আয়কর ও ই-টিআইএন

কৃষি আয় কি করমুক্ত: ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড় কখন পাবেন, কখন পাবেন না, আর হিসাব না রাখলে ৬০% খরচ ধরার নিয়ম

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬এনবিআর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১etaxnbr.gov.bd
কৃষি আয় কি করমুক্ত: ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড় কখন পাবেন, কখন পাবেন না, আর হিসাব না রাখলে ৬০% খরচ ধরার নিয়ম

সংক্ষেপে

কৃষি আয় পুরোপুরি করমুক্ত নয়, তবে ২০২৬-২৭ করবর্ষে একজন ব্যক্তির কৃষি থেকে আয়ের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয় থেকে বাদ যায়, যদি তাঁর কৃষি আর আর্থিক পরিসম্পদ (যেমন ব্যাংক সুদ) ছাড়া অন্য কোনো আয় না থাকে। দোকান, চাকরি বা অন্য ব্যবসার আয় থাকলে এই ছাড় মেলে না।

হাঁস-মুরগি, মাছ ও চিংড়ির হ্যাচারি, দুগ্ধজাত পণ্য বা বীজ বিপণনের মতো খাতে আলাদা একটি ছাড় আছে, সেখানেও সব মিলিয়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। দুই ছাড়ের শর্ত আলাদা, নিচে উদাহরণসহ দেখুন।

ই-রিটার্ন

কৃষি আয়ের তফসিলসহ রিটার্ন অনলাইনে জমা দেওয়ার সরকারি সাইট।

ই-রিটার্নে যান
এই লেখায়
  1. কৃষি আয় বলতে কী কী ধরা হয়
  2. কৃষি আয় কত টাকা পর্যন্ত করমুক্ত
  3. উদাহরণে বুঝুন: কখন ছাড় পাবেন, কখন পাবেন না
  4. কৃষি আয়ের অনুমোদনযোগ্য খরচ কী কী
  5. রিটার্নে কৃষি আয় দেখাবেন যেভাবে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. কৃষি আয় বলতে কী কী ধরা হয়

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৪০ থেকে ৪৪ অনুযায়ী কৃষি থেকে আয় হিসাব হয়। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭ যে তালিকা দিয়েছে, তাতে ফসল চাষের বাইরেও অনেক কিছু আছে।

  • যেকোনো উদ্যান পালন, ভূমিতে বা জলে যেকোনো চাষাবাদ
  • পশুপাখি পালন, হাঁস-মুরগি আর মাছের খামার, সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর খামার
  • নার্সারি, ডিম ও দুধ উৎপাদন
  • কাঠ, ঘাস ও গুল্ম, ফল, ফুল আর মধু উৎপাদন, বীজ উৎপাদন

চা আর রাবার আলাদা। নিজে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করলে মোট আয়ের ৪০ শতাংশ ব্যবসার আয় আর ৬০ শতাংশ কৃষি আয় ধরা হয়।

২. কৃষি আয় কত টাকা পর্যন্ত করমুক্ত

ছাড়কোন আয়েশর্ত
ষষ্ঠ তফসিল, অংশ ১, দফা ২০কৃষি থেকে আয়অনধিক ৫ লাখ টাকা; কৃষি আর আর্থিক পরিসম্পদ ছাড়া অন্য কোনো আয় থাকা চলবে না
ষষ্ঠ তফসিল, অংশ ১, দফা ২০কহাঁস-মুরগি, চিংড়ি ও মাছের হ্যাচারি, পোল্ট্রি ও মাছের পিলেটেড ফিড, দুগ্ধজাত পণ্য, ব্যাঙ চাষ, বীজ বিপণন, রেশম গুটিপোকার খামার ইত্যাদিসব খাত মিলিয়ে অনধিক ৫ লাখ টাকা

একাধিক কৃষি খাত থাকলেও দফা ২০-এর ছাড় সব মিলিয়ে ৫ লাখ টাকাই, প্রতি খাতে আলাদা করে নয়। ছাড়ের টাকা মোট আয়ে যোগ হয় না, তবে রিটার্নের করমুক্ত আয়ের ঘরে দেখাতে হয়।

করমুক্ত সীমার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না

এই ৫ লাখ টাকা কৃষি আয়ের বিশেষ ছাড়। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, সেটি আলাদা হিসাব।

৩. উদাহরণে বুঝুন: কখন ছাড় পাবেন, কখন পাবেন না

অবস্থাআয়ফল
শুধু কৃষি আর ব্যাংক সুদডেইরি খামার থেকে ১২ লাখ, ব্যাংক সুদ ৬ লাখকৃষি আয় থেকে ৫ লাখ বাদ, মোট আয় ১৩ লাখ
কৃষির সঙ্গে ব্যবসাওপরের আয়ের সঙ্গে বিবিধ মালের ব্যবসা থেকে ৩ লাখদফা ২০-এর ছাড় নেই, মোট আয় ২১ লাখ
দুই কৃষি খাতনার্সারি ৮ লাখ, হাঁস-মুরগির খামার ১০ লাখ, অন্য আয় নেইমোট থেকে ৫ লাখ বাদ, করযোগ্য ১৩ লাখ
ডেইরি আর মাছের হ্যাচারিডেইরি ৬.৫ লাখ, হ্যাচারি ৭.২ লাখহ্যাচারি থেকে দফা ২০ক-এর ৫ লাখ বাদ, ডেইরিতে দফা ২০-এর ছাড় নেই, করযোগ্য ৮.৭ লাখ

এই চারটি উদাহরণ এনবিআরের নির্দেশিকার। শেষটি খেয়াল করুন: হ্যাচারির আয় ব্যবসা খাতের আয় হিসেবে ধরা হয়েছে, তাই ডেইরির কৃষি আয়ে দফা ২০-এর শর্ত (অন্য আয় না থাকা) আর মেলেনি।

ধরুন, দিনাজপুরের আজিজুল হক ধান আর সবজি বেচে বছরে নিট ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করেন, ব্যাংকে সুদ পান ২০ হাজার টাকা, আর কোনো আয় নেই। কৃষি আয় ৫ লাখের কম, তাই পুরোটা মোট আয় থেকে বাদ যাবে, মোট আয় দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা। কর লাগবে না, তবে তাঁর টিআইএন থাকলে রিটার্ন দিতেই হবে।

দফা ২০ক-এর একটি উদাহরণও নির্দেশিকায় আছে। মাছের হ্যাচারি থেকে ১১ লাখ টাকা নিট আয় আর ব্যাংক সুদ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা থাকলে হ্যাচারির আয় থেকে ৫ লাখ বাদ যায়, মোট আয় দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫০ হাজার। নির্দেশিকার এই উদাহরণে করদাতা একজন নারী, আর হিসাবে প্রথম ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কর শূন্য ধরা হয়েছে।

৪. কৃষি আয়ের অনুমোদনযোগ্য খরচ কী কী

যে খরচ সম্পূর্ণ ও কেবল কৃষির জন্য, সেটিই বাদ দেওয়া যায়। নির্দেশিকায় সাধারণ খরচের তালিকা:

  • কৃষিজমির কর, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা, জমির ভাড়া, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ খরচ আর চাষাবাদের খরচ
  • কৃষির জন্য নেওয়া ঋণের সুদ বা মুনাফা
  • যন্ত্রপাতি মেরামত, চাষের গবাদিপশুর লালনপালন, প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহন খরচ
  • জমি, ফসল বা গবাদিপশুর বিমার প্রিমিয়াম আর দুর্যোগ থেকে কৃষি রক্ষার খরচ
  • কৃষিতে ব্যবহৃত সম্পদের অবচয়, আর কাজের পশু মারা গেলে বা অক্ষম হলে কেনা দাম আর বিক্রির দামের পার্থক্য
হিসাবের খাতা না থাকলে

হিসাব রাখা না হলে উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্যের ৬০ শতাংশ খরচ হিসেবে ধরা হয়। যেমন ফসলের বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকা হলে খরচ ৬ লাখ, আয় ৪ লাখ। বর্গা বা ভাগে জমি দিয়ে যাঁরা আয় পান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না।

৫. রিটার্নে কৃষি আয় দেখাবেন যেভাবে

  • ১
    বিক্রির টাকা যোগ করুনরিটার্নের তফসিল ৩-এ প্রথম ঘরে বছরের মোট বিক্রি বা প্রাপ্তি লিখুন, আয়বর্ষ ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬।
  • ২
    খরচ বাদ দিনসাধারণ খরচ, বিক্রির খরচ, ভূমি উন্নয়ন কর, খাজনা, ঋণের সুদ আর বিমার প্রিমিয়াম আলাদা ঘরে লিখে নিট আয় বের করুন।
  • ৩
    ছাড়ের অঙ্ক করমুক্ত আয়ের ঘরে দিনদফা ২০ বা ২০ক-এর ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অংশ মোট আয়ে না যোগ করে করমুক্ত আয়ের ঘরে দেখান।
  • ৪
    কাগজ রেখে দিনবর্গা বা ভাগের চুক্তি, আর ৬০ শতাংশের বেশি খরচ দাবি করলে তার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। ই-রিটার্নে আপলোড লাগে না, তবে কর অফিস চাইলে দেখাতে হবে।

রিটার্ন জমার সময় আর দেরিতে জমা দিলে কী হয়, তা রিটার্নের সময়সীমা গাইডে আছে। ২০২৬-২৭ করবর্ষে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিলে কোনো বাড়তি কর লাগে না।

৬. অনেকে যা জানতে চান

কৃষি আয় কি আয়কর মুক্ত?
পুরোপুরি নয়। কৃষি আর আর্থিক পরিসম্পদ ছাড়া অন্য আয় না থাকলে কৃষি আয়ের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয় থেকে বাদ যায়, বাকি অংশে সাধারণ হারে কর হিসাব হয়।
কৃষি আয় কত টাকা পর্যন্ত অকরধার্য?
২০২৬-২৭ করবর্ষে ষষ্ঠ তফসিলের দফা ২০ অনুযায়ী অনধিক ৫ লাখ টাকা, শর্ত সাপেক্ষে। একাধিক কৃষি খাত থাকলেও সব মিলিয়ে ৫ লাখ টাকার বেশি ছাড় মেলে না।
krishi ay thakle ki return dite hobe?
টিআইএন থাকলে আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও রিটার্ন দিতে হয়, আয়কর আইনের ধারা ১৬৬(১)(ঙ) অনুযায়ী। কৃষি আয়ের ছাড়ের অংশও রিটার্নে করমুক্ত আয় হিসেবে দেখাতে হয়।
পোল্ট্রি খামারের আয়ে কি কর লাগে?
হাঁস-মুরগির খামার কৃষি আয়ের সংজ্ঞায় আছে, তাই দফা ২০-এর শর্তে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড় পেতে পারেন। পিলেটেড পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনের আয় পড়ে দফা ২০ক-এ, সেখানেও সব মিলিয়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাদ যায়।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
আয়কর

জিরো রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম আসলে নেই: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে যা করবেন

সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয়। আয় সীমার নিচে হলে কর লাগে না, তবে প্রকৃত আয়, খরচ আর সম্পদ দেখাতে হয়।
আয়কর

টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম: কখন করা যায়, কোথায় আবেদন, কী শর্ত

আয় না থাকা, মৃত্যু, দেশ ছাড়া বা ডুপ্লিকেট TIN: আইনের ২৬২ ধারায় যেসব কারণে বাতিল চাওয়া যায়, আর যে শর্তে কর অফিস রাজি হয়।

অনেকে খোঁজেন