
সংক্ষেপে
মৃত ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা তোলার নিয়ম নির্ভর করে নমিনি আছে কি না তার ওপর। ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১-এর ১০৩ ধারা অনুযায়ী আমানতকারী যাঁকে নমিনি করে গেছেন, মৃত্যুর পর ব্যাংক তাঁকেই টাকা দেয়, আর তাতে ব্যাংকের দায় শেষ হয়।
নমিনি না থাকলে, বা নমিনিও মারা গেলে, ওয়ারিশদের সাধারণত জেলা জজ আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে হয়। নমিনি টাকা পেলেও অন্য ওয়ারিশদের দাবি আইনে শেষ হয়ে যায় না, এ নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায় আপিলে ঝুলে আছে।
আমানতের টাকা পরিশোধে মনোনয়ন বা নমিনির পুরো বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।
এই লেখায়
১. মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের টাকা কে পাবে
বাবা বা স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবার প্রথমে জানতে চায়, তাঁর একাউন্টের টাকা কে তুলতে পারবে। ব্যাংকে গেলে প্রথম প্রশ্নটাই হয়, নমিনি কে। কারণ আইনে নমিনির জন্য আলাদা বিধান আছে।
ব্যাংক-কোম্পানী আইনের ১০৩ ধারা অনুযায়ী একক বা যৌথ আমানতকারী এক বা একাধিক ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারেন, যাঁকে আমানতকারী বা যৌথ আমানতকারীদের সবার মৃত্যুর পর টাকা দেওয়া যায়। যেকোনো সময় এই মনোনয়ন বাতিল করে অন্য কাউকে নমিনি করা যায়।
| অবস্থা | সাধারণত কী হয় |
|---|---|
| নমিনি আছেন, প্রাপ্তবয়স্ক | নমিনি কাগজসহ দাবি করলে ব্যাংক তাঁকে টাকা দেয়। |
| নমিনি নাবালক | আমানতকারী আগে থেকে কাউকে ঠিক করে গেলে তিনি গ্রহণ করেন। না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের কথায়, নমিনি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংক টাকা দেয় না। |
| নমিনি মারা গেছেন বা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | ব্যাংক আদালতের আদেশ অনুযায়ী ওয়ারিশদের টাকা দেয়। |
| কোনো নমিনি নেই | আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট নিয়ে ওয়ারিশরা দাবি করেন। |
২. নমিনি থাকলে টাকা তোলার নিয়ম
১০৩ ধারার ৩ উপধারা বলছে, অন্য কোনো আইন, উইল বা সম্পত্তি বণ্টনের দলিলে যা-ই থাকুক, নমিনি আমানতকারীর মৃত্যুর পর সেই আমানতের ব্যাপারে আমানতকারীর সব অধিকার পাবেন। আর ৪ উপধারায় আছে, এই ধারা মেনে ব্যাংক টাকা দিলে আমানত নিয়ে ব্যাংকের দায় শেষ।
প্রথম আলোর ২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংক নিজে নমিনি বা ওয়ারিশ খোঁজে না। নমিনি সঠিক কাগজপত্রসহ দাবি করলে ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী টাকা দেয়।
- ১মৃত্যু সনদ তুলুনইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের নিবন্ধক কার্যালয় থেকে মৃত্যু নিবন্ধন করিয়ে সনদ নিন।
- ২শাখায় লিখিত জানানযে শাখায় একাউন্ট, সেখানে মৃত্যুর খবর লিখিতভাবে দিন। কোন ফরম আর কোন কাগজ লাগবে, শাখা থেকে লিখিত তালিকা চেয়ে নিন।
- ৩নমিনির দাবি জমা দিননমিনি নিজের পরিচয়পত্র, মৃত্যু সনদ আর ব্যাংকের চাওয়া অন্য কাগজসহ দাবি করবেন।
- ৪টাকা বুঝে নিন, রসিদ রাখুনটাকা নমিনির একাউন্টে বা অন্যভাবে পরিশোধ হলে ব্যাংকের লিখিত প্রমাণ রেখে দিন।
আইনে নমিনির টাকা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে যৌথ আমানতকারীদের সবার মৃত্যুর পর। একজন জীবিত থাকলে একাউন্ট কীভাবে চলবে, তা হিসাব খোলার সময়ের শর্তের ওপর নির্ভর করে। শাখায় জেনে নিন।
৩. মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের টাকা নমিনি পাবে না: আদালতের অবস্থান
নমিনি ছোট ভাই আর স্ত্রী-সন্তান ওয়ারিশ, এমন পরিবারে প্রশ্নটা ওঠেই। প্রথম আলোর একই প্রতিবেদন অনুযায়ী হাইকোর্টের একটি রায়ে বলা হয়েছিল, নমিনি শুধু জিম্মাদার, টাকার মালিক ওয়ারিশরা। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে, আপিল বিভাগে শুনানি হয়নি, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
আইনের ভাষা আর ব্যাংকের চর্চা হলো, ব্যাংক নমিনিকে টাকা দেয়। তবে ১০৩ ধারার ৪ উপধারাতেই বলা আছে, যাঁকে টাকা দেওয়া হলো, তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কারও অধিকার বা দাবি থাকলে সেটি ক্ষুণ্ন হবে না। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত আইনজীবীর কথায়, নমিনি ওয়ারিশদের টাকা না দিলে ওয়ারিশদের আদালতে যেতে হবে।
কুষ্টিয়ার পারভীন আক্তারের স্বামীর সঞ্চয়ী হিসাবে নমিনি ছিলেন তাঁর ছোট ভাই। ব্যাংক টাকা দেবে ভাইকেই। পারভীন ও সন্তানরা ওয়ারিশ হিসেবে অংশ চাইলে আর ভাই না দিলে, সেই বিরোধ মেটানোর জায়গা পরিবার, না মিটলে আদালত।
৪. নমিনি না থাকলে: সাকসেশন সার্টিফিকেট
নমিনি না থাকলে ব্যাংক কোন কাগজ চাইবে, তা ব্যাংকের নিজস্ব নিয়মে ঠিক হয়। তবে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫-এর দশম ভাগে সাকসেশন সার্টিফিকেটের বিধান আছে, আর ৩৮১ ধারায় বলা আছে, সার্টিফিকেটধারীকে সরল বিশ্বাসে টাকা দিলে দেনাদার পুরো দায়মুক্ত। এ কারণেই ব্যাংক সাধারণত এই সনদ চায়।
- আবেদন হয় জেলা জজের কাছে, যাঁর এলাকায় মৃত ব্যক্তি সাধারণত থাকতেন।
- আবেদনে মৃত্যুর সময়, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা আর কোন পাওনা বা জামানতের জন্য সনদ চান, তা লিখতে হয়।
- আদালত নোটিশ দিয়ে শুনানি করে সনদ দেন।
- কোর্ট ফি পাওনার অঙ্কের ওপর: ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশ, ১ লাখ টাকার বেশি হলে ২ শতাংশ।
একটা সুবিধাও আইনে আছে। ৩৭৯ ধারা অনুযায়ী আবেদনকারী ওয়ারিশ হলে কোর্ট ফির টাকা মৃত ব্যক্তির জমা থেকেই ব্যাংক সরকারি কোষাগারে জমা দেবে, বিচারকের নির্দেশে। পুরো প্রক্রিয়া আর কাগজের তালিকা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে।
৫. একাউন্ট বন্ধ, লোন আর অন্য কাজ
- টাকা তোলার পর একাউন্ট বন্ধের জন্য শাখায় লিখিত আবেদন দিন। সাধারণত নমিনি বা সনদধারী ওয়ারিশই এই আবেদন করেন, শাখা থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
- মৃত ব্যক্তির নামে ব্যাংক লোন থাকলে সেটা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, ঋণের চুক্তি আর বীমার শর্তে ঠিক হয়। শাখা থেকে লিখিত হিসাব নিন।
- সঞ্চয়পত্রের নিয়ম আলাদা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, সঞ্চয়পত্রধারী মারা গেলে টাকা নমিনির বদলে উত্তরাধিকারী পাবেন।
- জমি বা অন্য সম্পত্তি নিয়ে ওয়ারিশদের বিরোধ থাকলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
মৃত ব্যক্তির এটিএম কার্ড বা আগে সই করা চেক দিয়ে টাকা তুললে পরে অন্য ওয়ারিশরা প্রশ্ন তুলতে পারেন। সব লেনদেন ব্যাংকের লিখিত প্রক্রিয়ায় করুন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
মৃত ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা তোলার নিয়ম কী?
মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের টাকা কি নমিনি পাবে না ওয়ারিশ?
mrito bektir bank account e nominee na thakle ki korbo?
নমিনি নাবালক হলে কী হবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।