
সংক্ষেপে
সুবর্ণ নাগরিক কার্ড হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩১ ধারায় দেওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র। কার্ড করতে স্থায়ী ঠিকানার উপজেলা কমিটি বা শহর কমিটির সভাপতির কাছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রসহ আবেদন করতে হয়।
আইন বলছে, এই পরিচয়পত্র ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য রাখা কোনো সরকারি সুবিধা পাওয়া যাবে না। প্রতিবন্ধী ভাতার অনলাইন আবেদনেও এই কার্ড বাধ্যতামূলক। আবেদন বাতিল হলে কারণ জানার ৩০ দিনের মধ্যে জেলা কমিটিতে আপিল করা যায়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রতিবন্ধী নিবন্ধনের অনলাইন আবেদনের লিংক এখানে।
এই লেখায়
১. সুবর্ণ নাগরিক কার্ড কি, কেন লাগে
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩১ ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন আর পরিচয়পত্র দেওয়ার বিধান আছে। এই পরিচয়পত্রই সাধারণভাবে সুবর্ণ নাগরিক কার্ড নামে পরিচিত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচির উদ্দেশ্যের তালিকাতেও আছে, জরিপ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুবর্ণ নাগরিক কার্ড দেওয়া।
৩১(৬) ধারা সবচেয়ে জরুরি: এই ধারায় ইস্যু করা পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই আইন বা অন্য কোনো আইনে প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা সুবিধা নিতে পারবেন না। তাই প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি বা অন্য সুবিধার আগে কার্ডটি করে রাখাই প্রথম কাজ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের ভাতা আবেদনের নির্দেশনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিবন্ধী ভাতা আর প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তির জন্য সুবর্ণ নাগরিক কার্ড বা তার নম্বর থাকতে হবে।
কার্ডটি শুধু ভাতার জন্য নয়। আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা, গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বৈষম্য থেকে সুরক্ষার মতো নানা অধিকারের কথা আছে। কোনো জায়গায় এসব অধিকার চাইতে গেলে নিবন্ধনের পরিচয়পত্রটিই আপনার প্রমাণ।
২. কারা নিবন্ধন করতে পারবেন: আইনে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতা
আইনের ৩ ধারায় প্রতিবন্ধিতার ধরনগুলো তালিকা করা আছে। আপনার পরিবারের সদস্যের অবস্থা এর কোনোটির সঙ্গে মিললে নিবন্ধনের আবেদন করতে পারেন।
- অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার
- শারীরিক প্রতিবন্ধিতা
- মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা
- দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বাকপ্রতিবন্ধিতা ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা
- বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা
- শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা
- সেরিব্রাল পালসি ও ডাউন সিনড্রোম
- বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা
কোনো একটি ধরনে পুরোপুরি না মিললেও ‘অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা’ শ্রেণি আছে। শিশুর বিকাশে দেরি, কথা বলতে বা হাঁটতে সমস্যা থাকলে আগে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে দেখান। চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রে প্রতিবন্ধিতার ধরন যত স্পষ্ট লেখা থাকবে, কমিটির যাচাই তত সহজ হবে।
৩. সুবর্ণ নাগরিক কার্ড করতে কি কি লাগে
আবেদনের সঙ্গে রাখুন
আইন অনুযায়ী আবেদন করতে পারেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে, তাঁর মা-বাবা, বৈধ বা আইনানুগ অভিভাবক, অথবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন। চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রই প্রতিবন্ধিতা প্রমাণের মূল কাগজ, কমিটি এটি বিবেচনায় নিতে বাধ্য।
চিকিৎসকের প্রত্যয়ন নেওয়ার দিন রোগীর আগের চিকিৎসার কাগজ, পরীক্ষার রিপোর্ট আর ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে নিন। বিশেষ করে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বা অটিজমের ক্ষেত্রে আগের মূল্যায়নের কাগজ থাকলে চিকিৎসকের পক্ষে প্রত্যয়ন দেওয়া সহজ হয়। প্রত্যয়নপত্রে চিকিৎসকের নাম, পদবি, সিল আর তারিখ আছে কি না দেখে নিন।
কাগজের ফটোকপি দুই সেট করে নিয়ে যান, একটি জমা দেবেন, আরেকটি নিজের কাছে রাখবেন।
৪. সুবর্ণ নাগরিক কার্ড আবেদনের ৪ ধাপ
- ১চিকিৎসকের প্রত্যয়ন নিনউপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কাছে প্রতিবন্ধিতার ধরন উল্লেখ করে প্রত্যয়নপত্র নিন।
- ২উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে যানউপজেলায় কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদস্য-সচিব উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা। সিটি করপোরেশন এলাকায় শহর কমিটি কাজ করে। অফিস থেকে নির্ধারিত ফরম আর অনলাইন আবেদনের নিয়ম জেনে নিন।
- ৩আবেদন জমা দিনফরম, প্রত্যয়নপত্র আর পরিচয়ের কাগজসহ আবেদন জমা দিন। প্রতিবন্ধিতা তথ্য সিস্টেমে তথ্য তোলা হলে নম্বরটি লিখে রাখুন।
- ৪যাচাই আর কার্ড গ্রহণকমিটি তথ্য যাচাই করে উপযুক্ত মনে করলে সদস্য-সচিব রেজিস্টারে তথ্য তুলে নিবন্ধন করেন এবং পরিচয়পত্র ইস্যু করেন।
আইনে কার্ড দেওয়ার সময়সীমা আলাদা করে লেখা নেই, কমিটির সভার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। তাই আবেদনের পর সমাজসেবা কার্যালয়ে মাঝে মাঝে খোঁজ নিন আর আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকার বা নম্বর রেখে দিন।
ধরুন, আপনার আট বছরের ছেলের সেরিব্রাল পালসি আছে। আপনি মা হিসেবে তার জন্ম নিবন্ধন আর সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের প্রত্যয়ন নিয়ে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করবেন। কার্ড হাতে পেলে পরে তার শিক্ষা উপবৃত্তি বা ভাতার আবেদনে এই নম্বরই লাগবে।
উপজেলা কমিটিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজন সদস্য থাকেন। তাই সিদ্ধান্ত সাধারণত কমিটির সভায় হয়। সভার তারিখ জানতে সমাজসেবা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
৫. আবেদন বাতিল হলে আপিল, আর কার্ড হারালে
- শুনানি না দিয়ে কমিটি কোনো আবেদন বাতিল করতে পারে না। বাতিল করলে কারণ লিখে আবেদনকারীকে জানাতে হয়।
- বাতিলের কারণ জানার ৩০ দিনের মধ্যে জেলা কমিটির কাছে আপিল করা যায়।
- ডুপ্লিকেট পরিচয়পত্রসহ আনুষঙ্গিক বিষয় বিধিমালা অনুযায়ী ঠিক হয়। কার্ড হারালে উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে জিজ্ঞেস করুন কী কাগজ লাগবে।
কার্ড হাতে পেলে কয়েকটি ফটোকপি করে রাখুন আর নম্বরটি মোবাইলে লিখে রাখুন। ভাতা, উপবৃত্তি বা অন্য সুবিধার আবেদনে বারবার এই নম্বর লাগবে। কার্ডে নাম বা জন্মতারিখ ভুল থাকলে দেরি না করে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে জানান।
আপিলের আবেদনে বাতিলের চিঠির কপি, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র আর আগের আবেদনের তথ্য যুক্ত করুন। প্রয়োজনে নতুন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত নিয়ে জমা দিতে পারেন, এতে আপনার দাবি জোরালো হয়।
আইনে নিবন্ধনের দায়িত্ব কমিটির, কোনো মধ্যস্থতাকারীর নয়। কার্ড করিয়ে দেওয়ার নামে কেউ টাকা চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে জানান।
৬. অনেকে যা জানতে চান
সুবর্ণ নাগরিক কার্ড কিভাবে করব?
সুবর্ণ নাগরিক কার্ড এর সুবিধা কী?
suborno nagorik card online abedon কি নিজে করা যায়?
আবেদন বাতিল হলে কী করব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।