
সংক্ষেপে
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী তালাক দিলে যত দ্রুত সম্ভব ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান কিংবা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে লিখিত নোটিশ দিতে হয়, আর এর একটি কপি স্ত্রীকে দিতে হয়। চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন পার না হলে তালাক কার্যকর হয় না।
এই ৯০ দিনের মধ্যে নোটিশ প্রত্যাহার করা যায়, আর নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সমঝোতার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করেন। নোটিশ না দিলে এক বছর পর্যন্ত বিনা শ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ বাংলাদেশ আইন সংকলনে পড়া যায়।
এই লেখায়
১. তালাকের নোটিশ কাকে, কিভাবে পাঠাতে হয়
অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা বলছে, যে পুরুষ স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তিনি যেকোনো রূপে তালাক উচ্চারণের পর যত দ্রুত সম্ভব চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেবেন এবং তার একটি কপি স্ত্রীকে দেবেন। শুধু মুখে বলা বা মোবাইলে বার্তা পাঠানো এই আইনি নোটিশের বিকল্প নয়।
আইনে ‘চেয়ারম্যান’ বলতে বোঝানো হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র), সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, আর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সরকারের নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তি। চেয়ারম্যান মুসলিম না হলে বা অন্য কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে পরিষদ একজন মুসলিম সদস্যকে এই কাজের জন্য বেছে নেয়।
নোটিশে সাধারণত যা থাকে
নোটিশ কার্যালয়ে হাতে হাতে বা রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠানো হয়, যাতে প্রাপ্তির প্রমাণ থাকে। কোন এলাকার কার্যালয়ে পাঠাবেন আর নির্দিষ্ট কোনো ছক আছে কি না, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে অথবা একজন আইনজীবীর কাছে জেনে নিন।
নোটিশের একটি কপি নিজের কাছে রাখুন, আর স্ত্রীকে পাঠানো কপির ডাক রসিদ বা প্রাপ্তিস্বীকারও রেখে দিন। পরে কোনো বিরোধ হলে কবে নোটিশ পৌঁছেছে, তার প্রমাণ এই কাগজগুলোই।
২. নোটিশ পাঠানোর পর ৯০ দিন: কী হয়
- ১নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে গণনা৭(৩) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন শুরু হয়। তার আগে তালাক কার্যকর নয়।
- ২৩০ দিনের মধ্যে সালিশি পরিষদনোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান দুই পক্ষের সমঝোতার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করেন। পরিষদে থাকেন চেয়ারম্যান আর দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি।
- ৩সমঝোতার চেষ্টাসালিশি পরিষদ পুনর্মিলনের সব চেষ্টা করে। এক পক্ষ প্রতিনিধি না দিলেও পরিষদ কাজ করতে পারে।
- ৪৯০ দিন পর কার্যকরএর মধ্যে নোটিশ প্রত্যাহার না হলে ৯০ দিন পূর্ণ হলে তালাক কার্যকর হয়।
৯০ দিনের হিসাবটি একটি উদাহরণে বোঝা সহজ। ধরুন, ১ মার্চ তালাক দেওয়া হলো, কিন্তু নোটিশ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে পৌঁছাল ১০ মার্চ। তাহলে গণনা শুরু ১০ মার্চ থেকে, তালাক দেওয়ার দিন থেকে নয়। এ জন্যই নোটিশ পৌঁছানোর প্রমাণ রাখা জরুরি।
৭(৫) ধারা অনুযায়ী তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে ৯০ দিন অথবা গর্ভাবস্থা, যেটি পরে শেষ হয়, তার আগে তালাক কার্যকর হয় না।
৩. স্বামী তালাকের নোটিশ পাঠালে কি তালাক হয়
নোটিশ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে নয়। আইনের হিসাবে চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর পর ৯০ দিন পার হতে হয়, আর এর মধ্যে নোটিশ প্রত্যাহার না হলে তবেই তালাক কার্যকর। এই সময়ে সমঝোতা হলে বিয়ে বহাল থাকে।
স্ত্রী হিসেবে নোটিশের কপি পেলে কাগজটি যত্ন করে রাখুন। সালিশি পরিষদের শুনানির তারিখ জানতে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যোগাযোগ রাখুন। দেনমোহর আর ইদ্দতকালীন ভরণপোষণের দাবি থাকলে আগেভাগেই একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় প্রকাশিত আইনজীবীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ইদ্দতের সময় স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।
৭(৬) ধারায় আরও বলা আছে, এভাবে কার্যকর তালাকের পর স্ত্রী একই স্বামীকে মাঝখানে অন্য বিয়ে ছাড়াই আবার বিয়ে করতে পারেন, যদি না এটি তৃতীয়বারের মতো কার্যকর তালাক হয়।
৯০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ সংসার চালিয়ে যেতে চাইলে নোটিশ প্রত্যাহারের বিষয়টি চেয়ারম্যানের কার্যালয়কে লিখিতভাবে জানানোই নিরাপদ।
৪. স্ত্রী তালাকের নোটিশ পাঠালে কি তালাক হয়
অধ্যাদেশের ৮ ধারা বলছে, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা যথাযথভাবে অর্পণ করা থাকলে, অথবা তালাক ছাড়া অন্য উপায়ে বিয়ে বিচ্ছেদ হলে, ৭ ধারার নোটিশ আর ৯০ দিনের নিয়মই প্রযোজ্য।
- তালাক-ই-তাফবিজ: কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিয়ে থাকলে স্ত্রী নিজেই তালাক দিয়ে একইভাবে নোটিশ পাঠাতে পারেন।
- খুলা: দুই পক্ষের সম্মতিতে বিচ্ছেদ।
- আদালতের ডিক্রি: ক্ষমতা অর্পণ না থাকলে নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার মতো কারণে মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে আবেদন করা যায়।
কাবিননামা হাতে না থাকলে যে নিকাহ রেজিস্ট্রার বিয়ে নিবন্ধন করেছিলেন, তাঁর কাছ থেকে প্রত্যয়িত কপি নিন। ১৮ নম্বর ঘরে কী লেখা আছে, তা দেখেই বোঝা যাবে স্ত্রীর হাতে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া আছে কি না।
৫. নোটিশ না দিলে শাস্তি, আর তালাক নিবন্ধন
৭(২) ধারা অনুযায়ী লিখিত নোটিশ না দিলে বা স্ত্রীকে কপি না দিলে এক বছর পর্যন্ত বিনা শ্রম কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা দুটোই হতে পারে। আর সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করলে ৬ ধারায় পুরো দেনমোহর সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধসহ আলাদা শাস্তির বিধান আছে।
নোটিশের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে তালাক নিবন্ধন করাতে হয়। নিবন্ধনের ফি আর কাগজ নিয়ে আমাদের বিবাহ নিবন্ধন ফি-র লেখায় তথ্য আছে।
দেনমোহর, সন্তানের দায়িত্ব বা সম্পত্তির প্রশ্ন জড়িত থাকলে নিজের অবস্থা নিয়ে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। প্রতিটি পরিবারের ঘটনা আলাদা।
৬. অনেকে যা জানতে চান
তালাকের নোটিশ কোথায় পাঠাতে হয়?
স্বামী তালাকের নোটিশ পাঠালে কি সঙ্গে সঙ্গে তালাক হয়?
talak notice না দিলে কি শাস্তি হয়?
স্ত্রী কি তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারেন?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।