
সংক্ষেপে
ভাড়াটিয়াকে বাসা ছাড়ার নোটিশ মাসিক ভাড়ার ক্ষেত্রে আইনে অন্তত ১৫ দিনের হতে হয়, আর তা ভাড়ার মাস শেষ হওয়ার দিনে কার্যকর হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ১০৬ ধারায় এই নিয়ম, যদি চুক্তিতে ভিন্ন কিছু না থাকে। নোটিশ হতে হবে লিখিত ও সই করা, ডাকে পাঠানো বা হাতে দেওয়া।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০২৬ সালের নির্দেশিকা দুই পক্ষকেই চুক্তি বাতিলে দুই মাসের নোটিশ দিতে বলেছে। নোটিশের পরও ভাড়াটিয়া না ছাড়লে বাড়িওয়ালাকে আদালতে যেতে হয়, তালা দেওয়া বা পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ করা আইনে দণ্ডনীয়।
১০৬ ধারায় মাসিক ও বার্ষিক ভাড়ার নোটিশের মেয়াদ আর নোটিশ পাঠানোর পদ্ধতি।
এই লেখায়
১. বাসা ছাড়ার নোটিশ কত দিন আগে দিতে হয়
| ভাড়ার ধরন | নোটিশের মেয়াদ | উৎস |
|---|---|---|
| বাসা, দোকান, অফিসসহ সাধারণ ভাড়া (মাসিক) | অন্তত ১৫ দিন, ভাড়ার মাস শেষ হওয়ার দিনে কার্যকর | সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৬ ধারা |
| কৃষি বা কারখানার জন্য ভাড়া (বার্ষিক) | ছয় মাস, ভাড়ার বছর শেষ হওয়ার দিনে কার্যকর | ১০৬ ধারা |
| ঢাকা উত্তর সিটির আবাসিক ভাড়া | দুই পক্ষই দুই মাসের নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারেন | ডিএনসিসির ২০২৬ সালের নির্দেশিকা |
| লিখিত চুক্তিতে আলাদা মেয়াদ | চুক্তির মেয়াদ প্রযোজ্য | ১০৬ ধারার শুরুর শর্ত |
‘মাস শেষে কার্যকর’ কথাটা খেয়াল করুন। ধরুন ভাড়ার মাস ১ তারিখে শুরু হয়। ২০ নভেম্বর নোটিশ দিলে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ দিন হয় না, তাই নোটিশ কার্যকর হবে ৩১ ডিসেম্বর। ১০ নভেম্বরের মধ্যে দিলে ৩০ নভেম্বর থেকেই কার্যকর ধরা যায়। ঝামেলা এড়াতে চুক্তিতেই নোটিশের মেয়াদ লিখে রাখা সবচেয়ে ভালো।
২. কোন কারণে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যায়
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৮ ধারা ভাড়াটিয়াকে বড় সুরক্ষা দেয়। ভাড়াটিয়া যতদিন অনুমোদনযোগ্য পুরো ভাড়া সময়মতো দেন আর ভাড়ার শর্ত মানেন, ততদিন বাড়ির দখল ফেরতের আদেশ বা ডিক্রি দেওয়া যায় না। শুধু ভাড়ার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা বাড়ি বিক্রি হয়েছে, এটুকু কারণ যথেষ্ট নয়, যদি ভাড়াটিয়া পুরো ভাড়া দিতে প্রস্তুত থাকেন।
- চুক্তির তারিখে, না থাকলে পরের মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পুরো ভাড়া না দিলে ভাড়াটিয়া এই সুরক্ষা হারান।
- বাড়িওয়ালার লিখিত সম্মতি ছাড়া বাড়ি বা তার অংশ আরেকজনকে ভাড়া দিলে।
- প্রতিবেশীদের জন্য উৎপাত বা বিরক্তিকর আচরণ করলে।
- বাড়ির কোনো অংশ বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করলে।
- বাড়ির ক্ষতি করা বা ভিন্ন কাজে ব্যবহারের মতো সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৮ ধারার শর্ত ভাঙলে।
- নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ বা নিজে থাকার জন্য বাড়িওয়ালার সত্যিই প্রয়োজন হলে, বা আদালতের কাছে সন্তোষজনক অন্য কারণ দেখাতে পারলে।
১৮(৪) ধারায়, নিজ দখল বা নির্মাণের কথা বলে বাড়ি খালি করানোর পর দুই মাসের মধ্যে সে কাজ শুরু না হলে, বা ছয় মাসের মধ্যে অন্য কাউকে ভাড়া দিলে, সাবেক ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন।
৩. বাসা ছাড়ার নোটিশে কী লিখবেন
১০৬ ধারা অনুযায়ী নোটিশ লিখিত হতে হবে আর যিনি দিচ্ছেন তিনি বা তাঁর পক্ষে কেউ সই করবেন। নোটিশ ডাকে পাঠানো যায়, ভাড়াটিয়া বা তাঁর পরিবারের কারও হাতে দেওয়া যায়, তা সম্ভব না হলে বাড়ির প্রকাশ্য জায়গায় লাগিয়ে দেওয়া যায়।
নোটিশে যা থাকা দরকার
রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠালে রসিদ আর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র রেখে দিন। হাতে দিলে অফিস কপিতে ভাড়াটিয়ার সই বা একজন সাক্ষীর সই নিয়ে রাখুন। দোকান বা অফিসের ক্ষেত্রেও মাসিক ভাড়া হলে একই ১৫ দিনের নিয়ম, যদি চুক্তিতে আলাদা কিছু না থাকে।
নোটিশের ভাষা নরম আর তথ্যনির্ভর রাখুন। হুমকি বা অপমানজনক কথা লিখলে পরে আদালতে সেটি আপনার বিপক্ষে যেতে পারে।
৪. নোটিশের পরও ভাড়াটিয়া না ছাড়লে
- ১আলোচনা আর সালিশআগে কথা বলুন, কবে ছাড়তে পারবেন জেনে নিন। ডিএনসিসি এলাকায় নির্দেশিকা অনুযায়ী ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতির সালিশ, তারপর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যাওয়া যায়।
- ২বকেয়া হলে লিখিত সতর্কতাডিএনসিসির নির্দেশিকা বলছে, ভাড়া বাকি পড়লে আগে মৌখিক সতর্কতা ও তাগাদা, তারপর সব বকেয়া পরিশোধ করে দুই মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার লিখিত নোটিশ।
- ৩আইনজীবীর মাধ্যমে মামলাতবুও না ছাড়লে বাড়ির দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়। কোন আদালতে, কোন কাগজ লাগবে, আইনজীবী ঠিক করবেন।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ২৪ ধারায়, ভাড়াটিয়াকে চাপ দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাড়ার শর্তের সরবরাহ বা সুবিধা বন্ধ করলে বা জিনিস সরিয়ে বাসা ব্যবহার-অযোগ্য করলে প্রথমবার পাঁচশ টাকা, পরে প্রতিবার এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। জোর খাটালে উল্টো আপনার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।
৫. ভাড়াটিয়ার দিক থেকে: বাড়িওয়ালা ভাড়া না নিলে
বাড়িওয়ালা ভাড়া নিতে অস্বীকার করলে পরে বকেয়ার অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি থাকে। আইনের ১৯ ধারা এ জন্যই। ভাড়া ডাক মানি অর্ডারে পাঠান। বাড়িওয়ালা না নিলে মানি অর্ডার ফেরত আসার ১৫ দিনের মধ্যে ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে দরখাস্তসহ ভাড়া জমা দিতে পারেন, আর পরের মাসগুলোর ভাড়াও একইভাবে জমা দিয়ে যেতে পারেন।
এভাবে জমা দিলে ভাড়াটিয়া ১৮ ধারার সুরক্ষা ধরে রাখেন। ২০ ধারা বলছে, বাড়িওয়ালা এমন ভাড়া গ্রহণ করলে তা দিয়ে ধরা হবে না যে তিনি বাসা খালির নোটিশ প্রত্যাহার করেছেন। অগ্রিম, রসিদ আর ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম আমাদের বাড়ি ভাড়া আইনের লেখায় আছে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
ভাড়াটিয়াকে বাসা ছাড়ার নোটিশ কত দিন আগে দিতে হয়?
বাসা ছাড়ার নোটিশ নমুনা কোথায় পাব?
ভাড়াটিয়া কি বাড়িওয়ালাকে নোটিশ দিয়ে বাসা ছাড়তে পারেন?
নোটিশ দেওয়ার পরও না ছাড়লে কি তালা দেওয়া যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।