ভূমি ও নামজারি

ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ: বাটোয়ারা বা বণ্টননামা দলিল, খরচ আর পরে নামজারি

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ: বাটোয়ারা বা বণ্টননামা দলিল, খরচ আর পরে নামজারি

সংক্ষেপে

বাবা-মা বা অন্য কারও মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিলে সেই ভাগের দলিলকে বণ্টননামা বা বাটোয়ারা দলিল বলে। নিবন্ধন আইনের ১৭(১)(চ) ধারায় উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী করা স্থাবর সম্পত্তি ভাগের দলিল বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রি করতে হয়।

নিবন্ধন ফি নির্ধারিত আছে আইনের ৭৮খ ধারায়, সম্পত্তির মূল্য অনুযায়ী ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। স্ট্যাম্প আইনের তফসিলে বণ্টননামার স্ট্যাম্প শুল্ক ১০০ টাকা। রেজিস্ট্রির পর প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের অংশের নামজারি করলে তবেই আলাদা খতিয়ান আর খাজনার হোল্ডিং হয়।

ই-নামজারি পোর্টাল

বণ্টননামা রেজিস্ট্রির পর নিজের অংশের নামজারির আবেদন এখানেই করবেন।

ই-নামজারি খুলুন
এই লেখায়
  1. বণ্টননামা কেন, আর কখন বাধ্যতামূলক
  2. খরচ: নিবন্ধন ফি মূল্য অনুযায়ী, স্ট্যাম্প ১০০ টাকা
  3. বণ্টননামা করার ধাপ
  4. যে কাগজ গুছিয়ে রাখবেন
  5. বণ্টননামা ছাড়া বিক্রি, আর সবাই রাজি না হলে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. বণ্টননামা কেন, আর কখন বাধ্যতামূলক

উত্তরাধিকারে পাওয়া জমি শুরুতে সব ওয়ারিশের যৌথ থাকে। কে কোন দাগের কতটুকু নেবেন, তা মুখে ঠিক করে চললে পরে বিক্রি, ঋণ বা নামজারির সময় ঝামেলা হয়। ওয়ারিশরা একমত হয়ে ভাগ লিখিত করলে সেটি বণ্টননামা, আর নিবন্ধন আইনে এমন দলিল রেজিস্ট্রি না করলে চলে না।

বণ্টননামা রেজিস্ট্রি হলে প্রত্যেকের অংশ আলাদা দাগ ও পরিমাণে কাগজে ওঠে। এরপর সেই দলিল দেখিয়ে প্রত্যেকে নিজের নামে নামজারি করতে পারেন, আর ভবিষ্যতে কেউ নিজের অংশ বিক্রি করলে ক্রেতাও জানেন ঠিক কোন জমি কিনছেন।

ভাগ ঠিক হয় ব্যক্তিগত আইনে

কে কত অংশ পাবেন, তা নির্ভর করে ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার আইনের ওপর, দলিলের ওপর নয়। ভাগের হিসাব নিয়ে সন্দেহ থাকলে দলিল করার আগে আইনজীবীর কাছ থেকে লিখিতভাবে হিসাবটা নিন।

২. খরচ: নিবন্ধন ফি মূল্য অনুযায়ী, স্ট্যাম্প ১০০ টাকা

সম্পত্তির মূল্যনিবন্ধন ফি (ধারা ৭৮খ)
৩ লাখ টাকা পর্যন্ত৫০০ টাকা
৩ লাখের বেশি, ১০ লাখ পর্যন্ত৭০০ টাকা
১০ লাখের বেশি, ৩০ লাখ পর্যন্ত১,২০০ টাকা
৩০ লাখের বেশি, ৫০ লাখ পর্যন্ত১,৮০০ টাকা
৫০ লাখ টাকার বেশি২,০০০ টাকা

স্ট্যাম্প আইনের প্রথম তফসিলের ৪৪ নম্বর ক্রমিকে বণ্টননামার স্ট্যাম্প শুল্ক ১০০ টাকা, বিডিলজে রাখা ২০২২ সালের হালনাগাদ তফসিল অনুযায়ী। আদালতের চূড়ান্ত আদেশ বা সালিশের রায়ে ভাগ হয়ে পরে সেই অনুযায়ী বণ্টননামা করলে তাতেও শুল্ক ১০০ টাকার বেশি হবে না বলে তফসিলে বলা আছে।

এর বাইরে ই-ফি, নকলের খরচ বা দলিল লেখকের পারিশ্রমিকের মতো খরচ যোগ হয়। মোট অঙ্ক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের টানানো ফি তালিকা বা দলিল লেখকের লিখিত হিসাব থেকে মিলিয়ে নিন, আর প্রতিটি সরকারি ফির রসিদ রাখুন।

৩. বণ্টননামা করার ধাপ

  • ১
    ওয়ারিশ সনদ নিনমৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ কারা, তার সনদ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে নিন। মৃত্যু সনদও সঙ্গে রাখুন।
  • ২
    জমির কাগজ মিলিয়ে নিনমৃত ব্যক্তির নামে সর্বশেষ খতিয়ান, বায়া দলিল আর হালনাগাদ খাজনার দাখিলা সংগ্রহ করুন। খতিয়ান আর দলিলে দাগ, পরিমাণ ও মালিকের নাম মেলে কি না দেখুন।
  • ৩
    ভাগে একমত হনসব ওয়ারিশ বসে কোন দাগ বা অংশ কে পাবেন, ঠিক করুন। মাপজোখ করিয়ে প্রত্যেকের অংশের চৌহদ্দি লিখে নিন, যাতে দলিলের তফসিলে স্পষ্ট থাকে।
  • ৪
    দলিলের খসড়া আর সইদলিল লেখক বা আইনজীবী দিয়ে খসড়া করান। প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম, অংশ আর তফসিল আলাদা করে লেখা থাকবে। যাঁদের মধ্যে ভাগ হচ্ছে, তাঁদের সবার সই লাগবে, তাই কাউকে বাদ দিয়ে দলিল করবেন না।
  • ৫
    সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিসব পক্ষ উপস্থিত হয়ে দলিল সম্পাদন করুন, ফি ও স্ট্যাম্প শুল্ক দিন। কোন অফিসে জমা দেবেন, জমির অবস্থান দেখে দলিল লেখক বা অফিস থেকে জেনে নিন।
  • ৬
    প্রত্যেকে নিজের নামজারিরেজিস্ট্রির পর প্রত্যেক ওয়ারিশ mutation.land.gov.bd-তে নিজের অংশের নামজারির আবেদন করবেন, ওয়ারিশ সনদ আর বণ্টননামার কপি যুক্ত করে।
নামজারির আগে মৃত ব্যক্তির খাজনা

উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারির আবেদনে ই-নামজারি পোর্টাল আগে মৃত ব্যক্তির হোল্ডিংয়ের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে বলে। বকেয়া থাকলে রেজিস্ট্রির আগেই মিটিয়ে ফেলুন।

৪. যে কাগজ গুছিয়ে রাখবেন

বণ্টননামার জন্য

কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে তিনি নিজে উপস্থিত হতে না পারলে প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজ করতে হয়। কোন ধরনের ক্ষমতাপত্র লাগবে আর তা কীভাবে সত্যায়িত হবে, তা আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে আগে জেনে নিন।

৫. বণ্টননামা ছাড়া বিক্রি, আর সবাই রাজি না হলে

নিবন্ধন আইনের ৫২ক ধারায় বিক্রেতা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে বিক্রির দলিলে তাঁর বা তাঁর পূর্বসূরির নামের সর্বশেষ খতিয়ান দিলেই চলে। তাই আইনে বণ্টননামা ছাড়াও নিজের অংশ বিক্রির পথ বন্ধ নয়। কিন্তু কোন দাগের কোন অংশ বিক্রেতার, তা স্পষ্ট না থাকলে ক্রেতার নামজারি আর দখল নিয়ে পরে বিরোধ হয়। এ কারণে অনেকে আগে বণ্টননামা করে নেন।

একজন ওয়ারিশও রাজি না হলে আপসে বণ্টননামা হয় না, কারণ সব পক্ষের সই লাগে। তখন দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারার মামলা করার পথ থাকে, যার জন্য বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ সহ অন্য আইন প্রযোজ্য। এই মামলা সময়সাপেক্ষ, তাই শুরু করার আগে আইনজীবীর পরামর্শ নিন। রেকর্ড বা নামজারি নিয়ে প্রশ্নে উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে যান।

৬. অনেকে যা জানতে চান

বাটোয়ারা দলিল করতে কত টাকা লাগে?
নিবন্ধন ফি সম্পত্তির মূল্য অনুযায়ী ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা, আর তফসিল অনুযায়ী স্ট্যাম্প শুল্ক ১০০ টাকা। এর সঙ্গে ই-ফি, নকলের খরচ আর দলিল লেখকের পারিশ্রমিক যোগ হয়।
বণ্টননামা কি রেজিস্ট্রি না করে শুধু স্ট্যাম্পে লিখে রাখা যায়?
উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে করা ভাগের দলিল নিবন্ধন আইনের ১৭(১)(চ) ধারায় বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রি করতে হয়। রেজিস্ট্রি ছাড়া কাগজ নামজারি বা পরের বিক্রিতে ভরসার কাগজ নয়।
বণ্টননামার পর কি আলাদা নামজারি করতে হয়?
হ্যাঁ। প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের অংশের জন্য ই-নামজারিতে আবেদন করলে তবেই নিজের নামে খতিয়ান আর খাজনার হোল্ডিং হয়।
একজন ভাই সই দিতে রাজি নন, কী করব?
সব পক্ষের সই ছাড়া আপসের বণ্টননামা হয় না। আদালতে বাটোয়ারার মামলা করা যায়, তবে তার আগে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন