ভূমি ও নামজারি

কট কবলা আর খাই খালাসি বন্ধক: আইনে মেয়াদ ৭ বছরের বেশি নয়, শেষে জমি ফেরত না দিলে যা করবেন

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
কট কবলা আর খাই খালাসি বন্ধক: আইনে মেয়াদ ৭ বছরের বেশি নয়, শেষে জমি ফেরত না দিলে যা করবেন

সংক্ষেপে

গ্রামে অনেকে টাকা নিয়ে জমি অন্যকে চাষ করতে দেন, শর্ত থাকে টাকা ফেরত দিলে জমি ফেরত। এটাই খাই খালাসি বা ভোগদখলি বন্ধক। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৫ ধারা অনুযায়ী রায়ত শুধু সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক দিতে পারেন, আর তার মেয়াদ কোনো চুক্তিতেই ৭ বছরের বেশি নয়। বন্ধক রেজিস্ট্রি করতে হবে, না করলে তা বাতিল।

৯৫ক ধারা বলছে, ফেরত কেনার চুক্তিসহ পুরোদস্তুর বিক্রি, যাকে কট কবলা বলা হয়, অথবা টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দখল ও ফসল ভোগের যেকোনো হস্তান্তর, দলিলে যা-ই লেখা থাকুক, ৭ বছরের সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক বলে গণ্য। মেয়াদ শেষে জমি ফেরত না দিলে মালিক সরকার-ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।

দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলুন

পুরোনো কট কবলা বা বন্ধকী দলিলের নকল লাগলে অনলাইনে আবেদন করুন।

নিবন্ধন অধিদপ্তর
এই লেখায়
  1. খাই খালাসি বন্ধক কী, কট কবলা দলিল কি
  2. আইনের শর্ত: ৯৫ ধারায় যা না মানলে বন্ধক বাতিল
  3. মেয়াদের আগে জমি খালাস: কত টাকা ফেরত দেবেন
  4. মেয়াদ শেষে জমি ফেরত না দিলে প্রতিকার
  5. অনেকে যা জানতে চান

১. খাই খালাসি বন্ধক কী, কট কবলা দলিল কি

খাই খালাসি বন্ধকে জমির মালিক টাকা নেন, আর টাকা দেওয়া ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় জমি দখলে রেখে ফসল বা আয় ভোগ করেন। সময় শেষে জমি মালিকের কাছে ফেরত যায়। কট কবলায় কাগজে লেখা থাকে পুরোপুরি বিক্রি, সঙ্গে একটা চুক্তি থাকে যে টাকা ফেরত দিলে জমি আবার মালিকের নামে লিখে দেওয়া হবে।

১৯৭২ সালে যোগ হওয়া ৯৫ক ধারা এই দুই রকম লেনদেনকে একই নিয়মে বেঁধেছে। দলিলের শিরোনাম ‘সাফ কবলা’ হোক বা ‘কট কবলা’, যদি ফেরত কেনার চুক্তি থাকে, অথবা টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দখল ও ভোগের অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে আইনের চোখে সেটা সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক, মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭ বছর।

ব্যাংকে জমি বন্ধক এর আওতায় নয়

৯৫ ধারা শুধু ভোগদখলি বা খাই খালাসি বন্ধক নিয়ে। দখল না দিয়ে ব্যাংকে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার শর্ত আলাদা চুক্তি ও আইনে চলে, সেই নিয়ম ব্যাংক থেকে জেনে নিন।

২. আইনের শর্ত: ৯৫ ধারায় যা না মানলে বন্ধক বাতিল

শর্ত৯৫ ও ৯৫ক ধারায় যা আছে
বন্ধকের ধরনরায়ত শুধু সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক দিতে পারেন, অন্য কোনো ধরনের ভোগদখলি বন্ধক নয়
সর্বোচ্চ মেয়াদলিখিত বা অলিখিত কোনো চুক্তিতেই ৭ বছরের বেশি নয়
রেজিস্ট্রেশনরেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক
শর্ত না মানলেশর্ত পূরণ না হলে বা রেজিস্ট্রি না হলে বন্ধক বাতিল
কট কবলা বা মেয়াদি দখল৭ বছরের সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক বলে গণ্য, দলিলে যা-ই লেখা থাকুক

সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক আইনের ৯০ ধারায় রায়তের জোত হস্তান্তরের ওপর যে সীমাবদ্ধতা আছে, সেগুলোর অধীনেও থাকে। তাই সাদা কাগজে বা শুধু স্ট্যাম্পে লেখা ‘জমি বন্ধক চুক্তিনামা’ দিয়ে কাজ সারলে সেটা আইনের চোখে টেকে না। দুই পক্ষের জন্যই রেজিস্ট্রি দলিল নিরাপদ।

একটা উদাহরণ ধরুন। রহিম ২০২০ সালে ৫ লাখ টাকা নিয়ে করিমকে তাঁর দুই বিঘা জমি চাষ করতে দিলেন, দলিলে লেখা হলো ১২ বছর। আইনের হিসাবে মেয়াদ ৭ বছরের বেশি নয়, তাই ২০২৭ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলে জমি রহিমের কাছে ফেরার কথা। দলিলটি যদি রেজিস্ট্রিই না হয়ে থাকে, তাহলে বন্ধকটিই বাতিল, আর টাকা নিয়ে বিরোধ মেটাতে হবে আলাদাভাবে।

৩. মেয়াদের আগে জমি খালাস: কত টাকা ফেরত দেবেন

৯৫ ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যেকোনো সময় বন্ধক খালাস করা যায়। তখন ফেরত দিতে হয় মোট নেওয়া টাকার সেই অনুপাত, মোট মেয়াদের তুলনায় বাকি মেয়াদ যে অনুপাতে।

  • ১
    মোট টাকা আর মোট মেয়াদ লিখুনধরুন ৭ বছরের জন্য বন্ধক দিয়ে আপনি ৭ লাখ টাকা নিয়েছিলেন।
  • ২
    বাকি মেয়াদ বের করুন৩ বছর পার হয়েছে, বাকি ৪ বছর।
  • ৩
    অনুপাতে হিসাব৭ লাখ × ৪/৭ = ৪ লাখ টাকা। এই উদাহরণে ৪ লাখ টাকা দিয়ে জমি খালাস করা যাবে।
  • ৪
    লিখিত প্রমাণ রাখুনটাকা ব্যাংকের মাধ্যমে দিন বা সাক্ষীসহ লিখিত রসিদ নিন, আর জমির দখল বুঝে নেওয়ার দিন লিখে রাখুন।

মেয়াদ পুরো ৭ বছর পার হলে আইনের হিসাবে আর টাকা ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন নেই, জমি ফেরত পাওয়ার কথা। দলিলে ১০ বা ১৫ বছর লেখা থাকলেও আইনে সর্বোচ্চ মেয়াদ ৭ বছর।

খালাসের আগে দুই পক্ষ মিলে হিসাবটা লিখে নিন, কারণ বিরোধ সাধারণত তারিখ নিয়েই হয়: দখল কবে দেওয়া হয়েছিল আর কবে থেকে বাকি মেয়াদ গোনা হবে। দলিলের তারিখ আর দখল হস্তান্তরের তারিখ আলাদা হলে সাক্ষী রাখুন।

৪. মেয়াদ শেষে জমি ফেরত না দিলে প্রতিকার

অনেক সময় বন্ধকগ্রহীতা টাকা নিতে রাজি হন না বা মেয়াদ শেষেও জমি ছাড়েন না। এর প্রতিকার ৯৫ ধারার চতুর্থ ও পঞ্চম উপধারায় দেওয়া আছে।

আবেদনের আগে বন্ধকগ্রহীতাকে লিখিতভাবে জানিয়ে রাখুন যে মেয়াদ শেষ, জমি ফেরত চান। এই চিঠির কপি পরে কাজে লাগে।

  1. বন্ধকগ্রহীতা খালাসে বাধা দিলে বা মেয়াদ শেষে জমি ফেরত দিতে অস্বীকার করলে বন্ধকদাতা মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।
  2. আগেভাগে খালাসের ক্ষেত্রে আবেদনের সঙ্গে অনুপাতে হিসাব করা টাকা জমা দিতে হয়।
  3. কর্মকর্তা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে জমির দখল আর জমিসংক্রান্ত সব কাগজ ফেরত দিতে আদেশ দেবেন।
  4. নির্ধারিত তারিখে দখল না ছাড়লে আবেদনের ভিত্তিতে বন্ধকগ্রহীতাকে উচ্ছেদ করে মালিককে দখল দেওয়া যায়, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে।
এখন কোন অফিসে যাবেন

আইনে মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকার-ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কথা বলা আছে। আপনার এলাকায় এখন কোন কর্মকর্তা এই আবেদন নেন, তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে জেনে নিন। বিরোধ জটিল হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আবেদনের সঙ্গে যা রাখবেন

৫. অনেকে যা জানতে চান

কট কবলা দলিল কি বৈধ?
আইন কট কবলাকে বিক্রি হিসেবে নয়, ৭ বছরের সম্পূর্ণ খাই খালাসি বন্ধক হিসেবে ধরে (৯৫ক ধারা)। অর্থাৎ মেয়াদ শেষে জমি মূল মালিকের কাছে ফেরার কথা।
খাই খালাসি বন্ধক কত বছরের জন্য দেওয়া যায়?
রায়তি জমিতে সর্বোচ্চ ৭ বছর। চুক্তিতে বেশি লেখা থাকলেও ৯৫ ধারায় মেয়াদ ৭ বছরের বেশি হতে পারে না।
রেজিস্ট্রি ছাড়া স্ট্যাম্পে লেখা বন্ধক চুক্তির কী হবে?
৯৫ ধারা অনুযায়ী খাই খালাসি বন্ধক রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রি না হলে বন্ধক বাতিল। দেওয়া টাকা নিয়ে বিরোধ হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
বন্ধকী দলিল বাতিল করার নিয়ম কী?
খাই খালাসিতে মেয়াদ শেষ হলে বা অনুপাতে টাকা দিয়ে আগে খালাস করলে জমি ফেরত পাওয়ার কথা। বন্ধকগ্রহীতা না মানলে ৯৫ ধারার চতুর্থ উপধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করুন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন