
সংক্ষেপে
সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে হয় জেলা জজের কাছে আবেদন করে, যাঁর এলাকায় মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সাধারণত থাকতেন। উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫-এর ৩৭২ ধারায় আবেদনে কী কী লিখতে হবে, তা বলা আছে, আর আদালত নোটিশ দিয়ে শুনানি করে সনদ দেন।
কোর্ট-ফি আইনের প্রথম তফসিল অনুযায়ী সনদে লেখা পাওনার অঙ্ক ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা হলে কোর্ট ফি ১ শতাংশ, ১ লাখ টাকার বেশি হলে ২ শতাংশ। ওয়ারিশ আবেদন করলে এই ফি মৃত ব্যক্তির ব্যাংক বা অন্য জমা থেকেই সরকারি কোষাগারে যায়।
সাকসেশন সার্টিফিকেটের সব ধারা, ৩৭০ থেকে ৩৯০, আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।
এই লেখায়
১. সাকসেশন সার্টিফিকেট কি, কখন লাগে
মৃত ব্যক্তির ব্যাংকে টাকা আছে, নমিনি নেই। বা কোম্পানির শেয়ার, অন্যের কাছে পাওনা টাকা। এসব আদায় করতে গেলে প্রতিষ্ঠান জানতে চায়, টাকাটা কাকে দিলে তারা নিরাপদ। আদালতের দেওয়া সাকসেশন সার্টিফিকেট সেই প্রশ্নের উত্তর।
উত্তরাধিকার আইনের ৩৮১ ধারা বলছে, সনদে যে পাওনা আর জামানত লেখা আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই সনদ দেনাদারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত, আর সনদধারীকে সরল বিশ্বাসে টাকা দিলে দেনাদার পুরো দায়মুক্ত। ৩৮০ ধারায় আছে, সনদ সারা বাংলাদেশে কার্যকর।
ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা যে ওয়ারিশ সনদ দেয়, তাতে উত্তরাধিকারীদের নাম থাকে। সাকসেশন সার্টিফিকেট দেয় আদালত, নির্দিষ্ট পাওনা বা জামানত আদায়ের ক্ষমতা দিয়ে। ব্যাংক কোনটা চাইবে, শাখায় লিখিত জেনে নিন।
২. কোন আদালতে আবেদন, আবেদনে কী লিখবেন
৩৭১ ধারা অনুযায়ী আবেদন করবেন সেই জেলা জজের কাছে, যাঁর এলাকায় মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সাধারণত থাকতেন। স্থায়ী ঠিকানা না থাকলে, যে জেলায় তাঁর সম্পত্তির কোনো অংশ আছে। ৩৮৮ ধারায় সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে জেলা জজের নিচের আদালতকেও এই ক্ষমতা দিতে পারে, তাই আপনার জেলায় কোন আদালতে মামলা হয়, আদালতের সেরেস্তা বা আইনজীবীর কাছে জেনে নিন।
৩৭২ ধারা অনুযায়ী আবেদনে যা থাকবে
আবেদনে সই আর সত্যতা যাচাই হয় দেওয়ানি কার্যবিধিতে আর্জির মতো করে। জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিলে ৩৭২ ধারার ২ উপধারায় দণ্ডবিধির ১৯৮ ধারার অপরাধ ধরা হয়। মৃত্যু সনদ আর ওয়ারিশদের পরিচয়ের কাগজ সাধারণত সঙ্গে দিতে হয়, তবে আইনে কাগজের তালিকা নেই।
৩৭৪ আর ৩৮১ ধারা মিলিয়ে পড়লে সনদের কাজ হলো নির্দিষ্ট পাওনা আদায় আর জামানত লেনদেনের ক্ষমতা দেওয়া। কে কত অংশ পাবেন, সেই হিসাব ওয়ারিশদের নিজেদের উত্তরাধিকারের নিয়মে। একাধিক ওয়ারিশ থাকলে অন্যরা আপত্তি দিতে পারেন, তাই আবেদনে সবার নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে লিখুন।
৩. সাকসেশন সার্টিফিকেট কোর্ট ফি কত
| সনদে লেখা পাওনা বা জামানতের মূল্য | কোর্ট ফি |
|---|---|
| ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত | তফসিলে এই ধাপের হার লেখা নেই |
| ২০ হাজার টাকার বেশি, ১ লাখ পর্যন্ত | ১ শতাংশ |
| ১ লাখ টাকার বেশি | ২ শতাংশ |
| পরে সনদ বাড়িয়ে অন্য পাওনা যোগ করলে (মোট অঙ্ক ধরে) | ২০ হাজার থেকে ১ লাখে ১ শতাংশ, বেশি হলে ২ শতাংশ |
রাজশাহীর দিলরুবা ইয়াসমিনের বাবার একটি ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা আছে, নমিনি নেই। সনদ নিলে তফসিল অনুযায়ী কোর্ট ফি ২ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ হাজার টাকা। দিলরুবা ওয়ারিশ হিসেবে আবেদন করলে ৩৭৯ ধারা অনুযায়ী আবেদন মঞ্জুর হলে বিচারক নির্দেশ দেবেন, এই ৮ হাজার টাকা ব্যাংক বাবার হিসাব থেকেই সরকারি কোষাগারে নগদ জমা দেবে।
পাওনার মধ্যে সুদও ধরা হয়, যতটা হিসাব করা যায়, তফসিলের নোটে তা আছে। আইনজীবীর ফি, নোটিশ ছাপানো বা অন্য খরচ এর বাইরে, সেগুলোর অঙ্ক আইনে নেই।
৪. আবেদনের পর: নোটিশ, শুনানি আর বন্ড
- ১শুনানির দিন ঠিক হয়৩৭৩ ধারা অনুযায়ী আবেদন গ্রহণযোগ্য মনে হলে জেলা জজ শুনানির দিন ঠিক করেন, যাঁদের বিশেষ নোটিশ দেওয়া দরকার তাঁদের নোটিশ দেন আর আদালত ভবনে নোটিশ টাঙান।
- ২সংক্ষিপ্ত শুনানিনির্ধারিত দিনে আদালত সংক্ষিপ্তভাবে সনদের অধিকার কার, তা ঠিক করেন।
- ৩বন্ড বা জামানত৩৭৫ ধারায় আদালত চাইলে সনদ দেওয়ার আগে জামিনদারসহ বন্ড চাইতে পারেন, যাতে পরে অন্য কেউ দাবি তুললে হিসাব দিতে হয়।
- ৪সনদ হাতে পাওয়া৩৭৪ ধারা অনুযায়ী সনদে পাওনা আর জামানতগুলো লেখা থাকে, আর সুদ বা লভ্যাংশ তোলা, হস্তান্তর বা দুটোরই ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।
শুনানিতে প্রশ্ন জটিল হলে আদালত তবু যার পক্ষে অধিকার বেশি মনে হয়, তাকে সনদ দিতে পারেন। কত দিনে সনদ মেলে, তার নির্দিষ্ট সময় আইনে নেই, আদালতের মামলার চাপ আর আপত্তির ওপর নির্ভর করে।
৫. আপত্তি, বাতিল আর আপিল
আবেদনের আগে আরও তিনটি বিধান জেনে রাখুন। ৩৭০ ধারা অনুযায়ী যে পাওনার অধিকার প্রমাণে প্রোবেট বা লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন লাগে, তার জন্য সাকসেশন সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। ৩৭৬ ধারায় সনদধারীর আবেদনে পরে নতুন কোনো পাওনা বা জামানত সনদে যোগ করা যায়, যাকে সনদ বাড়ানো বলে। আর ৩৮৫ ধারা বলছে, একই সম্পত্তির জন্য আগে সনদ, প্রোবেট বা লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেওয়া হয়ে থাকলে পরের সনদ অবৈধ।
- ৩৮৩ ধারায় সনদ বাতিলের কারণ আছে: কার্যধারায় গুরুতর ত্রুটি, মিথ্যা বা তথ্য গোপন করে সনদ নেওয়া, ভুল তথ্য, সনদ অকার্যকর হয়ে যাওয়া, বা আদালতের অন্য রায়।
- ৩৮৪ ধারায় জেলা জজের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা যায়, সময় দেওয়ানি কার্যবিধির আপিলের মেয়াদ অনুযায়ী।
- নিচের আদালত সনদ দিলে আপিল যায় জেলা জজের কাছে, ৩৮৮ ধারায় তা বলা আছে।
- সম্পত্তি ভাগ নিয়ে বিরোধ থাকলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন। অসচ্ছল হলে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তার জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
সাকসেশন সার্টিফিকেট কিভাবে নিতে হয়?
সাকসেশন সার্টিফিকেট কোর্ট ফি কত?
succession certificate er court fee ke dibe?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।