দৈনন্দিন সেবা

মোটরসাইকেল বা গাড়ির নাম পরিবর্তন: বিআরটিএতে মালিকানা বদলির কাগজ, ফি আর সময়

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬bsp.brta.gov.bd
মোটরসাইকেল বা গাড়ির নাম পরিবর্তন: বিআরটিএতে মালিকানা বদলির কাগজ, ফি আর সময়

সংক্ষেপে

পুরোনো মোটরসাইকেল বা গাড়ি কিনলে সেটি নিজের নামে নিতে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP) থেকে মালিকানা বদলির আবেদন করতে হয়। বিআরটিএর সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী ফি হলো ওই যানের নিবন্ধন ফির তিন ভাগের এক ভাগ, সঙ্গে ১৫% ভ্যাট। সেই হিসাবে ১০০ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ফি দাঁড়ায় ১,১৫০ টাকা।

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী বিক্রেতাকে ৩০ দিনের মধ্যে বিআরটিএকে জানাতে হয়, আর ক্রেতাকে ৬০ দিনের মধ্যে নিজের নামে আবেদন করতে হয়। না করলে ক্রেতার এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। বিক্রেতার ঘাড়েও থেকে যায় কর আর সারচার্জের দায়।

বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP)

মালিকানা বদলির আবেদন, ফি জমা আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট এখান থেকে।

আবেদন করুন
এই লেখায়
  1. কেন দেরি করবেন না: আইন আর বিআরটিএর সতর্কতা
  2. কত টাকা লাগবে
  3. কেনাবেচার ক্ষেত্রে যে কাগজ লাগে
  4. আবেদনের ধাপ
  5. মালিক মারা গেলে: ওয়ারিশ সূত্রে বদলি
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. কেন দেরি করবেন না: আইন আর বিআরটিএর সতর্কতা

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২১ ধারায় সময় বেঁধে দেওয়া আছে। হস্তান্তরের ৩০ দিনের মধ্যে বিক্রেতা নির্ধারিত ফরমে বিআরটিএকে জানাবেন আর এর কপি ক্রেতাকে দেবেন। ক্রেতা হস্তান্তরের ৬০ দিনের মধ্যে নিজের নামে নিবন্ধনের আবেদন করবেন। আবেদন পাওয়ার পর বিআরটিএ অনধিক ৩০ দিনে কাজ শেষ করবে।

আইনের ৭৪ ধারা অনুযায়ী ক্রেতা এই নিয়ম না মানলে অনধিক এক মাস কারাদণ্ড, অনধিক ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা দুটোই হতে পারে। ২০২৬ সালের ২৪ জুন বিআরটিএ তাদের ফেসবুক পাতায় সতর্ক করে, অনেক ক্রেতা মালিকানা না বদলেই গাড়ি চালাচ্ছেন, ফলে কর, সারচার্জসহ আর্থিক দায় আগের মালিকের নামেই থেকে যাচ্ছে। ইত্তেফাকের খবরে বলা হয়েছে, বিশেষ ক্ষেত্রে এই অগ্রিম আয়করের দায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বিক্রেতা হলে আপনিও দায়ী

বাইক বা গাড়ি বিক্রি করে শুধু টাকা নিয়ে চলে আসবেন না। মালিকানা না বদলালে কাগজে মালিক আপনিই থাকেন। ক্রেতার সঙ্গে বসে আবেদন শেষ করুন, অন্তত বিক্রয় রসিদ আর হলফনামার কপি নিজের কাছে রাখুন।

২. কত টাকা লাগবে

বিআরটিএর সিটিজেন চার্টারে মালিকানা বদলির ফি লেখা আছে নিবন্ধন ফির তিন ভাগের এক ভাগ, এর ওপর ১৫% ভ্যাট। নিবন্ধন ফি আসে ২০২২ সালের গেজেটের তফসিল থেকে, যা বিআরটিএর ওয়েবসাইটে আছে। সেই দুই হিসাব মিলিয়ে নিচের অঙ্কগুলো দাঁড়ায়।

যাননিবন্ধন ফিবদলি ফি, ভ্যাটসহ (হিসাব)
মোটরসাইকেল, ১০০ সিসি পর্যন্ত২,০০০ টাকাপ্রায় ৭৬৭ টাকা
মোটরসাইকেল, ১০০ সিসির বেশি৩,০০০ টাকা১,১৫০ টাকা
প্রাইভেট কার বা জিপ, ৬০০ সিসি পর্যন্ত৯,০০০ টাকা৩,৪৫০ টাকা
৬০০ থেকে ১,০০০ সিসি১৮,০০০ টাকা৬,৯০০ টাকা
১,০০০ থেকে ১,৪০০ সিসি২৭,০০০ টাকা১০,৩৫০ টাকা
১,৪০০ থেকে ২,০০০ সিসি৬০,০০০ টাকা২৩,০০০ টাকা
২,০০০ সিসির বেশি কার বা জিপ১,২০,০০০ টাকা৪৬,০০০ টাকা

এর বাইরে অবস্থাভেদে আরও কিছু খরচ আছে। চার্টার অনুযায়ী নতুন ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের (DRC) ফি ৫৫৫ টাকা, ব্যাংক ঋণের দায় তুলতে হায়ার পারচেজ উইথড্র ফি ১,১৫০ টাকা, প্রতিলিপি ফি ৫৭৫ টাকা, সবই ভ্যাটসহ। হলফনামার জন্য ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প লাগে। আর গেজেট অনুযায়ী অটোরিকশার মতো তিন চাকার যানে বদলি ফি নিবন্ধন ফির অর্ধেক।

চূড়ান্ত অঙ্ক দেখুন BSP-তে

টেবিলের অঙ্ক সরকারি হার থেকে হিসাব করা। আপনার যানের বকেয়া ট্যাক্স-টোকেন, ফিটনেস বা অন্য পাওনা থাকলে মোট টাকা বাড়বে। BSP-তে লগইন করে ফি প্রদান অংশে নিবন্ধন নম্বর আর চেসিস নম্বর দিলে ঠিক কত দিতে হবে তা দেখায়।

৩. কেনাবেচার ক্ষেত্রে যে কাগজ লাগে

বিআরটিএর মালিকানা বদলির পাতা আর সিটিজেন চার্টার মিলিয়ে ক্রেতা আর বিক্রেতার কাগজ আলাদা করে দেখানো হলো। ফরমগুলো বিআরটিএর ওয়েবসাইটের ফরম অংশে পাওয়া যায়। চার্টারে এগুলোর নাম ফরম ২০ (বিক্রেতার ঘোষণাপত্র), ফরম ২১ (ক্রেতার ঘোষণাপত্র) আর ফরম ২২ (বিক্রয় রসিদ), আর মালিকানা বদলির পাতায় 'টিও' ও 'টিটিও' ফরম।

ক্রেতার কাগজ

বিক্রেতার কাগজ

চার্টারের তালিকায় ক্রেতার TIN সব ক্ষেত্রেই চাওয়া হয়েছে, কিন্তু মালিকানা বদলির পাতায় তা শুধু ভাড়ায় না চলা কার, জিপ আর মাইক্রোবাসের জন্য। মোটরসাইকেল কিনলে TIN লাগবে কি না, আপনার সার্কেল অফিসে আগে জেনে নিন।

৪. আবেদনের ধাপ

  • ১
    BSP-তে আবেদন করুনbsp.brta.gov.bd-তে অ্যাকাউন্ট খুলে মালিকানা বদলির আবেদন দিন, কাগজের স্ক্যান কপি সংযুক্ত করুন।
  • ২
    ফি জমা দিনBSP অ্যাকাউন্ট থেকে কার্ড, বিকাশ, রকেট বা নগদে, অথবা তালিকাভুক্ত ব্যাংকে ফি দিন। রসিদ রেখে দিন।
  • ৩
    ক্রেতা, বিক্রেতা আর যান নিয়ে সার্কেল অফিসে যানচার্টার অনুযায়ী যানসহ ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনকেই বিআরটিএ সার্কেল অফিসে হাজির হতে হয়। মোটরযান পরিদর্শকের সুপারিশের পর সহকারী বা উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মালিকানা বদল করেন।
  • ৪
    বায়োমেট্রিক দিনবিআরটিএ জানিয়েছে, বিক্রেতার উপস্থিতিতে হ্যান্ডহেল্ড যন্ত্রে বায়োমেট্রিক যাচাই হয়। একই সময়ে নতুন মালিক ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের জন্য নিজের বায়োমেট্রিক দিতে পারেন।
  • ৫
    নতুন কাগজ বুঝে নিনকাগজ ঠিক থাকলে বিআরটিএর ভাষ্যে একই দিনেও কাজ শেষ হতে পারে। চার্টারে সময় লেখা ১ থেকে ৩০ কর্মদিবস।

৫. মালিক মারা গেলে: ওয়ারিশ সূত্রে বদলি

বাবা বা পরিবারের কারও নামে থাকা বাইক বা গাড়ি তাঁর মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের নামে নিতে হলে কাগজের তালিকা একটু আলাদা। বিআরটিএর পাতায় বলা আছে:

  1. পূরণ ও সই করা টিও আর টিটিও ফরম
  2. আদালত বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ
  3. ফি জমার রসিদ
  4. একাধিক ওয়ারিশ থাকলে প্রথম ওয়ারিশের TIN সনদের সত্যায়িত কপি, ভাড়ায় না চলা কার, জিপ বা মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে
  5. মূল রেজিস্ট্রেশন সনদের দুই কপি বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট
  6. ছবিসহ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ওয়ারিশদের হলফনামা; একজনের নামে নিলে বাকি ওয়ারিশদের ছবিসহ আরেকটি হলফনামা
  7. নমুনা স্বাক্ষর ফরম, ৩ কপি স্ট্যাম্প সাইজের রঙিন ছবিসহ

ওয়ারিশ সনদ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিতে হয়। ভাইবোনদের মধ্যে একজনের নামে নিতে চাইলে বাকিদের সম্মতির হলফনামা আগে থেকে করিয়ে রাখুন, নইলে অফিসে ফেরত আসতে হবে।

৬. অনেকে যা জানতে চান

বাইক কিনেছি দুই বছর আগে, এখনো নাম বদলাইনি। এখন কি করা যাবে?
আবেদন এখনো করা যায়, তবে আইনের ৬০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। ৭৪ ধারায় জরিমানার বিধান আছে। দেরি না করে আবেদন করুন, আর বকেয়া ট্যাক্স-টোকেন বা ফিটনেস থাকলে সেগুলোও হালনাগাদ করুন।
বিক্রেতাকে খুঁজে পাচ্ছি না। মালিকানা বদলাব কীভাবে?
চার্টার অনুযায়ী ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনকেই হাজির হতে হয়, আর বিক্রেতার উপস্থিতিতে বায়োমেট্রিক যাচাই হয়। বিক্রেতা না থাকলে কী করা যায়, তা নিজের সার্কেল অফিসের সহকারী পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানুন।
মালিকানা বদলাতে কি গাড়ি বা বাইক অফিসে নিতে হয়?
হ্যাঁ। চার্টারে লেখা আছে, মোটরযানসহ ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সার্কেল অফিসে হাজির হতে হবে, আর মোটরযান পরিদর্শকের সুপারিশ লাগে।
ব্যাংক লোনে কেনা গাড়ি বিক্রি করা যায়?
যায়, তবে আগে ঋণ শোধ করে ব্যাংকের ছাড়পত্র নিতে হয়। চার্টার অনুযায়ী ব্যাংকের অনুরোধপত্র, লোন সমন্বয়ের বিবরণী আর হলফনামাও লাগে, সঙ্গে হায়ার পারচেজ উইথড্র ফি।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
দৈনন্দিন সেবা

অনলাইনে জিডি করার নিয়ম: মোবাইল, সিম বা কাগজ হারালে থানায় না গিয়ে যেভাবে করবেন

NID, সচল মোবাইল আর লাইভ ছবি দিয়ে নিবন্ধন, হারানো জিনিসের জিডি, কপি ডাউনলোড আর হারানো ফোনের IMEI।
দৈনন্দিন সেবা

পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: অনলাইনে আবেদন, ১,৫০০ টাকা ফি, কাগজ আর স্ট্যাটাস চেক

পাসপোর্টের মেয়াদ, ঠিকানার শর্ত, ১,৫০০ টাকার চালান, PCC S এসএমএসে স্ট্যাটাস আর সনদ তোলার নিয়ম।
দৈনন্দিন সেবা

গাড়ির ট্যাক্স টোকেন আর ফিটনেস নবায়ন: BRTA অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কাগজ আর ফি দেখার নিয়ম

ফিটনেসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চার ধাপ, প্রয়োজনীয় কাগজ, ট্যাক্স টোকেন নবায়ন আর অনলাইনে ফি দেখা।

অনেকে খোঁজেন