ভূমি ও নামজারি

অর্পিত সম্পত্তি কি: ক তফসিল আর খ তফসিলের পার্থক্য, জমি তালিকায় আছে কি না দেখবেন যেভাবে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
অর্পিত সম্পত্তি কি: ক তফসিল আর খ তফসিলের পার্থক্য, জমি তালিকায় আছে কি না দেখবেন যেভাবে

সংক্ষেপে

অর্পিত সম্পত্তি হলো আগের শত্রু সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি আইনে তত্ত্বাবধায়কের তালিকাভুক্ত সম্পত্তি। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ অনুযায়ী এর মধ্যে যেসব সম্পত্তি সরকারের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেগুলো মৌজাভিত্তিক ‘ক’ তফসিলে গেজেটে প্রকাশ হয়েছে।

২০১৩ সালের দ্বিতীয় সংশোধনে ‘খ’ তফসিল এমনভাবে বাতিল হয়েছে যেন সেই সম্পত্তি কখনো অর্পিত তালিকায় ছিলই না। আর আইনের ৯(৬) ধারা বলছে, গেজেটে প্রকাশিত ‘ক’ তফসিলে না থাকা কোনো সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না।

আইনের পূর্ণ পাঠ পড়ুন

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ ও তার সংশোধনী বাংলাদেশ আইন সংকলনে আছে।

আইন দেখুন
এই লেখায়
  1. অর্পিত সম্পত্তি কি
  2. ক তফসিল আর খ তফসিল কী, পার্থক্য কোথায়
  3. খ তফসিল বাতিল হওয়ায় জমির মালিকের কী লাভ হলো
  4. আপনার জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় আছে কি না দেখবেন যেভাবে
  5. ক তফসিলের জমি নিয়ে যা জানা জরুরি
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. অর্পিত সম্পত্তি কি

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ পাস হয়েছিল তালিকাভুক্ত কিছু অর্পিত সম্পত্তি বাংলাদেশি মূল মালিক, তাঁর বাংলাদেশি উত্তরাধিকারী বা তাঁদের বাংলাদেশি স্বার্থাধিকারীর কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য। আইনের ভাষায় ‘প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তি’ হলো অর্পিত সম্পত্তি আইনে তত্ত্বাবধায়কের তালিকাভুক্ত সেই সম্পত্তি, যা এই আইন চালুর ঠিক আগে সরকারের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

দেবোত্তর সম্পত্তি, মঠ, শ্মশান, সমাধিক্ষেত্র বা ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের এমন সম্পত্তিকে আইনে ‘প্রত্যর্পণযোগ্য জনহিতকর সম্পত্তি’ বলা হয়েছে। এগুলোর জন্য ট্রাইব্যুনালে নয়, জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করার বিধান আছে।

আইনটি বারবার বদলেছে

২০০১ সালের পর এই আইন কয়েক দফা সংশোধন হয়েছে। নিচের তথ্য বাংলাদেশ আইন সংকলনের হালনাগাদ পাঠ থেকে নেওয়া। নির্দিষ্ট জমির ক্ষেত্রে সর্বশেষ অবস্থা আইনজীবীর কাছে মিলিয়ে নিন।

২. ক তফসিল আর খ তফসিল কী, পার্থক্য কোথায়

বিষয়ক তফসিলখ তফসিল
কী ছিলসরকারের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রত্যর্পণযোগ্য অর্পিত সম্পত্তিআলাদা তালিকায় থাকা অর্পিত সম্পত্তি, যা পরে বাতিল হয়েছে
এখনকার অবস্থামৌজাভিত্তিক গেজেট তালিকা বহাল২০১৩ সালের দ্বিতীয় সংশোধনে পুরো তফসিল বাতিল
আইনগত প্রভাবতালিকায় থাকলে প্রত্যর্পণ বা অবমুক্তি ছাড়া বিক্রি, দান, বন্ধক বাতিল ও ফলবিহীনধরা হবে কখনো অর্পিত তালিকায় ছিল না
মামলাট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনালেখ তফসিলের সব মামলা আপনা থেকে শেষ (abate)

৯ ধারা অনুযায়ী ‘ক’ তফসিলের তালিকায় প্রতিটি সম্পত্তির প্রকৃতি, জমি হলে সাবেক ও হাল খতিয়ান নম্বর, সাবেক ও হাল দাগ নম্বর আর পরিমাণ লেখা থাকার কথা। তালিকার কপি প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নির্ধারিত মূল্যে পাওয়ার বিধানও আইনে আছে।

৩. খ তফসিল বাতিল হওয়ায় জমির মালিকের কী লাভ হলো

আইনের ২৮ক ধারা ২০১৩ সালের দ্বিতীয় সংশোধনীতে যোগ হয়েছে। এই ধারা যা বলছে:

  1. সংশোধনী কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘খ’ তফসিল বাতিল, আর তা এমনভাবে যেন ওই সম্পত্তি কখনো অর্পিত তালিকাভুক্ত হয়নি।
  2. খ তফসিলের সম্পত্তি নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আগে দেওয়া রায় বা ডিক্রি বাতিল ও অকার্যকর, আর চলমান মামলা আনুষ্ঠানিক আদেশ ছাড়াই শেষ।
  3. জেলা, বিভাগীয় বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে খ তফসিল নিয়ে যেকোনো আবেদন আপনা থেকে বাতিল।
  4. খ তফসিল বাতিল হলেও ওই সম্পত্তিতে সরকার বা কোনো ব্যক্তির স্বত্ব নিয়ে প্রচলিত আইনে প্রতিকার চাইতে বাধা নেই।

অর্থাৎ শুধু খ তফসিলে থাকার কারণে কোনো জমি এখন আর অর্পিত সম্পত্তি নয়। তবে মালিকানা নিয়ে অন্য কোনো বিরোধ থাকলে তা সাধারণ দেওয়ানি আইনে মীমাংসা হবে। খ তফসিল থেকে মুক্ত জমির নামজারি বা খাজনা নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আলাদা নির্দেশনা আছে, তাই ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে আপনার কাগজ দেখিয়ে জেনে নিন।

একটি উদাহরণ দেখা যাক। কোনো পরিবারের জমি বহু বছর ধরে খ তফসিলে দেখানো ছিল, তাই তাঁরা নামজারি বা বিক্রি করতে পারছিলেন না। ২০১৩ সালের সংশোধনের পর আইনের চোখে সেই জমি আর অর্পিত সম্পত্তি নয়। এখন তাঁদের কাজ হলো নিজেদের দলিল, খতিয়ান আর উত্তরাধিকারের কাগজ দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে নামজারি ও খাজনা হালনাগাদ করা।

৪. আপনার জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় আছে কি না দেখবেন যেভাবে

  • ১
    খতিয়ান আর দাগ গুছিয়ে নিনজমির মৌজা, সাবেক ও হাল খতিয়ান নম্বর আর সাবেক ও হাল দাগ নম্বর লিখে নিন। গেজেটের তালিকা এই তথ্য ধরেই সাজানো।
  • ২
    জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিনআইন অনুযায়ী ‘ক’ তফসিলের তালিকার কপি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট শাখায় মৌজার তালিকা দেখতে চান।
  • ৩
    উপজেলা ভূমি অফিসেও জিজ্ঞেস করুনসহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে মৌজার অর্পিত সম্পত্তির রেজিস্টার থাকে কি না জেনে নিন। নামজারির সময়ও এখান থেকেই আপত্তি আসে।
  • ৪
    ফলাফল লিখিত রাখুনতালিকায় না থাকলে সেটা লিখিত বা প্রত্যয়ন আকারে চাওয়া যায় কি না অফিসে জিজ্ঞেস করুন। জমি কেনার আগে ক্রেতার জন্য এটা কাজে লাগে।

জমি কিনতে গেলে বিক্রেতা অনেক সময় বলেন, ‘এটা খ তফসিলে ছিল, এখন সমস্যা নেই।’ কথাটা আইনের দিক থেকে ঠিক হতে পারে, তবে ক তফসিলেও যে নেই, সেটা নিজে দেখে নিন। একই মৌজায় দুই তালিকাতেই জমি থাকার ঘটনা থাকতে পারে, আর দাগ নম্বর জরিপভেদে বদলায়।

অনলাইনের পিডিএফ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না

ইন্টারনেটে অনেক ‘ক ও খ তফসিলের তালিকা pdf’ ঘোরে, যার উৎস বা হালনাগাদ অবস্থা জানা নেই। গেজেটের সংশোধিত তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মিলিয়ে নিন।

৫. ক তফসিলের জমি নিয়ে যা জানা জরুরি

  • ৮ ধারা অনুযায়ী প্রত্যর্পণ বা অবমুক্তির আগে কেউ এই সম্পত্তি বিক্রি, দান, অন্যভাবে হস্তান্তর বা বন্ধক রাখতে পারবেন না। করলে তা বাতিল ও ফলবিহীন।
  • ১০ ধারায় মালিকের জন্য তালিকা প্রকাশের ৩০০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সময় ছিল, পরে সংশোধন করে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
  • ভুলভাবে তালিকায় ঢোকা সম্পত্তি অবমুক্তির জন্যও একই সময়সীমায় ট্রাইব্যুনালে আবেদনের বিধান ছিল।
  • সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন কোন পথ খোলা, তা মামলার ধরন আর কাগজের ওপর নির্ভর করে। এখানে আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া এগোবেন না।

‘ক’ তফসিলের জমি কম দামে কেনার প্রস্তাব এলে সাবধান থাকুন। আইন অনুযায়ী এমন বিক্রি টেকে না, টাকাও ফেরত পাওয়া কঠিন। জমি কেনার আগে খতিয়ান, নামজারি আর অর্পিত তালিকা তিনটিই মিলিয়ে নিন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

অর্পিত সম্পত্তি কি?
অর্পিত সম্পত্তি আইনে তত্ত্বাবধায়কের তালিকাভুক্ত সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি বলা হয়। প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ অনুযায়ী এর মধ্যে সরকারের দখলে থাকা সম্পত্তি মৌজাভিত্তিক ‘ক’ তফসিলে গেজেটে প্রকাশ হয়েছে।
খ তফসিলের জমি কি এখন বিক্রি করা যায়?
২৮ক ধারায় খ তফসিল বাতিল হয়েছে, তাই শুধু এই তালিকায় থাকার কারণে জমিটি আর অর্পিত সম্পত্তি নয়। তবে বিক্রির আগে নামজারি ও খতিয়ান হালনাগাদ আছে কি না ভূমি অফিসে মিলিয়ে নিন।
অর্পিত সম্পত্তি ক ও খ সংশোধিত তালিকা pdf কোথায় পাব?
আইন অনুযায়ী ‘ক’ তফসিলের তালিকার কপি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যায়। ইন্টারনেটের পিডিএফের ওপর ভরসা না করে সেখান থেকে মিলিয়ে নিন।
ক তফসিলে না থাকলে কি জমি অর্পিত সম্পত্তি হতে পারে?
আইনের ৯(৬) ধারা অনুযায়ী গেজেটে প্রকাশিত ক তফসিলে না থাকা কোনো সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না। কেউ উল্টো দাবি করলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন