
সংক্ষেপে
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমতি ছাড়া এক মাসের ভাড়ার বেশি অগ্রিম নেওয়া যায় না, আর ভাড়া পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে সই করা রসিদ দিতে হয়। মানসম্মত ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের সমান ধরা হয়, আর তা প্রতি দুই বছর পর পুনর্নির্ধারণ করা যায়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২০ জানুয়ারি ২০২৬ সালে এই আইনের আলোকে ১৬ দফার নির্দেশিকা দিয়েছে। সেখানে দুই বছরের আগে ভাড়া না বাড়ানো, মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া আর লিখিত চুক্তির কথা আছে। তবে অগ্রিম নিয়ে নির্দেশিকা আর আইনের ভাষা এক নয়, নিচে দুটোই দেখুন।
অগ্রিম, রসিদ, মানসম্মত ভাড়া, উচ্ছেদ আর শাস্তির ধারাগুলো আইন সংকলনে পড়ুন।
এই লেখায়
১. অগ্রিম ভাড়া কত মাস নেওয়া যায়
আইনের ১০ ধারা দুটি কথা বলে। ভাড়া দেওয়া, নবায়ন বা মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ভাড়ার বাইরে কোনো প্রিমিয়াম, সালামি, জামানত বা অনুরূপ টাকা দাবি করা যাবে না। আর নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমোদন ছাড়া অগ্রিম হিসেবে এক মাসের ভাড়ার বেশি নেওয়া যাবে না।
ডিএনসিসির নির্দেশিকার ১৩ নম্বর দফায় লেখা আছে, বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম নেওয়া যাবে না। নির্দেশিকা আইন নয়, আর আইনে সীমা এক মাস। তাই বিরোধ হলে আইনের ধারাই প্রাধান্য পাবে বলে ধরে নিন, আর বড় অঙ্কের অগ্রিম দেওয়ার আগে চুক্তিতে কত টাকা কবে ফেরত দেওয়া হবে, তা লিখিয়ে নিন।
২৩ ধারায়, নিয়ন্ত্রকের লিখিত সম্মতি ছাড়া এক মাসের বেশি অগ্রিম নিলে প্রথমবার বাড়তি নেওয়া টাকার দ্বিগুণ পর্যন্ত, পরের প্রতিবার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড। সালামি বা জামানত নিলে প্রথমবার দুই হাজার, পরে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।
২. ভাড়া কখন, কতটা বাড়ানো যায়
আইনে ভাড়ার মাপকাঠি হলো মানসম্মত ভাড়া। ১৫ ধারায় বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার আবেদনে নিয়ন্ত্রক তা ঠিক করেন, যাতে বছরে মোট ভাড়া বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের সমান হয়। ১৬ ধারায় মানসম্মত ভাড়া প্রতি দুই বছর পর পুনর্নির্ধারণ করা যায়। ৭ ধারায়, মানসম্মত ভাড়ার বেশি বাড়ানো অংশ চুক্তিতে যা-ই থাকুক, আদায়যোগ্য নয়।
| বিষয় | আইন (১৯৯১) | ডিএনসিসি নির্দেশিকা (২০২৬) |
|---|---|---|
| ভাড়া বাড়ানো | মানসম্মত ভাড়া প্রতি দুই বছর পর পুনর্নির্ধারণযোগ্য | দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই নয়, বাড়ানোর সময় জুন-জুলাই |
| ভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা | বছরে বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ (মানসম্মত ভাড়া) | বছরে বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি নয় |
| অগ্রিম | নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া এক মাসের বেশি নয় | ১ থেকে ৩ মাসের বেশি নয় |
| ভাড়া দেওয়ার সময় | চুক্তির তারিখে, না থাকলে পরের মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে | মাসের ১০ তারিখের মধ্যে |
বাস্তবে বেশির ভাগ বাড়ির মানসম্মত ভাড়া কখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তখন আইনের ১৮(৬) ধারা অনুযায়ী বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার চুক্তিকৃত ভাড়াই অনুমোদনযোগ্য ভাড়া। তাই হঠাৎ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এলে লিখিত চুক্তিটাই আপনার প্রথম ভরসা।
মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের আবেদন বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া, যে কেউ করতে পারেন। ১৬ ধারা অনুযায়ী নির্ধারণকালে ভাড়া বাড়লে বা কমলে তা দরখাস্তের পরের মাস থেকে প্রদেয় হয়।
৩. ভাড়ার রসিদ আর লিখিত চুক্তি
১৩ ধারায় ভাড়া পরিশোধ করলে বাড়িওয়ালা তৎক্ষণাৎ নির্ধারিত ফরমে সই করা রসিদ দেবেন আর রসিদের চেকমুড়ি রাখবেন। ডিএনসিসির নির্দেশিকাতেও প্রতি মাসে লিখিত রসিদের কথা আছে। মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংকে ভাড়া দিলে লেনদেনের বার্তা রেখে দিন, তবু সই করা রসিদ চেয়ে নিন।
ভাড়ার চুক্তিতে যা লিখিয়ে নেবেন
আইনের ১২ ধারায় ভাড়া দেওয়ার শর্ত হিসেবে বাড়ির আসবাবপত্র কিনতে বাধ্য করা যায় না। ডিএনসিসির নির্দেশিকার ১২ নম্বর দফা বলছে, চুক্তিতে ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা আর কখন বাড়ি ছাড়বেন, তা অবশ্যই থাকতে হবে।
৪. মেরামত আর গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ নিয়ে বিরোধ
- ১লিখিতভাবে জানানমেরামত বা সংযোগের সমস্যা বাড়িওয়ালাকে লিখে জানান, ছবি রাখুন। ডিএনসিসির নির্দেশিকায় বাড়ি বসবাসের উপযোগী রাখা আর গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিতের দায় বাড়িওয়ালার।
- ২নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদনচুক্তি বা স্থানীয় প্রথায় বাড়িওয়ালা মেরামতে বাধ্য হলে আইনের ২১ ধারায় ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদন করতে পারেন। নিয়ন্ত্রক নোটিশ দিয়ে মেরামতের নির্দেশ দেন।
- ৩৩০ দিনে না হলেনোটিশের ৩০ দিনের মধ্যে বাড়িওয়ালা মেরামত না করলে ভাড়াটিয়া আনুমানিক খরচের হিসাবসহ নিজে মেরামতের অনুমতি চাইতে পারেন।
- ৪খুব জরুরি হলেদেরিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মেরামতের নোটিশ দিয়ে খরচের হিসাবসহ কপি নিয়ন্ত্রকের কাছে দিতে পারেন।
ভাড়াটিয়াকে চাপ দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে পানি-বিদ্যুতের মতো ভাড়ার শর্তের সুবিধা বন্ধ করলে ২৪ ধারায় প্রথমবার পাঁচশ টাকা পর্যন্ত, পরে প্রতিবার এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
৫. অভিযোগ কোথায় করবেন
আইনের সব প্রতিকার যায় নিয়ন্ত্রকের কাছে, যাঁকে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে এলাকাভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আপনার এলাকার নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় কোথায়, তা জেলা জজ আদালত বা একজন আইনজীবীর কাছে জেনে নিন। ডিএনসিসি এলাকায় নির্দেশিকা অনুযায়ী আগে ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতির সালিশে, তারপর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি তোলা যায়।
বাসা ছাড়ার নোটিশ আর উচ্ছেদের নিয়ম আলাদা লেখায় দেওয়া আছে। বিরোধ জটিল হলে বা টাকার অঙ্ক বড় হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
অভিযোগ বা দরখাস্তের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি, রসিদ, মানি অর্ডার বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রমাণ আর বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত যোগাযোগের কপি রাখুন। কাগজ যত গোছানো থাকবে, নিয়ন্ত্রক বা সালিশে আপনার কথা তত সহজে প্রমাণ হবে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
অগ্রিম ভাড়া কত মাস নেওয়া যায়?
বাড়ি ভাড়া আইন ২০২৬ কি নতুন কোনো আইন?
বছরে কতবার ভাড়া বাড়ানো যায়?
bari vara ain অনুযায়ী রসিদ না দিলে কী করব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।