
সংক্ষেপে
সরকারি বেতন আদেশভুক্ত একজন কর্মচারীর বেলায় কর ধরা হয় শুধু সরকারের দেওয়া মূল বেতন, উৎসব ভাতা আর বোনাসের ওপর। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, নববর্ষ ভাতাসহ বেতন আদেশে লেখা ৪১টি ভাতা আর অবসরের সময়ের লাম্প গ্রান্ট করমুক্ত। নিয়মটি এসেছে এনবিআরের এস.আর.ও নং ২২৫-আইন/আয়কর-০৭/২০২৩ থেকে, যা আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এও আছে।
করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ করবর্ষে ৪ লাখ টাকা। তবে এই সুবিধা যাঁরা পান, তাঁরা চাকরির আয়ের ১/৩ বা ৫ লাখ টাকার আলাদা ছাড়টি পান না। বেতন আদেশের বাইরের যেকোনো আয়, যেমন সভার সম্মানী বা ক্লাস নেওয়ার ফি, পুরোটাই করযোগ্য।
বেতনের হিসাব মিলিয়ে নিয়ে ই-রিটার্নে লগইন করে রিটার্ন জমা দিন।
এই লেখায়
১. সরকারি চাকরিজীবীদের আয়কর: কোন আয়ে কর, কোনটা করমুক্ত
বেসরকারি চাকরিতে বেতনের সঙ্গে পাওয়া প্রায় সব ভাতা যোগ করে আয় ধরা হয়, তারপর একটা নির্দিষ্ট অংশ ছাড় পাওয়া যায়। সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীর হিসাব আলাদা। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই জারি করা এস.আর.ও নং ২২৫ অনুযায়ী সরকারের দেওয়া মূল বেতন, উৎসব ভাতা আর বোনাস, যে নামেই হোক, করযোগ্য। বাকি ভাতা করমুক্ত, তবে শর্ত একটাই: ভাতাটি সরকারি বেতন আদেশে উল্লেখ থাকতে হবে।
| আয়ের ধরন | করের অবস্থা |
|---|---|
| মাসিক মূল বেতন | করযোগ্য |
| উৎসব ভাতা ও বোনাস | করযোগ্য |
| বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, পোশাক, ধোলাই, শিক্ষা সহায়ক ভাতা | করমুক্ত |
| বাংলা নববর্ষ ভাতা, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা | করমুক্ত |
| ঝুঁকি, পাহাড়ি, সীমান্ত, প্রেষণ, টেলিকম, রেশন মানিসহ বেতন আদেশের অন্য ভাতা | করমুক্ত |
| অবসরের সময় পাওয়া লাম্প গ্রান্ট | করমুক্ত |
| ভবিষ্য তহবিলে জমা টাকার ওপর অর্জিত সুদ | করমুক্ত |
| সভার সম্মানী, প্রশিক্ষণে ক্লাস নেওয়ার ফি, বিদেশ ভ্রমণ থেকে পাওয়া টাকা | করযোগ্য |
নির্দেশিকার তালিকায় করমুক্ত ভাতা মোট ৪১টি, যেমন জুডিশিয়াল ভাতা, চৌকি ভাতা, ডোমেস্টিক এইড, মোটরসাইকেল ভাতা, ড্রাইভার ও ক্লিনার এলাউয়েন্স, নার্সিং এলাউয়েন্স, দৈনিক বা খোরাকি ভাতা, আউটফিট ভাতা। সব কর্মচারী সব ভাতা পান না। আপনার বেতন বিবরণীতে যে ভাতাগুলো আছে, সেগুলো তালিকায় আছে কি না মিলিয়ে নিন।
২. কারা এই সুবিধা পান, কারা পান না
‘সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারী’ কথাটার মানে প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট করা আছে। অর্থ বিভাগের কয়েকটি বেতন আদেশ, সশস্ত্র বাহিনীর একটি নির্দেশনা আর আইনের অধীনে পদে থেকে সরাসরি কোষাগার থেকে বেতন পাওয়া ব্যক্তি এর আওতায় পড়েন।
- চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ যাঁদের জন্য প্রযোজ্য
- স্ব-শাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেতন আদেশ, ২০১৫ যাঁদের জন্য প্রযোজ্য, তবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মী বাদে
- বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, রাকাব, কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, সাধারণ ও জীবন বীমা করপোরেশন, আইসিবি, বিএসইসিসহ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান
- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল আর বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ২০১৭-১৮ করবর্ষ থেকে
- বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড আর জুডিসিয়াল সার্ভিসের বেতন আদেশভুক্ত কর্মী
- যৌথ বাহিনী নির্দেশনা নম্বর ০১/২০১৬ যাঁদের জন্য প্রযোজ্য
যাঁরা ওপরের কোনো বেতন আদেশের আওতায় বেতন পান না, তাঁদের আয় হিসাব হবে আয়কর আইনের ৩২ থেকে ৩৪ ধারা আর ষষ্ঠ তফসিলের সাধারণ নিয়মে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা কোন দলে পড়েন, নির্দেশিকায় আলাদা করে লেখা নেই। নিজের কর সার্কেলে জিজ্ঞেস করে নিন।
৩. এনবিআরের উদাহরণে সরকারি কর্মচারীর আয়কর হিসাব
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এ একজন সরকারি কর্মচারীর পুরো হিসাব দেখানো আছে। তাঁর মাসিক মূল বেতন ৫৬,৫০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা মাসে ১,৫০০ টাকা, দুটি উৎসব ভাতা মিলিয়ে ১,১৩,০০০ টাকা আর নববর্ষ ভাতা ১১,৩০০ টাকা। তিনি সরকারি বাসায় থাকেন।
- ১মোট আয় বের করুনমূল বেতন ৫৬,৫০০ × ১২ = ৬,৭৮,০০০ টাকা। উৎসব ভাতা ১,১৩,০০০ টাকা। চিকিৎসা আর নববর্ষ ভাতা করমুক্ত বলে বাদ। মোট আয় ৭,৯১,০০০ টাকা।
- ২করহার বসানপ্রথম ৪,০০,০০০ টাকায় কর শূন্য। পরের ৩,০০,০০০ টাকায় ১০% হারে ৩০,০০০ টাকা। বাকি ৯১,০০০ টাকায় ১৫% হারে ১৩,৬৫০ টাকা। মোট কর ৪৩,৬৫০ টাকা।
- ৩বিনিয়োগ যোগ করুনভবিষ্য তহবিলে মাসে ১৪,০০০ টাকা মিলিয়ে বছরে ১,৬৮,০০০, কল্যাণ তহবিলে ১,৮০০, গোষ্ঠী বীমায় ১,২০০ আর ডিপোজিট পেনশন স্কিমে ৬০,০০০ টাকা। মোট বিনিয়োগ ২,৩১,০০০ টাকা।
- ৪রেয়াত বাদ দিনমোট আয়ের ৩% অর্থাৎ ২৩,৭৩০, বিনিয়োগের ১০% অর্থাৎ ২৩,১০০ আর সর্বোচ্চ সীমা ৭,৫০,০০০ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটিই রেয়াত, অর্থাৎ ২৩,১০০ টাকা। প্রদেয় কর দাঁড়ায় ৪৩,৬৫০ থেকে ২৩,১০০ বাদে ২০,৫৫০ টাকা।
একই মানুষ যদি বছরে সভার সম্মানী হিসেবে ২৫,০০০ টাকা আর একটি সরকারি একাডেমিতে ক্লাস নিয়ে ২০,০০০ টাকা পান, নির্দেশিকা বলছে এই টাকা বেতন আদেশের অংশ নয়। তাই এগুলো যোগ হবে আর এর ওপরও কর লাগবে। নিজের হিসাব করার সময় শুধু বেতন বিবরণী নয়, বছরের সব প্রাপ্তি সামনে রাখুন।
৪. সরকারি চাকরিজীবীদের আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণ: কোন ঘরে কী লিখবেন
চাকরি থেকে আয় থাকলে রিটার্ন আইটি-১১গ (২০২৩)-এর তফসিল ১ পূরণ করতে হয়। এর ‘ক’ অংশটি শুধু সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীদের জন্য। প্রতিটি সারিতে তিনটি ঘর থাকে: আয়ের পরিমাণ, কর অব্যাহতি পাওয়া আয় আর নিট করযোগ্য আয়।
তফসিল ১-এর ‘ক’ অংশে যে সারিগুলো আছে
করমুক্ত ভাতাগুলোও লিখতে হবে, তবে ‘কর অব্যাহতি পাওয়া আয়’ ঘরে। লুকিয়ে রাখলে সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে আয়ের হিসাব মেলে না। হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে বছরের বেতন বিবরণী আর ভবিষ্য তহবিলের সুদের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে রাখুন, নির্দেশিকার উদাহরণেও সুদের অঙ্ক এই প্রত্যয়নপত্র থেকে নেওয়া।
৫. অনেকে যা জানতে চান
সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া ভাতা কি করমুক্ত?
সরকারি চাকরিজীবীদের আয়কর দেওয়ার নিয়ম কি বেসরকারিদের মতো?
পেনশন বা অবসরের লাম্প গ্রান্টে কি কর লাগে?
এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা কি এই সুবিধা পাবেন?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।