
সংক্ষেপে
দেনমোহর ও ভরণপোষণ মামলা করতে হয় পারিবারিক আদালতে, আর পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৫ ধারায় আরজির কোর্ট ফি মাত্র ২০০ টাকা। স্ত্রী যে এলাকায় সাধারণত থাকেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতেও মামলা করা যায়।
ডিক্রির টাকা স্বামী না দিলে আদালত ফৌজদারি পদ্ধতিতে ওয়ারেন্ট দিয়ে আদায় করতে পারে, এমনকি অনধিক ৩ মাস বা টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত কারাদণ্ড দিতে পারে। সন্তানের ভরণপোষণ আর অভিভাবকত্বের মামলাও একই আদালতে হয়।
এখতিয়ার, মামলা দায়ের, কোর্ট ফি, ডিক্রি বলবৎ আর আপিলের পুরো বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।
এই লেখায়
১. দেনমোহর আদায়ের মামলা করা যায় কোথায়
বিয়ের পাঁচ বছর পর আলাদা থাকছেন, কাবিনের দেনমোহরের এক টাকাও পাননি, সন্তানের খরচও আসে না। এর জন্য আলাদা আদালত আছে। পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ৫ ধারায় বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ আর সন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানের মামলা পারিবারিক আদালতে হয়।
৬ ধারা অনুযায়ী মামলা করা যায় সেই আদালতে, যার এলাকায় বিরোধের কারণ ঘটেছে বা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকতেন বা সর্বশেষ থাকতেন। দেনমোহর, ভরণপোষণ আর বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় এর সঙ্গে স্ত্রী যেখানে সাধারণত থাকেন, সেখানকার আদালতেও করা যায়।
ভরণপোষণের দাবিতে স্ত্রী নিজের জন্য আর সন্তানের জন্য আলাদা করে খরচ চাইতে পারেন কি না, বা দুটো এক মামলায় হবে কি না, তা আরজিতে চাওয়া প্রতিকারের ওপর নির্ভর করে। তাই আরজি লেখার আগে কোন কোন দাবি তুলবেন, পরিষ্কার করে নিন।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী আলাদা পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এলাকার সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালত পারিবারিক আদালতের কাজ করে। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে এই আদালতগুলোর নাম এখন সিভিল জজ আর সিনিয়র সিভিল জজ।
২. দেনমোহর মামলার কোর্ট ফি কত, আরজিতে কী লাগে
২৫ ধারায় পারিবারিক আদালতে যেকোনো মোকদ্দমার আরজির কোর্ট ফি ২০০ টাকা। দেনমোহরের অঙ্ক বেশি হলেও কোর্ট ফি এই ২০০ টাকাই। এর বাইরে সমন জারির খরচ আর নোটিশের ডাক খরচ দিতে হয়, আর আইনজীবী নিলে তাঁর ফি আলাদা।
আরজির সঙ্গে যা দিতে হয়
৬ ধারার ৮ উপধারা বলছে, আরজির কপি আর তালিকা না দিলে, সমনের খরচ না দিলে বা ২০০ টাকা ফি না দিলে আরজি খারিজ হবে। আরজির সময় যে দলিল দেওয়া উচিত ছিল, তা পরে আদালতের অনুমতি ছাড়া সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয় না, তাই কাবিননামা শুরুতেই দিন।
কাবিননামা হাতে না থাকলে যে নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধন হয়েছিল, তাঁর কাছ থেকে নিকাহনামার কপি তুলুন। সন্তানের ভরণপোষণ চাইলে সন্তানের জন্ম সনদ, আর স্বামীর আয়ের যেকোনো প্রমাণ, যেমন চাকরির কাগজ বা ব্যবসার তথ্য, সঙ্গে রাখলে ভরণপোষণের অঙ্ক ঠিক করতে আদালতের সুবিধা হয়।
৩. মামলা কীভাবে এগোয়
- ১সমনআরজি জমার পর আদালত সাধারণত অনধিক ৩০ দিনের মধ্যে বিবাদীর হাজিরার তারিখ দেয়।
- ২লিখিত জবাববিবাদী জবাব দেন। উপযুক্ত কারণ দেখালে জবাবের জন্য অনধিক ২১ দিনের আরেকটি তারিখ পেতে পারেন।
- ৩বিচার-পূর্ব শুনানি১১ ধারায় অনধিক ৩০ দিনের মধ্যে শুনানি হয়, আদালত আপস বা মীমাংসার চেষ্টা করে।
- ৪সাক্ষ্য ও রায়আপস না হলে বিচার্য বিষয় ঠিক করে সাক্ষ্য নেওয়া হয়, তারপর রায় ও ডিক্রি।
বিবাদী হাজির না হলে আদালত একতরফা নিষ্পত্তির দিকে যেতে পারে। একতরফা ডিক্রি হলে বিবাদী ৩০ দিনের মধ্যে যথেষ্ট কারণ দেখিয়ে তা বাতিলের আবেদন করতে পারেন।
শুনানির যেকোনো পর্যায়ে আপস হলে ১৫ ধারায় আদালত সেই আপস চুক্তির ভিত্তিতেই ডিক্রি দেয়। আর মামলার উদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকলে, যেমন স্বামী সম্পত্তি সরিয়ে ফেলছেন, ২১ ধারায় আদালত হলফনামা দেখে অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারে। এমন আশঙ্কা থাকলে আইনজীবীকে আগেই জানান।
৪. ডিক্রির টাকা না দিলে কী হয়
রায় পেলেই টাকা হাতে আসে না। ১৭ ধারা অনুযায়ী আদালতের দেওয়া সময়ে টাকা শোধ না হলে সেই সময় পার হওয়ার ১ বছরের মধ্যে ডিক্রিদারকে বাস্তবায়নের আবেদন করতে হয়। আদালত দেওয়ানি অর্থ ডিক্রির মতো, অথবা ম্যাজিস্ট্রেটের জরিমানা আদায়ের মতো করে টাকা আদায় করতে পারে।
দ্বিতীয় পথে বিচারক প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতায় ওয়ারেন্ট দিতে পারেন, আর অপরিশোধিত টাকার জন্য স্বামীকে অনধিক ৩ মাস বা টাকা শোধ হওয়া পর্যন্ত, যেটা আগে হয়, কারাদণ্ড দিতে পারেন। আদালত চাইলে কিস্তিতে টাকা দেওয়ার আদেশও দিতে পারে।
ধরুন, যশোরের নাসরিন আক্তার দেনমোহর আর নিজের ও মেয়ের ভরণপোষণের ডিক্রি পেলেন, কিন্তু স্বামী ছয় মাসেও টাকা দিলেন না। নাসরিনকে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার এক বছরের মধ্যেই বাস্তবায়নের আবেদন করতে হবে, দেরি করলে সুযোগ হারাতে পারেন।
৫. আপিল, চেয়ারম্যানের সালিশ আর অন্য পথ
- পারিবারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয় পারিবারিক আপিল আদালতে, আলাদা আদালত না থাকলে জেলা জজ আদালতে। নকল তোলার সময় বাদ দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে।
- ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল চলে না।
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ ধারায় স্ত্রী ভরণপোষণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছেও আবেদন করতে পারেন। তিনি সালিশি পরিষদ গঠন করেন, পরিষদ ভরণপোষণের অঙ্ক ঠিক করে সনদ দিতে পারে।
- কাবিননামায় দেনমোহর পরিশোধের ধরন লেখা না থাকলে অধ্যাদেশের ১০ ধারায় পুরো দেনমোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হয়।
- মামলার খরচ চালাতে না পারলে সরকারি লিগ্যাল এইডে আবেদন করতে পারেন, হেল্পলাইন ১৬৬৯৯।
৬. অনেকে যা জানতে চান
পারিবারিক আদালতে মামলা করতে কত টাকা লাগে?
দেনমোহর আদায়ের মামলা করা যায় কোথায়?
sontaner voronposhon mamla ki ek sathe kora jay?
স্বামী ডিক্রির টাকা না দিলে কী হবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।