
সংক্ষেপে
মুসলিম বিয়ে নিবন্ধনের ফি ঠিক হয় দেনমোহরের অঙ্ক দিয়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের ২১ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখের প্রজ্ঞাপনে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ সংশোধন করে হার বাড়ানো হয়। এখন দেনমোহর ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি এক হাজার টাকা বা তার অংশের জন্য ১৪ টাকা। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৫ লাখের বেশি হলে পরের প্রতি লাখ বা তার অংশে ১০০ টাকা, আর কোনো অবস্থাতেই ফি ২০০ টাকার কম হবে না।
তালাক নিবন্ধনের ফি এখন ১,০০০ টাকা। আর নিবন্ধন শেষে কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার নিবন্ধন বইয়ের ভুক্তির একটি প্রত্যয়িত কপি পক্ষদের দেবেন, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী এর জন্য কোনো টাকা নেওয়া যাবে না।
নিকাহ রেজিস্ট্রারদের তথ্য আর নিবন্ধনসংক্রান্ত আইন-বিধি অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে পাবেন।
এই লেখায়
১. বিবাহ নিবন্ধন ফি কীভাবে হিসাব হয়
২০২২ সালের সংশোধনের আগে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরে প্রতি হাজারে ১২ টাকা ৫০ পয়সা নেওয়া যেত। গেজেটে দুটি বদল আনা হয়েছে: ৪ লাখের সীমা ৫ লাখ করা হয়েছে, আর হার ১২.৫০ থেকে ১৪ টাকা। হিসাবটা তিন ধাপে মনে রাখুন:
- দেনমোহরের প্রথম ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি এক হাজার টাকা বা তার অংশে ১৪ টাকা।
- ৫ লাখের বেশি অংশে প্রতি এক লাখ টাকা বা তার অংশে ১০০ টাকা।
- মোট ফি কোনো অবস্থাতেই ২০০ টাকার কম হবে না।
| দেনমোহর | হিসাব | নিবন্ধন ফি |
|---|---|---|
| ১০,০০০ টাকা | ১০ হাজার × ১৪ = ১৪০, কিন্তু সর্বনিম্ন ২০০ | ২০০ টাকা |
| ১ লাখ টাকা | ১০০ হাজার × ১৪ | ১,৪০০ টাকা |
| ৩ লাখ টাকা | ৩০০ হাজার × ১৪ | ৪,২০০ টাকা |
| ৫ লাখ টাকা | ৫০০ হাজার × ১৪ | ৭,০০০ টাকা |
| ৮ লাখ টাকা | ৭,০০০ + বাড়তি ৩ লাখে ৩ × ১০০ | ৭,৩০০ টাকা |
‘অংশ’ কথাটার মানে, হাজারের ভগ্নাংশও পুরো এক হাজার ধরে গোনা হয়। দেনমোহর ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা হলে হাজারের সংখ্যা ধরা হবে ১৫১, ফি দাঁড়াবে ১৫১ × ১৪ = ২,১১৪ টাকা।
একটা বাস্তব উদাহরণ। রুমানা আর ফাহিমের বিয়েতে দেনমোহর ঠিক হলো ২ লাখ টাকা। কাজী নিবন্ধন ফি নেবেন ২০০ হাজার × ১৪ = ২,৮০০ টাকা। এই অঙ্কের রসিদ চেয়ে নিন, আর নিবন্ধন শেষে কাবিননামার প্রত্যয়িত কপি হাতে নিয়েই কাজী অফিস ছাড়ুন।
২. কাজী অফিসে বিয়ে করতে কত টাকা লাগে
আইনে যে ফির কথা বলা আছে, তা ওপরের নিবন্ধন ফি। কাজী অফিসে বিয়ে পড়ানো হোক বা বাড়িতে, নিবন্ধন ফির হিসাব একই। এর বাইরে কোনো খরচ চাওয়া হলে সেটা কীসের জন্য, জিজ্ঞেস করুন এবং যা দিচ্ছেন তার রসিদ নিন।
কাবিননামায় যে দেনমোহর লেখা হয়, সেটিই স্ত্রীর আইনগত পাওনার প্রমাণ। ফি কমাতে আসল অঙ্কের চেয়ে কম লেখানো ভবিষ্যতে স্ত্রীর অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
প্রত্যেক নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজ করেন রেজিস্ট্রারের তত্ত্বাবধানে, আর সব নিকাহ রেজিস্ট্রার অফিসের সাধারণ তত্ত্বাবধান করেন নিবন্ধন মহাপরিদর্শক, আইনের ১০ ধারায় এমনটাই বলা। বাড়তি টাকা নিয়ে অভিযোগ থাকলে জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসে জানাতে পারেন।
এই ফি যে সরকারি নিয়মের অংশ, তা বোঝা যায় আরেকটি বিধান থেকে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী একই সংশোধনে নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স ফি আর বার্ষিক ফিও বেড়েছে, যেমন সিটি কর্পোরেশন এলাকায় লাইসেন্স ফি ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। আর কাজী যে নিবন্ধন ফি আদায় করেন, তা থেকে প্রতি অর্থবছরের সরকারি অংশ পরের অর্থবছরের ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জমা দিতে হয়।
৩. কাবিননামা তুলতে কত টাকা লাগে
দুটি আলাদা পরিস্থিতি: নিবন্ধনের দিনের কপি আর পরে তোলা কপি। খরচের নিয়মও দুই ক্ষেত্রে আলাদা।
| কখন | কোথা থেকে | খরচ |
|---|---|---|
| নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর | যে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিবন্ধন করলেন | বিনামূল্যে, আইনের ৯ ধারা |
| পরে, কপি হারালে বা নতুন লাগলে | নিকাহ রেজিস্ট্রারের অফিস, বই জমা হয়ে গেলে রেজিস্ট্রারের অফিস | বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত ফি, অফিসে জেনে নিন |
আইনের ১৩ ধারা বলছে, নির্ধারিত ফি দিয়ে যে কেউ নিকাহ রেজিস্ট্রার বা রেজিস্ট্রারের অফিসে রাখা নিবন্ধন বই দেখতে পারেন বা ভুক্তির কপি তুলতে পারেন। নিবন্ধন বই ভরে গেলে, অথবা কাজী জেলা ছাড়লে বা লাইসেন্স না থাকলে বইগুলো রেজিস্ট্রারের কাছে জমা হয়, ১২ ধারায় তা বলা আছে। তাই পুরোনো বিয়ের কাবিননামার কপি খুঁজতে আগে কাজীর কাছে, না পেলে জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসে যান।
কপি তুলতে যা জানা দরকার
৪. নিবন্ধনের ৩০ দিনের নিয়ম আর তালাক নিবন্ধন
- ১কাজী নিজে বিয়ে পড়ালেআইনের ৫ ধারা অনুযায়ী তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন করবেন।
- ২অন্য কেউ বিয়ে পড়ালেবিয়ের ৩০ দিনের মধ্যে বরকে এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারকে জানাতে হবে, তিনি তখন সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন করবেন।
- ৩নিয়ম না মানলেএই ধারা লঙ্ঘন অপরাধ, শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা দুটোই।
তালাক নিবন্ধনের আবেদন যিনি বা যাঁরা তালাক কার্যকর করেছেন, তাঁরা মৌখিকভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রারকে করেন। পর্দানশীন নারী তাঁর অনুমোদিত উকিলের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। স্ত্রী তালাক-ই-তাফউইজ বা অর্পিত ক্ষমতায় তালাক দিলে নিবন্ধনের জন্য ক্ষমতা অর্পণের রেজিস্ট্রি দলিল, অথবা বিয়ের নিবন্ধন বইয়ে সেই অর্পণ লেখা আছে এমন ভুক্তির প্রত্যয়িত কপি দেখাতে হয়। নিকাহ রেজিস্ট্রার তালাক নিবন্ধন করতে অস্বীকার করলে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল করা যায়, আর সেই আদেশ চূড়ান্ত। তালাক নিবন্ধনের ফি ২০২২ সালের সংশোধনে ৫০০ থেকে বেড়ে ১,০০০ টাকা হয়েছে।
পারিবারিক বিরোধ, দেনমোহর আদায় বা তালাকের পরের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন থাকলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন। এই লেখা শুধু নিবন্ধনের খরচ আর কাগজের কথা বলছে।
৫. অনেকে যা জানতে চান
কাজী অফিসে বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?
কাবিননামা তুলতে কত টাকা লাগে?
তালাক নিবন্ধন ফি কত?
বিয়ের কত দিনের মধ্যে নিবন্ধন করতে হয়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।