ১৫% আর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ছিল।

রেয়াতযোগ্য খাত ১৩টি, যেমন জীবনবিমার প্রিমিয়াম, ভবিষ্য তহবিল, ডিপিএসে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত, সঞ্চয়পত্রসহ সরকারি সিকিউরিটিজে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, সর্বজনীন পেনশন আর তালিকাভুক্ত শেয়ারে নতুন বিনিয়োগ। হিসাবের সহজ কথা: বিনিয়োগ আয়ের ৩০ শতাংশে পৌঁছালেই রেয়াত সর্বোচ্চ হয়, এর বেশি রাখলে রেয়াত আর বাড়ে না।

ই-রিটার্নের Rebate পাতা

রিটার্নের Rebate অংশে খাত বেছে বছরের বিনিয়োগ লিখলে রেয়াত নিজে হিসাব হয়।

e-Return খুলুন
এই লেখায়
  1. রেয়াত কত হবে: তিন হিসাবের সবচেয়ে কম
  2. কোন খাতে বিনিয়োগ করলে রেয়াত মেলে
  3. কত টাকা বিনিয়োগ করলে পুরো রেয়াত পাবেন
  4. ই-রিটার্নে দাবি আর প্রমাণপত্র
  5. যে ভুলে রেয়াত বাতিল হয় বা ফেরত দিতে হয়
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. রেয়াত কত হবে: তিন হিসাবের সবচেয়ে কম

রেয়াত মানে বিনিয়োগের জন্য আপনার হিসাব করা কর থেকে কিছু টাকা বাদ পাওয়া। আয়কর আইনের ৭৮ ধারায় সূত্রটি আছে, আর এনবিআরের ২০২৬-২৭ করবর্ষের নির্দেশিকায় হার এমন:

হিসাবকীভাবে বের করবেন
(ক) আয়ের ৩%মোট আয় থেকে করমুক্ত আয়, হ্রাসকৃত হারের আয়, ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘের শেয়ার আয় আর চূড়ান্ত করদায়ের আয় বাদ দিয়ে যা থাকে, তার ৩%
(খ) বিনিয়োগের ১০%আয়বর্ষে রেয়াতযোগ্য খাতে মোট বিনিয়োগ ও ব্যয়ের ১০%
(গ) সর্বোচ্চ সীমা৭,৫০,০০০ টাকা

তিনটির মধ্যে যেটি কম, সেটিই আপনার রেয়াত। আগে আইনের ৭৮ ধারায় দ্বিতীয় হিসাবটি ছিল বিনিয়োগের ১৫% আর সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধা কমানো হয়েছে, তাই পুরোনো লেখা বা ক্যালকুলেটর দেখে হিসাব করলে রেয়াত বেশি দেখাবে।

কর না থাকলে রেয়াতও নেই

রেয়াত পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো করদায় থাকা। আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে বিনিয়োগ যত বেশিই হোক, রেয়াতের প্রশ্ন আসে না। আর রেয়াত বাদ দেওয়ার পর কর ন্যূনতম করের চেয়ে কম হলে ন্যূনতম করই দিতে হয়।

২. কোন খাতে বিনিয়োগ করলে রেয়াত মেলে

নির্দেশিকায় রিটার্নে দেখানোর জন্য রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের সারণী দেওয়া আছে। খাত আর সীমা:

খাতসীমা বা শর্ত
জীবনবিমার প্রিমিয়াম বা চুক্তিভিত্তিক ডেফার্ড অ্যানুইটিবাংলাদেশে পরিশোধিত হতে হবে
প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাক্ট, ১৯২৫ প্রযোজ্য তহবিলে (যেমন জিপিএফ) চাঁদানিজের চাঁদা
স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে চাঁদানিজের ও নিয়োগকর্তার চাঁদা
অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিলে চাঁদাঅনুমোদিত তহবিল হতে হবে
সঞ্চয়পত্রসহ সরকারি সিকিউরিটিজঅনধিক ৫ লাখ টাকা
ইউনিট সার্টিফিকেট, মিউচুয়াল ফান্ড, ইটিএফ বা যৌথ বিনিয়োগ স্কিমনতুন বিনিয়োগ
ডিপোজিট পেনশন বা মাসিক সঞ্চয় স্কিম (ডিপিএস)অনধিক ১,২০,০০০ টাকা
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের চাঁদাযেকোনো পরিমাণ
স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজনতুন বিনিয়োগ
দাতব্য হাসপাতাল বা প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংগঠনে দানসংগঠনটি সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যে স্থাপিত হতে হবে
যাকাত তহবিলে চাঁদা বা দানই-রিটার্নে ঘরটির নাম যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩-এর অধীন তহবিল
কল্যাণ তহবিল বা গোষ্ঠী বিমা তহবিলে চাঁদাপ্রদত্ত চাঁদার প্রমাণ রাখুন
বোর্ড অনুমোদিত জনকল্যাণমূলক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুদানএনবিআরের অনুমোদন থাকতে হবে

এফডিআর, জমি বা ফ্ল্যাট কেনা, সোনা কেনা এই তালিকায় নেই, তাই এগুলোতে রেয়াত মেলে না। শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিপিএসের ক্ষেত্রে আয়বর্ষে নতুন করে যা রেখেছেন সেটুকুই ধরা হয়, আগের বছরের জমা টাকা নয়।

৩. কত টাকা বিনিয়োগ করলে পুরো রেয়াত পাবেন

আয়ের ৩% আর বিনিয়োগের ১০% সমান হয় তখনই, যখন বিনিয়োগ ওই আয়ের ৩০%। তাই নিয়মটা মনে রাখুন: রেয়াতের হিসাবে ধরা আয়ের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগে রেয়াত বাড়তে থাকে, এর বেশি বিনিয়োগে বাড়ে না। আয় আড়াই কোটি টাকার বেশি হলে ৭.৫ লাখ টাকার সীমায় আটকে যাবে।

  • ১
    রেয়াতের জন্য আয় ঠিক করুনএনবিআরের নির্দেশিকার উদাহরণে একজন সরকারি কর্মচারীর এই হিসাবের মোট আয় ৭,৯১,০০০ টাকা, আর মোট কর ৪৩,৬৫০ টাকা।
  • ২
    বছরের বিনিয়োগ যোগ করুনভবিষ্য তহবিলে ১,৬৮,০০০, কল্যাণ তহবিলে ১,৮০০, গোষ্ঠী বিমায় ১,২০০ আর ডিপিএসে ৬০,০০০ টাকা মিলিয়ে বিনিয়োগ ২,৩১,০০০ টাকা।
  • ৩
    তিনটি অঙ্ক তুলনা করুনআয়ের ৩% হয় ২৩,৭৩০ টাকা, বিনিয়োগের ১০% হয় ২৩,১০০ টাকা, সীমা ৭,৫০,০০০ টাকা। সবচেয়ে কম ২৩,১০০ টাকা, এটাই রেয়াত। প্রদেয় কর দাঁড়ায় ৪৩,৬৫০ থেকে ২৩,১০০ বাদে ২০,৫৫০ টাকা।
  • ৪
    বাড়তি বিনিয়োগের লাভ দেখুনএই করদাতা বিনিয়োগ ২,৩৭,৩০০ টাকা (আয়ের ৩০%) করলে রেয়াত হতো ২৩,৭৩০ টাকা, মাত্র ৬৩০ টাকা বেশি। এর ওপরে আরও বিনিয়োগ করলে রেয়াত আর বাড়ত না।

৪. ই-রিটার্নে দাবি আর প্রমাণপত্র

ই-রিটার্নের Rebate পাতায় Life Insurance Premium, Deposit Pension Scheme (DPS), Approved Sanchayapatra and Other Govt. Securities, Listed Stocks or Shares, Universal Pension Scheme, Zakat Fund-এর মতো খাত টিক দিয়ে অঙ্ক লিখতে হয়। মোট বিনিয়োগ দিলে সিস্টেম নিজেই রেয়াত হিসাব করে। অনলাইনে কাগজ জমা দিতে হয় না, কিন্তু কর অফিস চাইলে দেখাতে হবে।

যে প্রমাণ হাতে রাখবেন

৫. যে ভুলে রেয়াত বাতিল হয় বা ফেরত দিতে হয়

  • মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে বিনিয়োগ ভাঙালে: নির্দেশিকা অনুযায়ী বিনিয়োগের পুরো মেয়াদ ধরা হয়। আগে নগদায়ন করলে যে বছর ভাঙালেন, সে বছর আগে নেওয়া রেয়াতের অংশ বাড়তি কর হিসেবে দিতে হবে।
  • সীমার বেশি ধরলে: ডিপিএসে বছরে ১,২০,০০০ টাকা আর সরকারি সিকিউরিটিজে ৫ লাখ টাকার বেশি অংশ রেয়াতে ধরা যায় না।
  • পুরোনো বিনিয়োগ আবার দেখালে: আগের বছরের কেনা সঞ্চয়পত্র বা শেয়ার এ বছরের বিনিয়োগ নয়। সম্পদ বিবরণীতে থাকবে, রেয়াতের ঘরে নয়।
  • আয় ভুল ধরে হিসাব করলে: ৩% হিসাবে করমুক্ত আয়, হ্রাসকৃত হারের আয় বা চূড়ান্ত করদায়ের আয় যোগ করা যায় না। যেমন সরকারি বেতন আদেশের করমুক্ত ভাতা এই আয়ে ঢুকিয়ে দিলে রেয়াত বেশি দেখাবে।
এ বছরের বিনিয়োগ কবে পর্যন্ত গোনা যায়

২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্নে ধরা হয় ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ সময়ের বিনিয়োগ। এখন যা বিনিয়োগ করবেন, তা যাবে পরের বছরের রিটার্নে।

৬. অনেকে যা জানতে চান

সঞ্চয়পত্র কিনলে কত টাকা কর রেয়াত পাব?
বছরে সরকারি সিকিউরিটিজে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ রেয়াতযোগ্য। মোট রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১০% রেয়াত হয়, তবে তা আপনার রেয়াতের হিসাবের আয়ের ৩% আর ৭.৫ লাখ টাকার বেশি হবে না। ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা রেয়াত হতে পারে, যদি আয়ের ৩% তার চেয়ে বেশি হয়।
ডিপিএসে বছরে ২ লাখ টাকা রাখি। পুরোটা কি রেয়াতে ধরা যাবে?
না। ডিপিএস বা মাসিক সঞ্চয় স্কিমে বছরে সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ ধরা হয়। বাকি টাকা সম্পদ বিবরণীতে দেখাবেন।
৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে যে ছাড়, সেটা কি এই রেয়াত?
না, ওটা আলাদা। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে প্রদেয় করের ৫% অথবা ২৫,০০০ টাকা, যেটি কম, প্রণোদনা পাওয়া যায়। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সেই সময় পার হয়ে গেছে। বিনিয়োগ রেয়াত রিটার্ন যখনই দিন, পাবেন।
কর রেয়াতের হিসাব কি নিজে করতে হয়?
ই-রিটার্নে Rebate পাতায় খাতভিত্তিক বিনিয়োগ লিখলে সিস্টেম রেয়াত হিসাব করে। তবু ওপরের তিন হিসাব নিজে একবার মিলিয়ে নিন, যাতে ভুল অঙ্ক বা সীমার বেশি টাকা না বসে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন