
সংক্ষেপে
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের ১৫ ধারায় সংশোধনের নিয়ম আছে, কিন্তু একটি নিবন্ধন কতবার সংশোধন করা যাবে, সেই সংখ্যা সেখানে বেঁধে দেওয়া হয়নি। প্রতিবার নতুন আবেদন, সরকারি ফি আর প্রমাণ লাগে। জন্ম তারিখ সংশোধনের ফি ১০০ টাকা, বাকি তথ্যে ৫০ টাকা।
সমস্যা হয় অন্য জায়গায়। সনদ পাওয়ার ৯০ দিন পার হলে সিদ্ধান্ত চলে যায় ইউএনও, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা বা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে। আর জন্ম তারিখ বদলের আবেদন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ২০২৩ সালের নির্দেশনায় অনেক কড়া করা হয়েছে।
সংশোধনের অনলাইন আবেদন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সরকারি পোর্টাল থেকে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পোর্টাল ২৫ অক্টোবর সকাল ৬টা পর্যন্ত বন্ধ।
এই লেখায়
১. জন্ম নিবন্ধন কতবার সংশোধন করা যায়: আইনে যা লেখা
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের সংশোধিত পাঠ আছে। তার ১৫ ধারা বলছে, নিবন্ধন বহিতে বা সনদে কোনো ভুল তথ্য থাকলে নির্ধারিত ফিসহ সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যাবে। কতবার আবেদন করা যাবে, এমন কোনো সংখ্যা ধারাটিতে নেই।
তার মানে এই নয় যে যতবার খুশি আবেদন করলেই তথ্য বদলে যাবে। প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই হয়। নিবন্ধক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবেদন যথাযথ মনে না করলে নামঞ্জুর করে লিখিতভাবে জানিয়ে দেন। একই দাবিতে একই কাগজ দিয়ে বারবার আবেদন করলে ফল বদলানোর কারণ থাকে না, শুধু ফি আর সময় যায়।
অনেকে এনআইডির নিয়মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। নির্বাচন কমিশনের NID পোর্টালে লেখা আছে, এক তথ্য একবারই সংশোধন করা যায়। জন্ম নিবন্ধনের আইনে এমন লাইন নেই। তবে বাস্তবে তিনটি জায়গায় আবেদন বেশি আটকায়:
- জন্ম তারিখ বা জন্মসাল বদলের আবেদন, বিশেষ করে পরে বানানো এনআইডি, পাসপোর্ট বা পরীক্ষার নিবন্ধনের তারিখের সঙ্গে মেলাতে চাইলে।
- সনদ পাওয়ার ৯০ দিন পরের আবেদন, যেগুলো নিবন্ধক নিজে মঞ্জুর করতে পারেন না।
- প্রমাণ দুর্বল বা অমিল থাকলে, যেমন যে নাম চাইছেন তা কোনো সনদে নেই।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের প্রশ্নোত্তর পাতায় আরেকটি তথ্য আছে, যা অনেকে জানেন না। আগের সনদে শুধু বাংলা থাকলে এখন ইংরেজি যোগ করাও সফটওয়্যারে সংশোধন হিসেবে গণ্য হয়, আর তা বিধিমালার ১৫ বিধি মেনে করতে হয়। তাই ইংরেজি সংস্করণ নেওয়াটাও একটি সংশোধন আবেদন।
২. সংশোধন আবেদন কার কাছে যায়, কত দিনে সিদ্ধান্ত
আইনের ১৫ ধারায় সময়সীমা দুই ভাগে ভাগ করা। হিসাবটা শুরু হয় সনদ দেওয়ার তারিখ থেকে, আবেদনের দিন থেকে নয়।
| কখন আবেদন | কে সিদ্ধান্ত দেন | আইনে সময় |
|---|---|---|
| সনদ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে | সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক নিজে | আবেদন পাওয়ার ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে |
| ৯০ দিন পর, ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধন | উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) | নিবন্ধক ১০ কর্মদিবসে পাঠাবেন, সিদ্ধান্ত ১৫ কর্মদিবসে |
| ৯০ দিন পর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট | জেলা প্রশাসক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা | নিবন্ধক ১০ কর্মদিবসে পাঠাবেন, সিদ্ধান্ত ১৫ কর্মদিবসে |
| ৯০ দিন পর, বিদেশের মিশনের নিবন্ধন | রেজিস্ট্রার জেনারেল | নিবন্ধক ১০ কর্মদিবসে পাঠাবেন, সিদ্ধান্ত ১৫ কর্মদিবসে |
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত আসার পর নিবন্ধক ৭ কর্মদিবসের মধ্যে আবেদনকারীকে জানাবেন। মঞ্জুর হলে সংশোধিত নতুন সনদ দেওয়া হয় আর আগের সনদ ফেরত নেওয়া হয়। মাঠে সময় অনেক সময় এর চেয়ে বেশি লাগে, বিশেষ করে সার্ভার বন্ধ থাকলে। যেমন এ সপ্তাহে BDRIS রক্ষণাবেক্ষণে আছে, ২৫ অক্টোবর সকাল ৬টার আগে নতুন কোনো আবেদন জমা হবে না।
৩. সংশোধন ফি কত: প্রতিটি আবেদনে আলাদা
দ্বিতীয়বার আবেদন করলে ফি আবার দিতে হয়, কারণ ফি ধরা হয় প্রতিটি আবেদনের জন্য। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ফি তালিকা এরকম:
| কাজ | সরকারি ফি |
|---|---|
| জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদন | ১০০ টাকা |
| নাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানাসহ অন্য তথ্য সংশোধন | ৫০ টাকা |
| সংশোধনের পর বাংলা ও ইংরেজি সনদের কপি | বিনা ফিতে |
| সনদের নকল (দুই ভাষায়) | ৫০ টাকা |
আইনে আরও বলা আছে, জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে সনদ সংশোধন করালে কোনো ফি লাগে না। নবজাতকের সনদ হাতে পেয়েই বানান মিলিয়ে নিলে তাই খরচও বাঁচে, ঝামেলাও।
৪. দ্বিতীয়বার সংশোধনের আবেদন করার আগে
ধরুন, রাশেদের সনদে মায়ের নামের বানান একবার ঠিক হয়েছে, কিন্তু পরে দেখা গেল ইংরেজি বানানে আরেকটি ভুল। এমন ক্ষেত্রে আবার আবেদন করা যায়। তবে আগে এই কাজগুলো সেরে নিন।
- ১আগের আবেদনের ফল মিলিয়ে নিনসংশোধনের পর সনদে আসলে কী বদলেছে, তা দেখে নিন। নম্বর আর জন্ম তারিখ দিয়ে everify.bdris.gov.bd-তে যাচাই করলে বর্তমান তথ্য দেখা যায়। আগের আবেদন এখনো ঝুলে থাকলে নতুন আবেদন না করে নিবন্ধকের কার্যালয়ে খোঁজ নিন।
- ২সব ভুল একসঙ্গে ধরুননাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা আর ইংরেজি বানান পাশাপাশি রেখে দেখুন। যতগুলো ভুল আছে, এক আবেদনে তুলুন। প্রতিবার আলাদা আবেদন মানে আলাদা ফি আর আলাদা অপেক্ষা।
- ৩শক্ত প্রমাণ জোগাড় করুনযে তথ্য চাইছেন তা কোন সনদে আছে, সেটা ঠিক করুন। এসএসসি সনদ, বাবা-মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন বা এনআইডি সাধারণত সবচেয়ে কাজে দেয়। কাগজ স্ক্যান করুন মূল কপি থেকে।
- ৪কারণ পরিষ্কার লিখুনআগে একবার সংশোধন হয়ে থাকলে কেন আবার দরকার, তা সংক্ষেপে লিখুন। যেমন আগের আবেদনে শুধু বাংলা নাম ঠিক হয়েছিল, ইংরেজি বানান বাকি ছিল।
- ৫প্রিন্ট নিয়ে কার্যালয়ে যানঅনলাইনে জমার পর আবেদনের প্রিন্ট আর মূল কাগজ নিয়ে যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে সনদ নিয়েছিলেন, সেখানে যান।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ২০২৩ সালে জানিয়েছে, সনদ নেওয়ার পর পরীক্ষার নিবন্ধন, এনআইডি বা পাসপোর্টে অন্য জন্ম তারিখ ব্যবহার করে পরে সেটার সঙ্গে মেলাতে সনদ সংশোধনের আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
৫. আবেদন নামঞ্জুর হলে: ৩০ দিনের মধ্যে আপিল
আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধকের আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা যায়। কার কাছে যাবেন, তা নির্ভর করে কোন কার্যালয় সিদ্ধান্ত দিয়েছে তার ওপর।
- ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আদেশের বিরুদ্ধে: ইউএনও
- পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা ক্যান্টনমেন্টের আদেশের বিরুদ্ধে: জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
- ইউএনওর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে: জেলা প্রশাসক; জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে: রেজিস্ট্রার জেনারেল
- রেজিস্ট্রার জেনারেলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে: সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ
নতুন আবেদন আর আপিল এক জিনিস নয়। নামঞ্জুরের কারণ যদি প্রমাণের ঘাটতি হয়, তাহলে ঘাটতি পূরণ করে নতুন আবেদনই সহজ পথ। আর যদি মনে করেন প্রমাণ ঠিক থাকার পরও ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে, তখন আপিল।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জন্ম নিবন্ধন কতবার সংশোধন করা যায় ২০২৬ সালে?
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদন কতবার করা যায়, একই ঘরে আবার করা যাবে?
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন হয়েছে কিনা কিভাবে বুঝবো?
এনআইডির মতো কি জন্ম নিবন্ধনেও এক তথ্য একবার নিয়ম আছে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।