প্রবাস ও বিদেশে চাকরি

এজেন্সি বা দালাল টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠায়নি: অভিযোগ আর টাকা ফেরতের পথ

নাগরিক সেবা সম্পাদনা দলপড়তে ৭ মিনিট

এজেন্সি বা দালাল টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠায়নি: অভিযোগ আর টাকা ফেরতের পথ

সংক্ষেপে

রিক্রুটিং এজেন্সি বা কোনো ব্যক্তি বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়েছে কিন্তু পাঠায়নি, বা সরকারের ঠিক করা খরচের চেয়ে বেশি নিয়েছে, অথবা পাসপোর্ট আটকে রেখেছে। এসব ক্ষেত্রে বিএমইটির মহাপরিচালক বরাবর, নিজের জেলার কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে বা বিদেশে থাকলে দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া যায়। এতে কোনো ফি লাগে না।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অভিযোগের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা। প্রমাণিত হলে পরের ৩ মাসের মধ্যে আদেশ বা সালিশে নিষ্পত্তি হয়, আর সরকার অবৈধভাবে নেওয়া টাকা উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্তকে দিতে পারে। চাইলে একই সঙ্গে থানায় মামলাও করতে পারেন।

বিএমইটির অভিযোগ ফরম

সালিশ বা মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগের আবেদন ফরম (ফরম ক) বিএমইটির নোটিশে দেওয়া আছে।

ফরম দেখুন
এই লেখায়
  1. আগে প্রমাণ গুছিয়ে নিন
  2. কোথায় অভিযোগ করবেন
  3. বিএমইটিতে অভিযোগের ধাপ
  4. আইন কী বলে: সময়সীমা, টাকা উদ্ধার আর শাস্তি
  5. সাড়া না পেলে যা করবেন
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. আগে প্রমাণ গুছিয়ে নিন

অভিযোগের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করে প্রমাণের ওপর। কাকে কবে কত টাকা দিয়েছেন, কে কী কথা দিয়েছিল, এসব কাগজে বা ফোনে যা আছে সব এক ফাইলে রাখুন। মূল কাগজ নিজের কাছে রেখে ফটোকপি জমা দেবেন।

যা জোগাড় করবেন

আর টাকা দেবেন না

'আরেকটু টাকা দিলেই ভিসা হবে' শুনে নতুন করে টাকা দেবেন না। বৈধ কারণ ছাড়া পাসপোর্ট আটকে রাখা আইনেই অপরাধ, তাই পাসপোর্ট ফেরত চেয়ে লিখিত অনুরোধ করুন।

২. কোথায় অভিযোগ করবেন

একই ঘটনায় প্রশাসনিক অভিযোগ আর মামলা দুটোই করা যায়। আইনের ৪১ ধারা বলছে, সরকারের কাছে অভিযোগ দিলে মামলা করার অধিকার নষ্ট হয় না। আপনার অবস্থা অনুযায়ী পথ বেছে নিন:

পথকোথায়কখন কাজে লাগে
লিখিত অভিযোগবিএমইটির মহাপরিচালক বরাবর, ঢাকাএজেন্সি বা ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ফেরত চাইলে
একই ফরমে অভিযোগনিজের জেলার কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসঢাকায় যাওয়া কঠিন হলে
দূতাবাসে অভিযোগসংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কল্যাণ উইংবিদেশে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা বেতন না পেলে
অনলাইন অভিযোগওইপির কর্মী পোর্টালবিএমইটির ওয়েবসাইটের অনলাইন অভিযোগের লিংক এখানেই নিয়ে যায়
ফৌজদারি মামলাথানা বা আদালতমিথ্যা আশ্বাসে টাকা নেওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা
দেওয়ানি মামলাআদালতচুক্তি ভঙ্গের ক্ষতিপূরণ চাইলে

৩. বিএমইটিতে অভিযোগের ধাপ

  • ১
    ফরম সংগ্রহ করুনবিএমইটির নোটিশ থেকে 'অভিযোগের আবেদন ফরম' (ফরম ক) নামিয়ে প্রিন্ট করুন, অথবা জেলা অফিস থেকে নিন। ফরমটি বিএমইটি, শ্রম কল্যাণ উইং আর জেলা অফিস, তিন জায়গার জন্যই এক।
  • ২
    নিজের তথ্য লিখুননাম, NID নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, স্মার্ট কার্ড নম্বর (থাকলে), বয়স, বাবা বা স্বামী আর মায়ের নাম, স্থায়ী ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর দিন। আপনি বিদেশে থাকলে দেশে থাকা প্রতিনিধির নাম, সম্পর্ক ও মোবাইল নম্বরের ঘরও পূরণ করুন।
  • ৩
    যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার তথ্যএজেন্সি হলে নাম, RL নম্বর ও ঠিকানা লিখুন, আগে কোনো অভিযোগ ছিল কি না তা-ও। এজেন্সি না হলে ব্যক্তির নাম, বাবার নাম আর ঠিকানা দিন।
  • ৪
    ঘটনার বিবরণ দিনতারিখ ধরে সংক্ষেপে লিখুন: কবে কাকে কত টাকা দিলেন, কী কথা দেওয়া হয়েছিল, আর কী ঘটল। সই বা টিপসই দিয়ে প্রমাণের ফটোকপি সঙ্গে জুড়ে দিন।
  • ৫
    জমা দিয়ে প্রমাণ রাখুনঅফিসে জমা দিলে অভিযোগের একটি কপিতে গ্রহণের সই ও তারিখ নিয়ে নিন। পরে খোঁজ নিতে এই কপিই কাজে লাগবে।
  • ৬
    শুনানিতে হাজির থাকুনসিটিজেন চার্টার অনুযায়ী অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে শুনানি হয়। বিএমইটি তার সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় মন্ত্রণালয়। শুনানির ডাক পেলে মূল কাগজ নিয়ে যান।

৪. আইন কী বলে: সময়সীমা, টাকা উদ্ধার আর শাস্তি

  • অভিযোগ পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। প্রমাণিত হলে তদন্ত শেষের ৩ মাসের মধ্যে সরাসরি আদেশে বা সালিশে নিষ্পত্তি হবে (ধারা ৪১)।
  • আইন ভেঙে নেওয়া টাকা সরকার লিখিত আদেশে উদ্ধার করতে পারে, দরকারে ক্ষতিপূরণের মামলা করে আদায় করে ক্ষতিগ্রস্তকে দিতে পারে (ধারা ৪৩)।
  • মিথ্যা আশ্বাসে টাকা নেওয়া, বৈধ কারণ ছাড়া পাসপোর্ট বা ভিসা আটকে রাখা, বা বেশি বেতনের মিথ্যা কথা বলে বিদেশে পাঠানোর শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড আর কমপক্ষে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড (ধারা ৩১)। এই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।
  • নিবন্ধন ছাড়া কেউ নিজেকে এজেন্সির সাব-এজেন্ট বা প্রতিনিধি পরিচয় দিলে সেটিও অপরাধ (ধারা ৩৫)।
  • অভিবাসী কর্মী বা প্রতারণার শিকার মানুষের আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে (ধারা ২৭)।

সরকার আদেশ দিয়ে কোনো দেশে যাওয়ার সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় ঠিক করে দিতে পারে (ধারা ২১)। বিএমইটির ওয়েবসাইটে দেশভিত্তিক খরচের হালনাগাদ তালিকা আমরা খুঁজে পাইনি। তাই এজেন্সির কাছে মোট খরচের খাতওয়ারি হিসাব লিখিতভাবে চান, প্রতিটি টাকার রসিদ নিন, আর সন্দেহ হলে বিএমইটির বহির্গমন শাখায় জিজ্ঞেস করুন।

রসিদ কেন জরুরি

বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ এজেন্সির নামে দেওয়া রসিদ। নগদে দিলে সেদিনই রসিদ চান, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিলে লেনদেনের স্ক্রিনশট রেখে দিন।

৫. সাড়া না পেলে যা করবেন

  1. চার্টারে দেওয়া ৩০ কার্যদিবস পেরোলে গ্রহণের কপি নিয়ে বিএমইটির অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তার (পরিচালক, কর্মসংস্থান) কাছে খোঁজ নিন।
  2. তাতেও সমাধান না হলে সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার (GRS) ওয়েবসাইটে অভিযোগ দিন। সেখানে আপিল যায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে।
  3. আইনি পরামর্শ বা বিনা খরচে আইনজীবী লাগলে সরকারি আইনগত সহায়তার জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৬৯৯ নম্বরে ফোন করুন।
  4. অভিবাসন নিয়ে যেকোনো পরামর্শের জন্য প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার ১৬১৩৫ (টোল ফ্রি)। বিদেশ থেকে ফোন করলে নম্বর +৮৮০৯৬১০১০২০৩০।

৬. অনেকে যা জানতে চান

এজেন্সি নয়, গ্রামের এক দালাল টাকা নিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও কি বিএমইটিতে অভিযোগ করা যায়?
যায়। আইনের ৪১ ধারায় রিক্রুটিং এজেন্টসহ যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সুযোগ আছে, আর ফরমেও এজেন্সি না হলে ব্যক্তির তথ্য দেওয়ার ঘর রাখা আছে। দালাল কোনো এজেন্সির নাম বলে থাকলে সেটিও লিখুন।
আমি এখন বিদেশে। দেশের কেউ কি আমার হয়ে অভিযোগ দিতে পারবেন?
পারবেন। ফরমে অভিযোগকারীর অনুপস্থিতিতে প্রতিনিধির নাম, অভিবাসী কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক আর মোবাইল নম্বর লেখার ঘর আছে। আপনি নিজেও সেই দেশের বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে অভিযোগ দিতে পারেন।
অভিযোগ করতে কি টাকা লাগে?
না। বিএমইটির সিটিজেন চার্টারে এজেন্সির বিরুদ্ধে কর্মীর অভিযোগ নিষ্পত্তির সেবা বিনামূল্যে বলা আছে। অভিযোগ লিখে দেওয়ার নামে কেউ টাকা চাইলে সাবধান হোন।
সালিশে কি পুরো টাকা ফেরত পাওয়া যায়?
কত টাকা ফেরত মিলবে তা নির্ভর করে তদন্তে কী প্রমাণিত হয় তার ওপর। রসিদ বা লেনদেনের প্রমাণ যত পরিষ্কার, দাবি তত শক্ত। এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল হলে জামানতের টাকা থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান আইনে আছে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

অনেকে খোঁজেন