ভূমি ও নামজারি

খাস জমি কি নামজারি করা যায়: একই দাগে খাস থাকলে নিজের অংশের নামজারি, ২৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্র

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
খাস জমি কি নামজারি করা যায়: একই দাগে খাস থাকলে নিজের অংশের নামজারি, ২৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্র

সংক্ষেপে

সরাসরি উত্তর: খাস জমি সরকারের, তাই কেনা বা দখলের সূত্রে খাস অংশের নামজারি আপনার নামে হয় না। ভূমিহীন হিসেবে সরকার বন্দোবস্ত দিলে সেই বন্দোবস্তের কাগজে নামজারির পথ আলাদা। তবে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয়, তা হলো একই দাগের কিছু অংশ খাস আর কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানার। এমন দাগে এতদিন অনেক নামজারি আটকে যেত।

ভূমি মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের পরিপত্রে বলেছে, এ ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিন তদন্ত করে খাস আর ব্যক্তিমালিকানার অংশ আলাদা চিহ্নিত করবেন, তারপর শুধু ব্যক্তিমালিকানার অংশের নামজারি আর খাজনা নেওয়া যাবে। যুগান্তরের খবর অনুযায়ী নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর।

ই-নামজারির আবেদন

আবেদনের ফরমে সরকারি স্বার্থ আছে কি না, তা সঠিকভাবে জানাতে হয়।

মিউটেশন সিস্টেম
এই লেখায়
  1. খাস জমি কি নামজারি করা যায়
  2. একই দাগে খাস আর ব্যক্তির জমি: আগে কী হতো, এখন কী
  3. পরিপত্র অনুযায়ী নামজারির ধাপ
  4. আবেদনের আগে যা গুছিয়ে রাখবেন
  5. মামলা, বিরোধ আর সন্দেহ থাকলে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. খাস জমি কি নামজারি করা যায়

নামজারি মালিকানা তৈরি করে না, যে মালিকানা আছে তা রেকর্ডে তোলে। খাস জমির মালিক সরকার। তাই কেউ খাস জমি কিনে দলিল করলেও বা বহু বছর দখলে রাখলেও সেই সূত্রে নিজের নামে নামজারি পাওয়ার কথা নয়। ২৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্রেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানার অংশের নামজারি হলেও খাস বা সরকারি অংশের ওপর এর মাধ্যমে কোনো স্বত্ব, মালিকানা, দখল বা অন্য আইনগত অধিকার তৈরি হবে না।

ব্যতিক্রম হলো সরকারি বন্দোবস্ত। মিউটেশন সিস্টেমের নির্দেশিকায় নামজারির সূত্রের তালিকায় ক্রয়, ওয়ারিশ, হেবা, ডিক্রি, নিলামের পাশে বন্দোবস্ত আছে। ভূমিহীন হিসেবে কবুলিয়ত দলিলে খাস জমি পেলে সেই কাগজ দিয়ে আবেদন করা যায়।

খাস জমি বিক্রির প্রস্তাব এলে

কেউ খাস বা অর্পিত জমি বিক্রি করে নামজারি করিয়ে দেওয়ার কথা বললে সাবধান হন। এমন জমির টাকা আর দলিল দুটোই ঝুঁকিতে থাকে। কেনার আগে খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ আর দাগের অবস্থা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যাচাই করুন।

২. একই দাগে খাস আর ব্যক্তির জমি: আগে কী হতো, এখন কী

অনেক দাগ বড়, তার এক কোণে হয়তো খাস খাল, রাস্তা বা পুকুর। পরিপত্রে বলা হয়েছে, এমন অবস্থায় পুরো দাগ ধরে ব্যক্তিমালিকানার নামজারি আবেদন নেওয়া, অনুমোদন দেওয়া বা খাজনা নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফলে আগে পুরো দাগের হিসাবে আবেদন করলে তা ঝুলে যেত বা ভুল নামজারির ঝুঁকি থাকত।

একটা উদাহরণ। ধরুন ৪২১ নম্বর দাগে মোট ৫০ শতাংশ জমি। এর ৮ শতাংশ দিয়ে খাস খাল গেছে, বাকি ৪২ শতাংশ কয়েকজনের ব্যক্তিগত জমি। আপনি এর ১০ শতাংশ কিনেছেন। আগে দাগের খাস অংশের কারণে অনেক সময় পুরো আবেদনই আটকে থাকত। নতুন পরিপত্রে খালের ৮ শতাংশ আলাদা চিহ্নিত হবে, আর আপনার কেনা ১০ শতাংশের নামজারি ও খাজনা আলাদাভাবে হবে।

এখন নিয়ম হলো আগে দুই অংশ আলাদা করা, তারপর শুধু নিজের অংশের নামজারি। আলাদা করার কাজটি নামজারির ভেতরেই হবে। পরিপত্র অনুযায়ী নামজারির আবেদন থেকে পৃথকীকরণ হলে আলাদা কেস নথি লাগবে না। নামজারি ছাড়া, সরকারি প্রয়োজনে বা মালিকের আলাদা আবেদনে পৃথকীকরণ করতে হলে তখন আলাদা কেস নথি খুলতে হবে।

৩. পরিপত্র অনুযায়ী নামজারির ধাপ

  • ১
    ঘোষণাসহ আবেদনই-নামজারির ক্রয়সূত্রের ফরমে জানাতে হয় জমির কোনো অংশ খাস, অর্পিত বা অধিগ্রহণকৃত কি না, আর দাগে কোন ধরনের সরকারি স্বার্থ আছে। থাকলে নিষ্কণ্টক অংশ আলাদা চিহ্নিত করার প্রমাণসহ ব্যাখ্যা দিন।
  • ২
    ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তদন্তআবেদন পেলে ভূমি সহকারী বা উপসহকারী কর্মকর্তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেন।
  • ৩
    কানুনগো বা সার্ভেয়ারের সরেজমিন তদন্তসেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কানুনগো বা সার্ভেয়ার পাঠান। সাবেক ও হাল রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা ম্যাপ আর মালিকানার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা হয়।
  • ৪
    যৌথ স্বাক্ষরিত খসড়া নকশাস্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষদের উপস্থিতিতে সরকারি আর ব্যক্তিমালিকানার অংশ আলাদা করে খসড়া নকশা হয়, তাতে সবাই সই করেন। মাঠে উপস্থিত থাকুন।
  • ৫
    শুনানি ও অনুমোদনপ্রয়োজনে শুনানি হয়। তারপর শুধু ব্যক্তিমালিকানার অংশের নামজারি অনুমোদন হয় আর সেই অংশের খাজনা নেওয়া যায়।
নতুন খতিয়ানে মন্তব্য থাকবে

পরিপত্র অনুযায়ী নতুন খতিয়ানের মন্তব্য কলামে লেখা থাকবে যে দাগে সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ আছে আর নামজারি হয়েছে শুধু ব্যক্তিমালিকানার অংশের। পরে জমি কিনতে গেলে এই মন্তব্য দেখেই ক্রেতা বুঝবেন।

৪. আবেদনের আগে যা গুছিয়ে রাখবেন

দাগে খাস অংশ আছে কি না, আবেদনের আগেই জেনে নিন। ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবায় দাগ নম্বর দিয়ে খতিয়ান খুঁজলে দেখা যায় ওই দাগের জমি কোন কোন খতিয়ানে ভাগ হয়েছে। সরকারের নামে থাকা খাস জমি সাধারণত ১ নম্বর খাস খতিয়ানে রেকর্ড হয়। দাগের কিছু অংশ সেখানে দেখালে ধরে নিন আপনার আবেদনে পৃথকীকরণের ধাপ আসবে, আর মৌজা ম্যাপে দাগটির আকার দেখে নিন।

দাগে খাস থাকলে বাড়তি যা লাগতে পারে

সরেজমিন তদন্তের দিন জমিতে থাকা জরুরি। কানুনগো বা সার্ভেয়ার যখন সীমানা চিহ্নিত করবেন, তখন পাশের মালিকদেরও থাকতে বলুন। খসড়া নকশায় সই করার আগে মাপ আর দিক নিজে মিলিয়ে নিন, কারণ এই নকশার ভিত্তিতেই আপনার অংশ ঠিক হবে। ছবি তুলে রাখলে পরে প্রশ্ন উঠলে কাজে লাগে।

মিউটেশন নির্দেশিকা সতর্ক করেছে, ঘোষণায় অসত্য তথ্য দিলে আবেদন বাতিলের পাশাপাশি আইনগত শাস্তি হতে পারে। দাগে সরকারি অংশ আছে জেনেও 'নেই' লিখে দিলে পরে সেই নামজারিই বিপদ ডেকে আনে।

৫. মামলা, বিরোধ আর সন্দেহ থাকলে

পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি অংশ নিয়ে আদালতে মামলা চললে বা রায় থাকলে সেটি বিবেচনায় রেখেই ব্যবস্থা নিতে হবে, আর আদালতের আদেশে স্বত্ব ঠিক হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা কার্যকর হবে। অর্থাৎ বিরোধপূর্ণ দাগে নামজারি দ্রুত হবে, এমন আশা না করাই ভালো।

  • কোন অংশ খাস আর কোনটি আপনার, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে আগে ইউনিয়ন ভূমি অফিস আর এসি ল্যান্ড অফিসে রেকর্ড মিলিয়ে নিন।
  • সীমানা নিয়ে প্রতিবেশী বা সরকারের সঙ্গে বিরোধ থাকলে একজন ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  • নির্দেশনা বাস্তবায়নে সিস্টেমে নতুন সুবিধা যোগ করতে প্রকল্প পরিচালককে বলা হয়েছে। তাই ফরমে নতুন ঘর দেখলে নির্দেশনা পড়ে পূরণ করুন, না বুঝলে ১৬১২২-এ জিজ্ঞেস করুন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

খাস জমি নামজারি করার নিয়ম কী?
খাস অংশ কেনা বা দখলের সূত্রে আপনার নামে নামজারি হয় না। সরকারি বন্দোবস্ত পেলে কবুলিয়তসহ 'বন্দোবস্ত' সূত্রে আবেদন করা যায়। দাগের বাকি ব্যক্তিমালিকানার অংশ আলাদা চিহ্নিত করে নামজারি করা যায়।
দাগে খাস আছে বলে আগে আমার আবেদন আটকে ছিল, এখন কী করব?
নতুন পরিপত্রের কথা উল্লেখ করে এসি ল্যান্ড অফিসে খোঁজ নিন বা নতুন করে আবেদন করুন। ফরমে সরকারি স্বার্থের ধরন আর নিজের অংশের প্রমাণ সঠিকভাবে দিন।
অর্পিত বা অধিগ্রহণকৃত অংশ থাকলেও কি একই নিয়ম?
পরিপত্রে খাস বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমির কথা বলা হয়েছে, আর ই-নামজারির ঘোষণায় অর্পিত, অধিগ্রহণকৃত, ওয়াকফসহ সরকারি স্বার্থের ধরন বাছাই করতে হয়। নিজের ক্ষেত্রে কী খাটে, এসি ল্যান্ড অফিসে জেনে নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন