ভূমি ও নামজারি

সিকস্তি পয়স্তি জমি: নদীতে ভাঙা জমি ৩০ বছরের মধ্যে জাগলে কীভাবে ফেরত পাবেন

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
সিকস্তি পয়স্তি জমি: নদীতে ভাঙা জমি ৩০ বছরের মধ্যে জাগলে কীভাবে ফেরত পাবেন

সংক্ষেপে

নদীভাঙনে জমি চলে গেলে মালিকানা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৮৬ ধারা অনুযায়ী জমি একই জায়গায় ৩০ বছরের মধ্যে আবার জেগে উঠলে আগের মালিক বা তাঁর ওয়ারিশের স্বত্ব বহাল থাকে। তবে জেগে ওঠা জমির দখল প্রথমে নেন কালেক্টর, জরিপ করে তারপর মালিককে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বরাদ্দের সময় একটা সীমা আছে: মালিকের হাতে আগে থেকে থাকা জমিসহ মোট ৬০ প্রমিত বিঘা পর্যন্ত। বাড়তি অংশ সরকারের হয়ে যায়। আর জমি ভাঙার সময়ই খাজনা কমানোর আবেদন করে ক্ষতির কথা রেকর্ডে তুলে রাখা জরুরি, কারণ পরে সেটাই স্বত্বের প্রমাণ।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর

দিয়ারা জরিপ কী আর কোন মৌজায় জরিপ চলছে, তার তথ্য অধিদপ্তরের সাইটে পাবেন।

সাইট খুলুন
এই লেখায়
  1. সিকস্তি আর পয়স্তি জমি কি
  2. জমি নদীতে গেলে প্রথমে যা করবেন
  3. পয়স্তি হলে জমি ফেরতের ধাপ
  4. কোন ক্ষেত্রে জমি ফেরত মেলে না
  5. দাবি করার সময় যে ভুলগুলো এড়াবেন
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. সিকস্তি আর পয়স্তি জমি কি

নদী বা সাগরের ভাঙনে জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়াকে লোকমুখে সিকস্তি বা শিকস্তি বলে, আইনের ইংরেজি ভাষায় diluvion। আর পানি সরে সেই জমি আবার জেগে ওঠাকে বলে পয়স্তি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিকস্তি পয়স্তির কারণে সীমানা আর স্বত্ব বদলালে নদী ও সাগরতীরের এলাকায় নতুন জরিপ করা হয়, যার নাম দিয়ারা জরিপ। সেই জরিপে নতুন নকশা আর রেকর্ড তৈরি হয়।

আইনে দুটি ঘটনা আলাদা করে দেখা হয়। নিজের জমিই ভেঙে আবার একই জায়গায় জেগে উঠল, নাকি নদী সরে গিয়ে পাশে নতুন জমি তৈরি হলো। প্রথমটির নিয়ম ৮৬ ধারায়, দ্বিতীয়টির ৮৭ ধারায়। দুটোর ফল একেবারে আলাদা। ৮৬ ধারার এখনকার রূপটি এসেছে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব (সংশোধন) আইন, ১৯৯৪ থেকে, তাই পুরোনো বই বা লোকমুখের কথায় অন্য মেয়াদ শুনলে আইনের এখনকার পাঠ মিলিয়ে নিন।

২. জমি নদীতে গেলে প্রথমে যা করবেন

৮৬ ধারার প্রথম উপধারা বলছে, জমি বা তার অংশ ভাঙনে হারালে মালিক নির্ধারিত ফরমে রাজস্ব কর্মকর্তাকে আবেদন বা জানালে খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর ন্যায্য পরিমাণে কমানো হবে। আর ভাঙনের এই ঘটনা নিয়ম অনুযায়ী রেকর্ড করা হবে, যা জমি আবার জাগলে স্বত্বের প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে।

  • ১
    ভাঙনের পরপরই জানানকোন দাগের কতটুকু জমি গেছে, তা লিখে ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিসে খাজনা কমানোর আবেদন করুন। কোন ফরমে দিতে হবে, অফিস থেকে জেনে নিন।
  • ২
    রিসিভ কপি রাখুনআবেদনের প্রাপ্তিস্বীকার আর পরে যে আদেশ পাবেন, দুটোই যত্ন করে রাখুন। ৩০ বছর পর্যন্ত এগুলো কাজে লাগতে পারে, তাই ওয়ারিশদেরও জানিয়ে রাখুন।
  • ৩
    পুরোনো কাগজ এক ফাইলে রাখুনদলিল, খতিয়ান, শেষ দাখিলা আর মৌজা ম্যাপের কপি একসঙ্গে রাখুন। ম্যাপে দাগের অবস্থান থাকলে পরে একই জায়গা কি না প্রমাণ সহজ হয়।
অনলাইনে কপি তুলে রাখুন

নদীভাঙন এলাকায় ঘরবাড়ির সঙ্গে কাগজও হারায়। ভাঙনের ঝুঁকি থাকলে এখনই খতিয়ান আর মৌজা ম্যাপের অনলাইন কপি নামিয়ে ফোনে বা ইমেইলে রেখে দিন।

৩. পয়স্তি হলে জমি ফেরতের ধাপ

জমি একই জায়গায় ৩০ বছরের মধ্যে জেগে উঠলে ৮৬ ধারার বাকি উপধারাগুলো কাজে আসে। ধাপগুলো আইনে এভাবে সাজানো:

  1. জেগে ওঠা জমির তাৎক্ষণিক দখল প্রথমে নেন কালেক্টর। নিজে থেকে, অথবা মালিক, তাঁর ওয়ারিশ বা অন্য কারও লিখিত জানানোর পর।
  2. দখল নিয়ে কালেক্টর বা রাজস্ব কর্মকর্তা গণবিজ্ঞপ্তি দেন, জমি জরিপ করান আর নকশা তৈরি করেন।
  3. জরিপ ও নকশা শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে কালেক্টর আগের মালিক বা ওয়ারিশকে জমি বরাদ্দ দেন।
  4. বরাদ্দের পরিমাণ এমন হবে যাতে মালিকের হাতে আগে থেকে থাকা জমিসহ মোট ৬০ প্রমিত বিঘা ছাড়ায় না। বাড়তি জমি সরকারের হয়।
  5. বরাদ্দ পাওয়া জমিতে সেলামি লাগে না, তবে রাজস্ব কর্মকর্তা যে ন্যায্য খাজনা ও ভূমি উন্নয়ন কর ঠিক করেন, তা দিতে হয়।

একটা উদাহরণ দিই। করিম মিয়ার বাবার নামে খতিয়ানে ৫ বিঘা জমি ছিল, ২০০৪ সালে পুরোটা নদীতে যায়। বাবা তখন ভূমি অফিসে জানিয়ে খাজনা কমানোর আদেশ নিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে ওই জায়গায় চর জাগল। ২২ বছর হয়েছে, ৩০ পেরোয়নি। করিম মিয়া আর তাঁর ভাইবোনেরা ওয়ারিশ সনদ, পুরোনো খতিয়ান আর সেই আদেশের কপি নিয়ে লিখিতভাবে জানালে জরিপের পর তাঁদের দাবি বিবেচনায় আসবে। তাঁদের হাতে আগে থেকে থাকা জমিসহ মোট ৬০ প্রমিত বিঘার সীমা পার না হলে বরাদ্দে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

একটা দিক খেয়াল রাখুন। প্রথম গণবিজ্ঞপ্তির দিন থেকে ১২ মাস এই জমি নিয়ে কোনো আদালতে মামলা বা অন্য আইনি কার্যক্রম চলে না, ৮৬ক ধারায় তা বলা আছে। কালেক্টর যাতে কাজটা শেষ করতে পারেন, সেজন্য এই সময়। তাই বিজ্ঞপ্তি হলে আপনার কাগজ নিয়ে সময়মতো দাবি জানান।

৪. কোন ক্ষেত্রে জমি ফেরত মেলে না

অবস্থাআইনে কী হয়
একই জায়গায় ৩০ বছরের মধ্যে জেগেছেআগের মালিক বা ওয়ারিশের স্বত্ব বহাল, বরাদ্দ ৬০ প্রমিত বিঘা পর্যন্ত
৩০ বছর পার হওয়ার পর জেগেছে৮৬ ধারার এই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয়
সরকারি উন্নয়নকাজের কৃত্রিম বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জেগেছে৮৬ ধারা প্রযোজ্য নয় (উপধারা ৭)
নদী বা সাগর সরে গিয়ে পাশের জমির সঙ্গে নতুন জমি যুক্ত হয়েছে৮৭ ধারা অনুযায়ী পাশের জোতের বাড়তি অংশ ধরা হয় না, সম্পূর্ণ সরকারের হয়

শেষ সারিটি নিয়ে ভুল ধারণা সবচেয়ে বেশি। নদীর পাড়ে আপনার জমি আছে, নদী সরে গিয়ে সামনে নতুন চর পড়ল। অনেকে ধরে নেন চরটা তাঁদের। ৮৭ ধারা বলছে, এভাবে যুক্ত হওয়া জমি পাশের জোতের বৃদ্ধি হিসেবে গণ্য হবে না, তা সরকারের হাতে যাবে।

৫. দাবি করার সময় যে ভুলগুলো এড়াবেন

  • ভাঙনের সময় কিছু না জানিয়ে চুপ থাকা। পরে প্রমাণের ভার বাড়ে।
  • দালালের কথায় টাকা দেওয়া। বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেন কালেক্টর, আইনে সেলামি নেই।
  • জমি জাগার পর নিজেরা দখলে নামা। আইনে প্রথম দখল কালেক্টরের, ১২ মাস মামলাও চলে না।
  • ওয়ারিশদের মধ্যে আলাদা আলাদা দাবি। একসঙ্গে ওয়ারিশ সনদ আর কাগজ দিয়ে দাবি করলে কাজ সহজ হয়।

দিয়ারা জরিপ চললে জরিপের সময় নিজের কাগজ দেখাতে ভুলবেন না, কারণ নতুন রেকর্ড সেখান থেকেই তৈরি হয়। বিরোধ দেখা দিলে উপজেলা ভূমি অফিস, অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

পয়স্তি জমি কি?
নদী বা সাগরে ভেঙে যাওয়া জমি পানি সরে আবার জেগে উঠলে তাকে পয়স্তি জমি বলে। একই জায়গায় ৩০ বছরের মধ্যে জাগলে আগের মালিকের স্বত্ব বহাল থাকে।
নদীতে ভেঙে যাওয়া জমি কত বছরের মধ্যে জাগলে ফেরত পাওয়া যায়?
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৮৬ ধারা অনুযায়ী ৩০ বছরের মধ্যে, আর জমিটি একই জায়গায় জাগতে হবে।
চরের নতুন জমি কি পাশের জমির মালিক পান?
না। ৮৭ ধারা অনুযায়ী নদী বা সাগর সরে গিয়ে যুক্ত হওয়া জমি পাশের জোতের বৃদ্ধি হিসেবে ধরা হয় না, তা সরকারের হয়।
জমি নদীতে গেলে কি খাজনা দিতে হবে?
নির্ধারিত ফরমে রাজস্ব কর্মকর্তাকে জানালে ভাঙা অংশের খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর ন্যায্য পরিমাণে কমানো হয়, আর ক্ষতির ঘটনা রেকর্ডে ওঠে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন