
সংক্ষেপে
আয়কর আইন, ২০২৩ এ কর ফাঁকির জন্য দুই রকম ব্যবস্থা আছে। প্রথমটি প্রশাসনিক জরিমানা: আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয় অসত্য দেখিয়ে কর কম দিলে ২৭২ ধারায় ফাঁকি দেওয়া অঙ্ক × ১০% × বছরের সংখ্যা হারে জরিমানা হয়। যে বছরে ফাঁকি হয়েছে, সেখান থেকে যে বছরে ধরা পড়েছে সেই বছর পর্যন্ত গোনা হয়।
দ্বিতীয়টি ফৌজদারি দণ্ড। ইচ্ছাকৃতভাবে কৌশলে কর এড়ানোর চেষ্টা করলে ৩১২ ধারায় সর্বোচ্চ ৫ বছর, তবে অন্তত ৬ মাস কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়ই হতে পারে। সরল ভুল আর ইচ্ছাকৃত গোপনের মধ্যে আইন পার্থক্য করে, আর নিজে আগে ভুল ঠিক করার সুযোগও আছে।
আগের বছরের রিটার্নে আয় বা সম্পদ বাদ পড়েছে কি না, ই-রিটার্নে লগইন করে মিলিয়ে নিন।
এই লেখায়
১. কোনটা কর ফাঁকি, কোনটা সরল ভুল
রিটার্নে একটা সংখ্যা ভুল হলেই সেটা অপরাধ নয়। আইনের ৩১২ ধারা কর এড়ানোর চেষ্টা বলতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ ধরেছে, যেখানে উদ্দেশ্যটা ইচ্ছাকৃত। ধারাটির তালিকা অনুযায়ী নিচের কাজগুলো ইচ্ছাকৃত কর এড়ানোর চেষ্টা বলে গণ্য হয়।
- আয়ের বিবরণ গোপন করা
- কর কমাতে সম্পত্তি, দায় বা ব্যয় সম্পর্কে জেনেশুনে অসত্য বিবরণ দেওয়া
- হিসাব বা দলিলে অসত্য তথ্য বা বিবৃতি দেওয়া
- হিসাব বা বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য তৈরি করা বা করানো
- হিসাবের প্রাসঙ্গিক তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা
- প্রদেয় কর না দেওয়ার উদ্দেশ্যে অন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া
অন্যদিকে ধরুন, একজন চাকরিজীবী ব্যাংকের একটি ছোট এফডিআরের সুদ রিটার্নে দেখাতে ভুলে গেছেন, অথচ ব্যাংক সেই সুদ থেকে উৎসে কর কেটেছে। এটা ভুল, তবে লুকানোর উদ্দেশ্য প্রমাণ করা কঠিন। এমন ভুল নিজে ধরতে পারলে দ্রুত সংশোধন করাই নিরাপদ।
রিটার্নে যা সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে
এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগ ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডে থাকে। তাই রিটার্নে না দেখালেও তথ্য হারিয়ে যায় না, বরং পরে অমিল হিসেবে ধরা পড়ার সুযোগ থাকে।
২. আয় গোপন করলে জরিমানা কত: ২৭২ ধারার হিসাব
২০২৫ সালের অর্থ অধ্যাদেশে ২৭২ ধারার সূত্র বদলেছে, যা ১ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর। এখন জরিমানা = ফাঁকি দেওয়া অঙ্ক × ১০% × বছর। ফাঁকি দেওয়া অঙ্ক মানে, সঠিক তথ্য দেখালে যে কর ও অন্যান্য অঙ্ক দিতে হতো, তা থেকে আসলে যা দেওয়া হয়েছে তা বাদ দিলে যা থাকে। জরিমানা আরোপ করতে পারেন কমিশনার বা তার ওপরের পদের আয়কর কর্তৃপক্ষ, অথবা কর আপিল ট্রাইব্যুনাল।
| উদাহরণ | হিসাব |
|---|---|
| ২০২৪-২৫ করবর্ষে আয় গোপনে কর কম দেওয়া হয়েছে | ২,০০,০০০ টাকা |
| ধরা পড়ল ২০২৬-২৭ করবর্ষে | মোট বছর ৩টি (২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬, ২০২৬-২৭) |
| জরিমানা | ২,০০,০০০ × ১০% × ৩ = ৬০,০০০ টাকা |
| এর সঙ্গে | ফাঁকি দেওয়া মূল কর আলাদাভাবে দিতে হবে |
হিসাবটা দেখলেই বোঝা যায়, যত দেরিতে ধরা পড়ে, জরিমানা তত বাড়ে। তাই পুরোনো বছরের কোনো আয় বা সম্পদ বাদ পড়ে থাকলে তা যত আগে ঠিক করবেন, ঝুঁকি তত কম।
আয়কর আইনের ২৮০ ধারার শিরোনাম অনুযায়ী শুনানি ছাড়া জরিমানা আরোপে নিষেধাজ্ঞা আছে। নোটিশ পেলে নির্ধারিত দিনে নিজে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে কাগজসহ হাজির হন।
৩. কর ফাঁকি কোন ধরনের অপরাধ: জেল আর অর্থদণ্ড
জরিমানার বাইরে আইনের ২২ নম্বর অংশে কিছু কাজকে ফৌজদারি অপরাধ বলা হয়েছে। এগুলোর বিচার হয় আদালতে, আর দণ্ড হলে জেলও হতে পারে।
| অপরাধ | ধারা | দণ্ড |
|---|---|---|
| ইচ্ছাকৃতভাবে কৌশলে কর এড়ানোর চেষ্টা | ৩১২ | ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অর্থদণ্ড, বা উভয় |
| জেনেশুনে মিথ্যা হিসাব বা বিবৃতি দেওয়া | ৩১৩ | অর্থদণ্ডসহ ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড |
| জাল বা অন্যের TIN ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার | ৩১৭ | সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় |
অনেকে ভাবেন TIN ধার নিয়ে কোনো কাজ সেরে ফেলা নিরীহ ব্যাপার। ৩১৭ ধারা দেখাচ্ছে, অন্যের TIN ব্যবহার আলাদা অপরাধ, যার দায় ব্যবহারকারীর।
৩২৫ ধারা অনুযায়ী কমিশনার বোর্ডের পূর্বানুমোদন নিয়ে এই অংশের অপরাধ মামলা দায়েরের আগে বা পরে আপোষ করতে পারেন। তবে আপোষ করদাতার অধিকার নয়, কর্তৃপক্ষের বিবেচনা।
৪. নিজের ভুল ধরা পড়লে যা করবেন
- ১কী বাদ পড়েছে, তালিকা করুনব্যাংক স্টেটমেন্ট, সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরের সনদ, বাড়িভাড়ার রসিদ আর জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল মিলিয়ে দেখুন কোন আয় বা সম্পদ রিটার্নে ওঠেনি।
- ২চলতি বছরের রিটার্ন হলে সংশোধিত রিটার্ন দিনআইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একবার সংশোধিত রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ আছে। শর্ত আর সময় আমাদের সংশোধিত রিটার্ন নিয়ে লেখায় দেওয়া আছে।
- ৩বাড়তি কর পরিশোধ করুনসংশোধনে কর বাড়লে ই-রিটার্নের পেমেন্ট অপশন বা এ-চালানে টাকা দিন, প্রমাণ রেখে দিন।
- ৪নোটিশ এলে উপেক্ষা করবেন নাঅডিট বা শুনানির নোটিশে চাওয়া কাগজ সময়মতো দিন। নোটিশ না মানলে উপকর কমিশনার ১৮৪ ধারায় সর্বোত্তম বিচারভিত্তিক কর নির্ধারণ করতে পারেন, মানে আপনার ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে কর ঠিক হবে।
- ৫দরকার হলে পেশাদার সাহায্য নিনঅঙ্ক বড় হলে বা মামলার আশঙ্কা থাকলে নিবন্ধিত আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন। জরিমানার আদেশে আপত্তি থাকলে আপিলের পথও আছে।
৫. জরিমানার আদেশে আপত্তি থাকলে
জরিমানা আরোপের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যায়, ২৮৬ ধারায় দণ্ড বা সুদ আরোপকে আপিলযোগ্য বিষয় বলা আছে। ২৭২ ধারার জরিমানা নিয়ে অতিরিক্ত কর কমিশনার (আপিল) বা কমিশনার (আপিল) এর আদেশেও সন্তুষ্ট না হলে ২৯১ ধারায় আপিল ট্রাইব্যুনালে যাওয়া যায়। সময়সীমা আর ফি আমাদের আয়কর আপিল নিয়ে লেখায় আছে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
কর ফাঁকি কোন ধরনের অপরাধ?
কর ফাঁকির জরিমানা কত?
কর ফাঁকির মামলা কি আপোষ করা যায়?
অন্যের TIN ব্যবহার করলে কী শাস্তি?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।