ভূমি ও নামজারি

১৪৫ ধারা মামলা কী: জমির দখল নিয়ে বিরোধে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ, ২ মাসের হিসাব, আর জমিতে ১৪৪ ধারার তফাত

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
১৪৫ ধারা মামলা কী: জমির দখল নিয়ে বিরোধে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ, ২ মাসের হিসাব, আর জমিতে ১৪৪ ধারার তফাত

সংক্ষেপে

১৪৫ ধারা মামলা হলো ফৌজদারি কার্যবিধির সেই পথ, যেখানে জমি, পুকুর বা বাড়ির দখল নিয়ে বিরোধে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুই পক্ষকে ডেকে ঠিক করেন, আদেশের দিন আসলে কে দখলে ছিলেন। তিনি কার মালিকানা ঠিক, সেই বিচার করেন না।

আদেশের আগের দুই মাসের মধ্যে কাউকে জোর করে উচ্ছেদ করা হলে তাঁকেই দখলদার ধরা যায়। জমিতে ১৪৪ ধারার আদেশ আলাদা জিনিস, সেটি সর্বোচ্চ দুই মাস বহাল থাকে। মালিকানার চূড়ান্ত ফয়সালা হয় দেওয়ানি আদালতে, তাই আইনজীবী বা এসি ল্যান্ডের পরামর্শ নিন।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ পড়ুন

১৪৪, ১৪৫ ও ১৪৬ ধারার মূল পাঠ আইন মন্ত্রণালয়ের বিডিল'জ সাইটে আছে।

আইন পড়ুন
এই লেখায়
  1. ১৪৫ ধারা কি: আইনে যা লেখা
  2. ১৪৫ ধারা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কী দেখেন
  3. ১৪৫ ধারার মামলার রায় হলে কী হয়, মেয়াদ কতদিন
  4. জমিতে ১৪৪ ধারা কি, কত দিন থাকে
  5. ১৪৫ ধারা মামলা করবেন যেভাবে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. ১৪৫ ধারা কি: আইনে যা লেখা

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর দ্বাদশ অধ্যায়ের নাম 'স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ'। এর ১৪৫ ধারা বলছে, পুলিশের প্রতিবেদন বা অন্য তথ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারের বিশেষ ক্ষমতা পাওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন যে কোনো জমি, পানি বা তার সীমানা নিয়ে এমন বিরোধ আছে যাতে শান্তিভঙ্গ হতে পারে, তাহলে তিনি লিখিত আদেশ দেবেন।

সেই আদেশে দুই পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত বক্তব্য দিতে বলা হয়, বিষয় একটাই: বিরোধের জমিতে প্রকৃত দখল কার। আদেশের একটি কপি বিরোধের জমির কাছে কোনো দৃশ্যমান জায়গায় লাগিয়েও দেওয়া হয়।

আইনে 'জমি বা পানি' বলতে ভবন, বাজার, মাছের জলাশয়, ফসল বা জমির অন্য উৎপাদন, আর ওই সম্পত্তির খাজনা বা মুনাফাও ধরা হয়েছে। তাই পুকুরের মাছ বা খেতের ধান নিয়েও ১৪৫ ধারার মামলা হতে পারে। ফসল দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো হলে মামলা চলাকালেই ম্যাজিস্ট্রেট তা হেফাজতে রাখা বা বিক্রির আদেশ দিতে পারেন।

২. ১৪৫ ধারা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কী দেখেন

ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কারও মালিকানার দাবির গুণাগুণ বিচার করবেন না। তিনি লিখিত বক্তব্য পড়বেন, দুই পক্ষের কথা ও সাক্ষ্য শুনবেন, প্রয়োজনে আরও প্রমাণ নেবেন, তারপর ঠিক করবেন আদেশের তারিখে কে দখলে ছিলেন।

দুই মাসের নিয়ম

আদেশের তারিখের আগের দুই মাসের মধ্যে কাউকে জোর করে ও অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকেই দখলদার হিসেবে গণ্য করতে পারেন। তাই উচ্ছেদ হলে দেরি না করে থানায় আর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাওয়া জরুরি।

দখল প্রমাণে সাধারণত যা কাজে আসে

জরুরি মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্তের আগেই বিরোধের জমি ক্রোক করতে পারেন। আবার কেউ যদি দেখাতে পারেন যে আসলে কোনো বিরোধই নেই, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশটি বাতিল করবেন।

৩. ১৪৫ ধারার মামলার রায় হলে কী হয়, মেয়াদ কতদিন

ম্যাজিস্ট্রেট যাঁকে দখলদার হিসেবে পান, তাঁর পক্ষে আদেশ দেন যে আইনানুগ পথে উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দখলে থাকবেন, আর সেই দখলে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না। জোর করে উচ্ছেদ হওয়া পক্ষকে দখল ফিরিয়েও দেওয়া যায়।

আইনে এই আদেশের নির্দিষ্ট মেয়াদ লেখা নেই। আদেশ বহাল থাকে যতক্ষণ না দেওয়ানি আদালত বা আইনের অন্য পথে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে। অর্থাৎ ১৪৫ ধারার রায় মালিকানা ঠিক করে না, শুধু শান্তি রক্ষার জন্য দখল ঠিক করে।

১৪৬ ধারা বলছে, কে দখলে ছিলেন তা ম্যাজিস্ট্রেট ঠিক করতে না পারলে জমি ক্রোক করে রাখতে পারেন, যতদিন না উপযুক্ত আদালত অধিকার ঠিক করে দেয়। দরকার হলে তিনি রিসিভারও নিয়োগ দিতে পারেন, আর ফসল নষ্ট হওয়ার মতো হলে তা বিক্রি বা হেফাজতের আদেশ দিতে পারেন।

৪. জমিতে ১৪৪ ধারা কি, কত দিন থাকে

অনেকে জমির বিরোধে ১৪৪ ধারার কথা শোনেন। এটি ফৌজদারি কার্যবিধির একাদশ অধ্যায়ের জরুরি আদেশ। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত প্রতিকারের প্রয়োজন মনে করলে কাউকে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে বা নিজের দখলের সম্পত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে লিখিত আদেশ দিতে পারেন।

বিষয়১৪৪ ধারা১৪৫ ধারা
কাজজরুরি নিষেধাজ্ঞা, যেমন জমিতে কাজ বা যাওয়া বন্ধদখল কার, তা ঠিক করা
মেয়াদসর্বোচ্চ দুই মাস, বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার গেজেটে বাড়াতে পারেআইনানুগ উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত দখল বহাল
এক পক্ষের অনুপস্থিতিতে আদেশজরুরি হলে দেওয়া যায়দুই পক্ষকে ডেকে শুনানি হয়

১৪৪ ধারার ৭ উপধারা অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকায় এই ধারা প্রযোজ্য নয়। আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ আবেদন করলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে শুনানির সুযোগ দেবেন, আর আবেদন নাকচ করলে কারণ লিখে রাখবেন।

৫. ১৪৫ ধারা মামলা করবেন যেভাবে

  • ১
    আগে কাগজ গুছিয়ে নিনখতিয়ান, দাখিলা, দলিল আর দখলের ছবি এক ফাইলে রাখুন। অনলাইনে খতিয়ানের কপি তুলে নিতে পারেন।
  • ২
    থানায় জানানজমিতে হামলা বা জোর করে দখলের চেষ্টা হলে থানায় জিডি বা অভিযোগ করুন। ১৪৫ ধারার আদেশ প্রায়ই পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হয়।
  • ৩
    আইনজীবীর মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যানজেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিরোধের তথ্য দিয়ে আবেদন করুন। আবেদনের ধরন আর খরচ আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।
  • ৪
    লিখিত বক্তব্য আর সাক্ষ্য দিনআদালত দিন ঠিক করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখলের লিখিত বক্তব্য জমা দিন, আর সাক্ষীদের হাজির করান।
  • ৫
    মালিকানার জন্য দেওয়ানি পথ ভাবুনদখলের আদেশ পেলেও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক বা অন্য মামলার বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
মিথ্যা দখলের দাবি করবেন না

১৪৫ ধারা দখল দেখে, আর সাক্ষ্যে ধরা পড়ে কে আসলে জমিতে ছিলেন। মিথ্যা দাবিতে মামলা করলে তা টেকে না, উল্টো আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঝুঁকি থাকে।

৬. অনেকে যা জানতে চান

১৪৫ ধারা মামলা কি?
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় জমি, পানি বা ভবনের দখল নিয়ে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট দুই পক্ষকে ডেকে ঠিক করেন কে দখলে ছিলেন। এটি মালিকানার বিচার নয়, দখল ঠিক করার প্রক্রিয়া।
১৪৫ ধারার মেয়াদ কতদিন?
আইনে নির্দিষ্ট মেয়াদ লেখা নেই। দখলের আদেশ বহাল থাকে যতক্ষণ না আইনানুগ পথে, যেমন দেওয়ানি আদালতের রায়ে, অন্যভাবে ঠিক হয়।
জমিতে ১৪৪ ধারা কত দিন থাকে?
১৪৪ ধারার আদেশ সাধারণত আদেশের দিন থেকে দুই মাসের বেশি বহাল থাকে না। জীবন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে ভিন্ন নির্দেশ দিতে পারে, আর মেট্রোপলিটন এলাকায় এই ধারা প্রযোজ্য নয়।
১৪৫ ধারায় মিথ্যা মামলা হলে কী করবেন?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের দখলের লিখিত বক্তব্য, খতিয়ান, দাখিলা আর সাক্ষী দিন। আইনের ৫ উপধারা অনুযায়ী আসলে কোনো বিরোধ নেই দেখাতে পারলে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশটি বাতিল করবেন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন