
সংক্ষেপে
১৪৫ ধারা মামলা হলো ফৌজদারি কার্যবিধির সেই পথ, যেখানে জমি, পুকুর বা বাড়ির দখল নিয়ে বিরোধে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুই পক্ষকে ডেকে ঠিক করেন, আদেশের দিন আসলে কে দখলে ছিলেন। তিনি কার মালিকানা ঠিক, সেই বিচার করেন না।
আদেশের আগের দুই মাসের মধ্যে কাউকে জোর করে উচ্ছেদ করা হলে তাঁকেই দখলদার ধরা যায়। জমিতে ১৪৪ ধারার আদেশ আলাদা জিনিস, সেটি সর্বোচ্চ দুই মাস বহাল থাকে। মালিকানার চূড়ান্ত ফয়সালা হয় দেওয়ানি আদালতে, তাই আইনজীবী বা এসি ল্যান্ডের পরামর্শ নিন।
১৪৪, ১৪৫ ও ১৪৬ ধারার মূল পাঠ আইন মন্ত্রণালয়ের বিডিল'জ সাইটে আছে।
এই লেখায়
১. ১৪৫ ধারা কি: আইনে যা লেখা
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর দ্বাদশ অধ্যায়ের নাম 'স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ'। এর ১৪৫ ধারা বলছে, পুলিশের প্রতিবেদন বা অন্য তথ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারের বিশেষ ক্ষমতা পাওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন যে কোনো জমি, পানি বা তার সীমানা নিয়ে এমন বিরোধ আছে যাতে শান্তিভঙ্গ হতে পারে, তাহলে তিনি লিখিত আদেশ দেবেন।
সেই আদেশে দুই পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত বক্তব্য দিতে বলা হয়, বিষয় একটাই: বিরোধের জমিতে প্রকৃত দখল কার। আদেশের একটি কপি বিরোধের জমির কাছে কোনো দৃশ্যমান জায়গায় লাগিয়েও দেওয়া হয়।
আইনে 'জমি বা পানি' বলতে ভবন, বাজার, মাছের জলাশয়, ফসল বা জমির অন্য উৎপাদন, আর ওই সম্পত্তির খাজনা বা মুনাফাও ধরা হয়েছে। তাই পুকুরের মাছ বা খেতের ধান নিয়েও ১৪৫ ধারার মামলা হতে পারে। ফসল দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো হলে মামলা চলাকালেই ম্যাজিস্ট্রেট তা হেফাজতে রাখা বা বিক্রির আদেশ দিতে পারেন।
২. ১৪৫ ধারা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কী দেখেন
ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কারও মালিকানার দাবির গুণাগুণ বিচার করবেন না। তিনি লিখিত বক্তব্য পড়বেন, দুই পক্ষের কথা ও সাক্ষ্য শুনবেন, প্রয়োজনে আরও প্রমাণ নেবেন, তারপর ঠিক করবেন আদেশের তারিখে কে দখলে ছিলেন।
আদেশের তারিখের আগের দুই মাসের মধ্যে কাউকে জোর করে ও অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকেই দখলদার হিসেবে গণ্য করতে পারেন। তাই উচ্ছেদ হলে দেরি না করে থানায় আর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাওয়া জরুরি।
দখল প্রমাণে সাধারণত যা কাজে আসে
জরুরি মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্তের আগেই বিরোধের জমি ক্রোক করতে পারেন। আবার কেউ যদি দেখাতে পারেন যে আসলে কোনো বিরোধই নেই, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশটি বাতিল করবেন।
৩. ১৪৫ ধারার মামলার রায় হলে কী হয়, মেয়াদ কতদিন
ম্যাজিস্ট্রেট যাঁকে দখলদার হিসেবে পান, তাঁর পক্ষে আদেশ দেন যে আইনানুগ পথে উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দখলে থাকবেন, আর সেই দখলে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না। জোর করে উচ্ছেদ হওয়া পক্ষকে দখল ফিরিয়েও দেওয়া যায়।
আইনে এই আদেশের নির্দিষ্ট মেয়াদ লেখা নেই। আদেশ বহাল থাকে যতক্ষণ না দেওয়ানি আদালত বা আইনের অন্য পথে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে। অর্থাৎ ১৪৫ ধারার রায় মালিকানা ঠিক করে না, শুধু শান্তি রক্ষার জন্য দখল ঠিক করে।
১৪৬ ধারা বলছে, কে দখলে ছিলেন তা ম্যাজিস্ট্রেট ঠিক করতে না পারলে জমি ক্রোক করে রাখতে পারেন, যতদিন না উপযুক্ত আদালত অধিকার ঠিক করে দেয়। দরকার হলে তিনি রিসিভারও নিয়োগ দিতে পারেন, আর ফসল নষ্ট হওয়ার মতো হলে তা বিক্রি বা হেফাজতের আদেশ দিতে পারেন।
৪. জমিতে ১৪৪ ধারা কি, কত দিন থাকে
অনেকে জমির বিরোধে ১৪৪ ধারার কথা শোনেন। এটি ফৌজদারি কার্যবিধির একাদশ অধ্যায়ের জরুরি আদেশ। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত প্রতিকারের প্রয়োজন মনে করলে কাউকে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে বা নিজের দখলের সম্পত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে লিখিত আদেশ দিতে পারেন।
| বিষয় | ১৪৪ ধারা | ১৪৫ ধারা |
|---|---|---|
| কাজ | জরুরি নিষেধাজ্ঞা, যেমন জমিতে কাজ বা যাওয়া বন্ধ | দখল কার, তা ঠিক করা |
| মেয়াদ | সর্বোচ্চ দুই মাস, বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার গেজেটে বাড়াতে পারে | আইনানুগ উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত দখল বহাল |
| এক পক্ষের অনুপস্থিতিতে আদেশ | জরুরি হলে দেওয়া যায় | দুই পক্ষকে ডেকে শুনানি হয় |
১৪৪ ধারার ৭ উপধারা অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকায় এই ধারা প্রযোজ্য নয়। আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ আবেদন করলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে শুনানির সুযোগ দেবেন, আর আবেদন নাকচ করলে কারণ লিখে রাখবেন।
৫. ১৪৫ ধারা মামলা করবেন যেভাবে
- ১আগে কাগজ গুছিয়ে নিনখতিয়ান, দাখিলা, দলিল আর দখলের ছবি এক ফাইলে রাখুন। অনলাইনে খতিয়ানের কপি তুলে নিতে পারেন।
- ২থানায় জানানজমিতে হামলা বা জোর করে দখলের চেষ্টা হলে থানায় জিডি বা অভিযোগ করুন। ১৪৫ ধারার আদেশ প্রায়ই পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হয়।
- ৩আইনজীবীর মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যানজেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিরোধের তথ্য দিয়ে আবেদন করুন। আবেদনের ধরন আর খরচ আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।
- ৪লিখিত বক্তব্য আর সাক্ষ্য দিনআদালত দিন ঠিক করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখলের লিখিত বক্তব্য জমা দিন, আর সাক্ষীদের হাজির করান।
- ৫মালিকানার জন্য দেওয়ানি পথ ভাবুনদখলের আদেশ পেলেও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক বা অন্য মামলার বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
১৪৫ ধারা দখল দেখে, আর সাক্ষ্যে ধরা পড়ে কে আসলে জমিতে ছিলেন। মিথ্যা দাবিতে মামলা করলে তা টেকে না, উল্টো আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঝুঁকি থাকে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
১৪৫ ধারা মামলা কি?
১৪৫ ধারার মেয়াদ কতদিন?
জমিতে ১৪৪ ধারা কত দিন থাকে?
১৪৫ ধারায় মিথ্যা মামলা হলে কী করবেন?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।