ভূমি ও নামজারি

জমি রেজিস্ট্রি খরচ ২০২৬: স্ট্যাম্প, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর আর উৎসে কর কত

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
জমি রেজিস্ট্রি খরচ ২০২৬: স্ট্যাম্প, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর আর উৎসে কর কত

সংক্ষেপে

জমি কেনাবেচার সাফ কবলা দলিলে সরকারি খরচ পাঁচ ভাগে হয়: দলিল মূল্যের ১.৫% স্ট্যাম্প শুল্ক, ১% রেজিস্ট্রেশন ফি, ইউনিয়ন বা উপজেলা এলাকায় ৩% আর সিটি করপোরেশনে ২% স্থানীয় সরকার কর, এলাকা অনুযায়ী উৎসে কর, আর কিছু ছোট ফি। নিবন্ধন অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় এই হারগুলো দেওয়া আছে।

উৎসে কর ঠিক হয় উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ অনুযায়ী, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর। পৌরসভার বাইরের উপজেলা এলাকায় এটি দলিল মূল্যের ২% অথবা শতকপ্রতি ৫০০ টাকা, যেটি বেশি। শহরে হার আর শতকপ্রতি ন্যূনতম অঙ্ক দুটোই বেশি।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি ও করের তালিকা

দলিলের ধরন অনুযায়ী স্ট্যাম্প, ফি আর করের সরকারি তালিকা এই পাতায় পিডিএফ আকারে আছে।

তালিকা দেখুন
এই লেখায়
  1. খরচের পাঁচটি ভাগ
  2. উৎসে কর: এলাকা অনুযায়ী কত
  3. একটি হিসাব: ইউনিয়নের ১০ শতক জমি, দাম ১০ লাখ টাকা
  4. টাকা জমা দেওয়া আর রেজিস্ট্রির দিন
  5. অন্য দলিলে খরচ কেমন
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. খরচের পাঁচটি ভাগ

নিবন্ধন অধিদপ্তরের 'দলিল রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ফিস, স্ট্যাম্প শুল্ক ও করাদির হার' তালিকার প্রথম সারিতেই সাফ কবলা দলিল। সেখানে প্রতিটি খাত আলাদা ঘরে দেখানো আছে। শতাংশগুলো হিসাব হয় দলিলে লেখা জমির মূল্যের ওপর।

খাতহারকোথা থেকে আসে
স্ট্যাম্প শুল্কদলিল মূল্যের ১.৫%, সঙ্গে হলফনামার স্ট্যাম্প ৩০০ টাকাস্ট্যাম্প আইন
রেজিস্ট্রেশন ফি (এ ফি)১%, তবে সর্বনিম্ন ১০০ টাকাদলিল নিবন্ধন ফিসের তালিকা
স্থানীয় সরকার করইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ৩%; সিটি করপোরেশন বা উপজেলার অধীন নয় এমন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে ২%স্থানীয় সরকারের আইন
উৎসে করএলাকা আর জমির শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা, নিচের অংশ দেখুনআয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ১২৫
ছোট ফিই ফি ১০০ টাকা; এন ফি ৩০০ শব্দের প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা; এনএন ফি প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা; কোর্ট ফি ১০ টাকাদলিল নিবন্ধন ফিসের তালিকা

অগ্রক্রয় প্রযোজ্য হলে প্রতি শরিকের নোটিশের জন্য ৫ টাকা কোর্ট ফি লাগে। প্লট বা ফ্ল্যাট ডেভেলপারের কাছ থেকে কিনলে ভ্যাটও যোগ হয়, সাধারণ জমি কেনাবেচায় ভ্যাট নেই।

২. উৎসে কর: এলাকা অনুযায়ী কত

উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ এর বিধি ৬ বলছে, সম্পত্তি হস্তান্তরকারী, অর্থাৎ বিক্রেতা, নির্ধারিত হারে কর পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে পে-অর্ডারের কপি না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল নিবন্ধন করবেন না। হারটি দলিল মূল্যের শতাংশ অথবা শতকপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্ক, এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি।

জমির অবস্থানউৎসে কর (সাধারণ এলাকার জমি)
পৌরসভার বাইরে উপজেলার যেকোনো মৌজা২% অথবা শতকপ্রতি ৫০০ টাকা, যেটি বেশি
সারণি-১ এ নাম নেই এমন পৌরসভা২% অথবা শতকপ্রতি ১০,০০০ টাকা, যেটি বেশি
জেলা সদরের পৌরসভা, আর ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর বাদে অন্য সিটি করপোরেশন৩% অথবা শতকপ্রতি ২৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি
ঢাকার গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও তেজগাঁও থানার মৌজা৫% অথবা শতকপ্রতি ৩,০০,০০০ টাকা, যেটি বেশি

টেবিলের অঙ্কগুলো বিধিমালার 'চ' শ্রেণির, মানে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ডেভেলপারের প্রকল্পের বাইরের সাধারণ এলাকার। রাজউক, সিডিএর মতো কর্তৃপক্ষের এলাকা, ডেভেলপারের প্রকল্প আর শিল্প প্লটে শতকপ্রতি অঙ্ক অনেক বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের থানাভিত্তিক আলাদা তালিকা আছে। জমিতে বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকলে প্রতি বর্গমিটারে আলাদা অতিরিক্ত কর যোগ হয়।

দানের দলিলে উৎসে কর নেই

এনবিআর জানিয়েছে, উৎসে কর লাগে বিক্রয়ে, দানে নয়। বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা আপন ভাইবোনের মধ্যে দানে দানকরও লাগে না। অন্যদের দানে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে দানকর ই-চালানে দিয়ে তারপর নিবন্ধন হয়।

৩. একটি হিসাব: ইউনিয়নের ১০ শতক জমি, দাম ১০ লাখ টাকা

ধরা যাক, পৌরসভার বাইরে একটি ইউনিয়নে ১০ শতক জমি ১০ লাখ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে, আর দলিলে সেই দামই লেখা। উৎসে কর এখানে ২% ধরলে ২০,০০০ টাকা, শতকপ্রতি ৫০০ ধরলে ৫,০০০ টাকা। বেশিটা, অর্থাৎ ২০,০০০ টাকাই দিতে হবে।

খাতটাকা
স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫%১৫,০০০
রেজিস্ট্রেশন ফি ১%১০,০০০
স্থানীয় সরকার কর ৩%৩০,০০০
উৎসে কর ২%২০,০০০
হলফনামার স্ট্যাম্প আর ই ফি৪০০
মোট (এন ফি, এনএন ফি আর কোর্ট ফি বাদে)৭৫,৪০০

অর্থাৎ ইউনিয়ন এলাকায় সরকারি খরচ দলিল মূল্যের সাড়ে সাত শতাংশের কাছাকাছি। পৌরসভায় শতকপ্রতি ন্যূনতম অঙ্কটা হিসাব বদলে দিতে পারে। যেমন সারণি-১ এর বাইরের কোনো পৌরসভায় ৫ শতক জমির দাম ২০ লাখ টাকা হলে ২% আসে ৪০,০০০ টাকা, কিন্তু শতকপ্রতি ১০,০০০ টাকা ধরলে ৫০,০০০ টাকা। তখন উৎসে কর ৫০,০০০ টাকা।

৪. টাকা জমা দেওয়া আর রেজিস্ট্রির দিন

  • ১
    দলিলের লিখিত হিসাব নিনদলিলের খসড়া হলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা লাইসেন্সধারী দলিল লেখকের কাছ থেকে খাতওয়ারি হিসাব কাগজে লিখিয়ে নিন। মৌজা, জমির শ্রেণি আর দলিল মূল্য ঠিকমতো বসেছে কি না মিলিয়ে নিন।
  • ২
    উৎসে কর পে-অর্ডারেবিধিমালা অনুযায়ী উৎসে কর পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে পে-অর্ডারের কপি নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে দিতে হয়। ব্যাংকে পে-অর্ডার করার সময় নাম আর অঙ্ক দুবার দেখে নিন।
  • ৩
    রেজিস্ট্রেশন ফি আর অন্য খাতরেজিস্ট্রেশন ফি আর বাকি খাত কোনটা পে-অর্ডারে আর কোনটা চালানে দেবেন, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেনে নিন। প্রতিটি খাতের সরকারি রসিদ বা পে-অর্ডারের কপি নিজের কাছে রাখুন।
  • ৪
    রিটার্নের প্রমাণ সঙ্গে রাখুনসিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি বিক্রয়, বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধনে আয়কর আইনের ধারা ২৬৪ অনুযায়ী রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) লাগে।
  • ৫
    নিবন্ধনের দিনদাতা আর গ্রহীতা দুজনেই জাতীয় পরিচয়পত্রসহ উপস্থিত থাকুন। দলিলে সই, টিপ আর ছবি নেওয়ার পর রসিদ দেওয়া হয়, সেটি দিয়ে পরে মূল দলিল তুলবেন।
দলিল লেখকের মুখের হিসাবে টাকা দেবেন না

২০২৬ সালের নিবন্ধন আইন সংশোধন অনুযায়ী দলিল উপস্থাপনের সময়ই সব ফি, কর ও শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। প্রাপ্য টাকা না নিয়ে দলিল নিবন্ধন করলে তা কর্মকর্তার অসদাচরণ, অনাদায়ী টাকা আদায় হবে তাঁর কাছ থেকে। তাই প্রতিটি অঙ্কের সরকারি কাগজ নিন, দালালের হাতে নগদ দেবেন না।

৫. অন্য দলিলে খরচ কেমন

  • দানপত্র: স্ট্যাম্প ১.৫%, রেজিস্ট্রেশন ফি আর স্থানীয় সরকার কর সাফ কবলার মতো, উৎসে কর নেই।
  • হেবার ঘোষণা: স্ট্যাম্প ১,০০০ টাকা, এ ফি ১০০ টাকা; স্থানীয় সরকার কর আর উৎসে কর নেই।
  • এওয়াজ বা বিনিময়: স্ট্যাম্প ১%, উৎসে কর নেই।
  • ওয়াকফ দলিল: স্ট্যাম্প ১.৫%, ওয়াকফ লিল্লাহর ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কর লাগে না।

জমি রেজিস্ট্রির পর নিজের নামে খতিয়ান খোলাতে আলাদা করে ই-নামজারির আবেদন করতে হয়, তার ফি আলাদা। নামজারি না হলে খাজনা দেওয়া আর পরে বিক্রি দুটোই আটকে যেতে পারে। দলিল মূল্য বা কর নিয়ে বিরোধ হলে সাব-রেজিস্ট্রার বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

উৎসে কর কে দেবেন, ক্রেতা না বিক্রেতা?
উৎসে কর বিধিমালা অনুযায়ী উৎসে কর জমার প্রমাণ দেন সম্পত্তি হস্তান্তরকারী, অর্থাৎ বিক্রেতা। বাকি খাতগুলো কে দেবেন, তা দুই পক্ষ চুক্তিতে ঠিক করে নিন এবং বায়নানামায় লিখে রাখুন।
কৃষিজমি কিনলেও কি উৎসে কর লাগে?
লাগে। বিধিমালার সারণি-২ অনুযায়ী পৌরসভার বাইরে উপজেলার সব মৌজায় দলিল মূল্যের ২% অথবা শতকপ্রতি ৫০০ টাকা, যেটি বেশি।
সিটি করপোরেশনে স্থানীয় সরকার কর কত?
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তালিকায় সিটি করপোরেশন আর উপজেলার অধীন নয় এমন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ২%, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা বা অন্য ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ৩%। পৌরসভার জমিতে কোন হার বসবে, তা সাব-রেজিস্ট্রারের লিখিত হিসাবে মিলিয়ে নিন।
অনলাইনে জমি রেজিস্ট্রি খরচ ক্যালকুলেটর কি সরকারি?
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে হারের তালিকা আছে, কোনো সরকারি ক্যালকুলেটর আমরা পাইনি। বেসরকারি ক্যালকুলেটর পুরোনো হার দেখাতে পারে, তাই চূড়ান্ত অঙ্ক সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকেই নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৯ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন