
সংক্ষেপে
চাকরি থেকে রিজাইন দেওয়ার নিয়ম শ্রম আইনের ২৭ ধারায় লেখা: স্থায়ী শ্রমিক মালিককে ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ দিয়ে ইস্তফা দিতে পারেন। অস্থায়ী শ্রমিকের নোটিশ মাসিক বেতনে চাকরি হলে ৩০ দিন, অন্যদের ১৪ দিন। নোটিশ না দিয়ে চলে যেতে চাইলে নোটিশের মেয়াদের মজুরির সমান টাকা মালিককে দিতে হয়।
১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ ইস্তফার ক্ষতিপূরণ বদলে দিয়েছে। এখন ৩ বছর পর্যন্ত চাকরি করা স্থায়ী শ্রমিকও প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য ৭ দিনের মজুরি পাবেন। চাকরি ছাড়ার পর সব পাওনা ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা।
শ্রম আইন আর এর সংশোধনীগুলোর সরকারি কপি এই অধিদপ্তরের আইন পাতায় আছে, অভিযোগের হেল্পলাইনও তাদের।
এই লেখায়
১. চাকরি থেকে রিজাইন দেওয়ার নিয়ম: কার নোটিশ কত দিন
বেসরকারি কারখানা, দোকান, অফিস বা প্রতিষ্ঠানে যাঁরা শ্রম আইনের সংজ্ঞায় শ্রমিক, তাঁদের ইস্তফার নিয়ম ২৭ ধারায়। ২০২৬ সালের সংশোধনে শ্রমিকের সংজ্ঞাও নতুন করে লেখা হয়েছে। দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক বা করণিক কাজে মজুরির বিনিময়ে নিযুক্ত সবাই শ্রমিক। বাদ থাকেন শুধু তাঁরা, যাঁদের লিখিতভাবে ব্যবস্থাপনা, প্রধান নির্বাহী, ব্যবস্থাপক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
| চাকরির ধরন | লিখিত নোটিশ | আইনের জায়গা |
|---|---|---|
| স্থায়ী শ্রমিক | ৬০ দিন | ধারা ২৭(১) |
| অস্থায়ী, মাসিক মজুরিতে | ৩০ দিন | ধারা ২৭(২)(ক) |
| অস্থায়ী, অন্য সবাই | ১৪ দিন | ধারা ২৭(২)(খ) |
নোটিশ মুখে দিলে চলবে না, লিখিত হতে হবে। তারিখসহ একটি কপি মানবসম্পদ বা প্রশাসন বিভাগে জমা দিন, আর জমার প্রমাণ হিসেবে আপনার কপিতে গ্রহণের সই ও সিল নিয়ে রাখুন। ইমেইলে পাঠালে সেই ইমেইলও রেখে দিন।
- নোটিশের দিন গোনা শুরু হয় চিঠি জমার দিন থেকে, তাই চিঠিতে তারিখ লিখতে ভুলবেন না।
- নোটিশের সময়টা কাজ করে পার করলে সেই দিনগুলোর মজুরি স্বাভাবিকভাবে পাবেন।
- নিয়োগপত্রে আইনের চেয়ে লম্বা নোটিশ লেখা থাকলে বিরোধ এড়াতে আগে মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে লিখিতভাবে কথা বলে নিন।
২. নোটিশ না দিয়ে চাকরি ছাড়লে কী হয়
অনেকে নতুন চাকরি পেয়ে দুই মাস অপেক্ষা করতে পারেন না। আইন সেই পথও রেখেছে। ২৭(৩) ধারা বলছে, বিনা নোটিশে ইস্তফা দিতে চাইলে নোটিশের পুরো মেয়াদের মজুরির সমান টাকা মালিককে দিতে হবে। যেমন স্থায়ী শ্রমিক ২০ দিনের নোটিশ দিয়ে চলে গেলে বাকি ৪০ দিনের মজুরি সমন্বয়ের প্রশ্ন আসে। সাধারণত এই টাকা চূড়ান্ত পাওনা থেকে কেটে রাখা হয়, তাই হিসাব লিখিতভাবে চেয়ে নিন।
২০১৩ সালের সংশোধনে যোগ হওয়া ২৭(৩ক) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া ১০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে মালিক ১০ দিন সময় দিয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন ও কাজে ফিরতে নোটিশ দেবেন। জবাব না দিলে আরও ৭ দিন সময় দেওয়া হয়। তারপরও না ফিরলে অনুপস্থিতির দিন থেকেই আপনি ইস্তফা দিয়েছেন বলে গণ্য হবেন।
৩. রিজাইন দিলে কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়: নতুন নিয়ম ২০২৬
আগে স্থায়ী শ্রমিক ৫ বছরের কম চাকরি করে ইস্তফা দিলে এই ক্ষতিপূরণ পেতেন না। ২০২৬ সালের সংশোধনী আইনের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ২৭(৪) পুরো বদলে গেছে। এখন প্রতি সম্পূর্ণ বছরের চাকরির জন্য মালিক নিচের হারে ক্ষতিপূরণ দেবেন:
| অবিচ্ছিন্ন চাকরির মেয়াদ | প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য |
|---|---|
| ৩ বছর পর্যন্ত | ৭ দিনের মজুরি |
| ৩ বছরের বেশি, ১০ বছরের কম | ১৫ দিনের মজুরি |
| ১০ বছর বা তার বেশি | ৩০ দিনের মজুরি, অথবা গ্র্যাচুইটি প্রদেয় হলে দুটির মধ্যে যেটা বেশি |
উদাহরণ ধরা যাক, কেউ একই প্রতিষ্ঠানে টানা ৬ বছর কাজ করে নিয়ম মেনে ইস্তফা দিলেন। তিনি পাবেন ৬ গুণ ১৫, মানে ৯০ দিনের মজুরি। আইন বলছে, এই ক্ষতিপূরণ শ্রমিকের অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধার অতিরিক্ত। মানে বকেয়া মজুরি, পাওনা ছুটির টাকা বা ভবিষ্য তহবিলের অংশ এর বাইরে আলাদা।
এই সুবিধা লেখা আছে স্থায়ী শ্রমিকের জন্য। অস্থায়ী বা শিক্ষানবিশ হলে নিয়োগপত্রে কী লেখা আছে, তা মিলিয়ে নিন।
৪. রিজাইন দেওয়ার ধাপ: চিঠি থেকে শেষ পাওনা পর্যন্ত
- ১নিয়োগপত্র আর চাকরির বিধি পড়ুননোটিশের মেয়াদ, গ্র্যাচুইটি বা ভবিষ্য তহবিলের শর্ত কোথায় কী লেখা আছে দেখে নিন। আইনের চেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া থাকলে সেটাই দাবি করবেন।
- ২লিখিত ইস্তফাপত্র দিনচিঠিতে নাম, পদ, কর্মী নম্বর, যোগদানের তারিখ, কোন তারিখ থেকে নোটিশ শুরু আর শেষ কর্মদিবস কবে, পরিষ্কার লিখুন। কারণ লেখা বাধ্যতামূলক নয়, ছোট ও ভদ্র রাখুন।
- ৩গ্রহণের প্রমাণ রাখুনঅফিসের কপিতে গ্রহণকারীর সই, তারিখ আর সিল নিন। কেউ নিতে না চাইলে রেজিস্টার্ড ডাকে বা ইমেইলে পাঠান।
- ৪দায়িত্ব বুঝিয়ে দিনঅফিসের ল্যাপটপ, আইডি কার্ড, ফাইল আর পাসওয়ার্ড লিখিত তালিকা করে হস্তান্তর করুন। ক্লিয়ারেন্স ফরম থাকলে সই নিয়ে নিন।
- ৫পাওনার হিসাব চানশেষ মাসের মজুরি, অর্জিত ছুটির টাকা, ক্ষতিপূরণ আর ভবিষ্য তহবিল কত, লিখিত হিসাব চান। ৩০ ধারা অনুযায়ী চাকরি ছাড়ার পর সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে সব পাওনা পরিশোধ করতে হয়।
- ৬চাকরির প্রত্যয়নপত্র নিন৩১ ধারায় সাময়িক ও বদলী শ্রমিক ছাড়া অন্য সবার চাকরি সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার অধিকার আছে। পরের চাকরিতে অভিজ্ঞতা সনদ হিসেবে এটি কাজে লাগে।
ফাইলে যা জমিয়ে রাখবেন
৫. পাওনা না দিলে কোথায় যাবেন
৩০ কর্মদিবস পার হলেও টাকা না পেলে আগে লিখিতভাবে মালিককে মনে করিয়ে দিন। তাতে কাজ না হলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ নম্বরে ফোন করুন, এটি সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে অনলাইনে অভিযোগ পাঠানোর ব্যবস্থাও আছে।
শেষ পথ শ্রম আদালত। ১৩২ ধারায় পাওনা দেওয়ার তারিখ থেকে ১২ মাসের মধ্যে দরখাস্ত করা যায়, আর ২০২৬ সালের সংশোধনে শ্রমিকের পক্ষে একজন পরিদর্শকও এই দরখাস্ত করতে পারেন। মামলার আগে একজন শ্রম আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
শ্রম আইন অনুযায়ী চাকরি ছাড়ার নোটিশ কত দিন?
নোটিশ ছাড়া রিজাইন দেওয়া যায় কি?
২ বছর চাকরি করে রিজাইন দিলে কি কিছু পাব?
chakri theke resign dile koto diner moddhe taka pabo?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।