ভূমি ও নামজারি

উইল দলিল করার নিয়ম: মুসলিম আইনে এক-তৃতীয়াংশের সীমা, সাক্ষী, রেজিস্ট্রি ঐচ্ছিক আর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে জমা রাখা

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
উইল দলিল করার নিয়ম: মুসলিম আইনে এক-তৃতীয়াংশের সীমা, সাক্ষী, রেজিস্ট্রি ঐচ্ছিক আর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে জমা রাখা

সংক্ষেপে

উইল দলিল হলো এমন ঘোষণা, যার মাধ্যমে একজন মানুষ ঠিক করে যান তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তির কোন অংশ কে পাবেন। মুসলিম আইনে ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল করা যায় না। উইল কার্যকর হয় মৃত্যুর পর, আর হেবা কার্যকর হয় জীবদ্দশায়।

রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী উইল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে করা যায়, যেকোনো সময়। চাইলে সিলমোহর করা খামে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে জমাও রাখা যায়। বিরোধ এড়াতে লিখিত উইল, সাক্ষী আর আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট

দলিল নিবন্ধনের ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাইটে আছে।

নিবন্ধন অধিদপ্তর
এই লেখায়
  1. উইল দলিল কি, হেবার সঙ্গে তফাত কোথায়
  2. উইল কত অংশ করা যায়, কাকে করা যায়
  3. উইল দলিল লেখার নিয়ম: যা থাকা দরকার
  4. উইল রেজিস্ট্রি করতে হয় কি
  5. মৃত্যুর পর উইলের জমি নিজের নামে আনবেন যেভাবে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. উইল দলিল কি, হেবার সঙ্গে তফাত কোথায়

দ্য ডেইলি স্টার বাংলার জুলাই ২০২৫-এর এক ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেছেন, উইল এমন একটি ঘোষণা যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর পর সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কাউকে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। হেবা হলো জীবদ্দশায় বিনামূল্যে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া, আর তাতে দখল হস্তান্তর জরুরি।

বিষয়উইলহেবা
কখন কার্যকরদাতার মৃত্যুর পরদাতার জীবদ্দশায়
কতটুকু দেওয়া যায় (মুসলিম আইন)ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্তপুরো সম্পত্তিও দেওয়া যায়
দখলমৃত্যুর পরদেওয়ার সময়েই হস্তান্তর জরুরি
রেজিস্ট্রিঐচ্ছিকস্থাবর সম্পত্তির হেবায় বাধ্যতামূলক

জীবদ্দশায় সন্তানকে জমি দিয়ে দিতে চাইলে সেটি হেবা, তার খরচ আর কাগজের নিয়ম আলাদা। আর নিজের মৃত্যুর পর কোনো নাতি, আত্মীয় বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু দিয়ে যেতে চাইলে সেটি উইল।

২. উইল কত অংশ করা যায়, কাকে করা যায়

ওই ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুসলিম আইনে ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল বৈধ নয়। এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল হলে ওয়ারিশেরা আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। উইল আত্মীয়, অনাত্মীয়, এমনকি অমুসলিম কাউকেও করা যায়।

  • মুসলিম নারী নিজের সম্পত্তি উইল বা হেবা করতে পারেন, তাঁর পূর্ণ অধিকার আছে
  • নাবালকের পক্ষে উইল বৈধ
  • অমুসলিমদের উইল মূলত Succession Act, ১৯২৫ অনুযায়ী চলে
  • উইল কার্যকর করেন উইলে মনোনীত নির্বাহক বা Executor, না থাকলে আদালত নিয়োগ দিতে পারেন

একটা উদাহরণ: কারও মোট ৯০ শতাংশ জমি আছে। তিনি উইল করে বড়জোর ৩০ শতাংশ কাউকে দিয়ে যেতে পারেন, ওয়ারিশেরা রাজি না থাকলে এর বেশি নয়। বাকি জমি উত্তরাধিকারের সাধারণ নিয়মে ভাগ হবে। কোন ওয়ারিশ কতটা পাবেন বা ওয়ারিশকে উইল করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৩. উইল দলিল লেখার নিয়ম: যা থাকা দরকার

ডেইলি স্টারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মুসলিম আইনে মৌখিক উইলও বৈধ, তবে প্রমাণের সুবিধার জন্য লিখিত উইল বেশি কার্যকর। মৌখিক উইলে সাক্ষী থাকলে প্রমাণ সহজ হয়, আর লিখিত উইলে সাক্ষীর সই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

লিখিত উইলে যা রাখবেন

আইনজীবী দিয়ে খসড়া করান

দাগ নম্বর বা অংশের হিসাবে একটা ভুল পরে বড় বিরোধ তৈরি করতে পারে। খতিয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে একজন আইনজীবী বা অভিজ্ঞ দলিল লেখককে দিয়ে খসড়া করানো নিরাপদ।

৪. উইল রেজিস্ট্রি করতে হয় কি

রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারায় যেসব দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক, তার মধ্যে উইল নেই। ১৮ ধারা বলছে, বাধ্যতামূলক নয় এমন দলিলও চাইলে রেজিস্ট্রি করা যায়। আর ২৭ ধারায় পরিষ্কার লেখা, উইল যেকোনো সময় রেজিস্ট্রির জন্য দেওয়া বা জমা রাখা যায়।

  • ১
    উইলকারী নিজে দিলে৪১ ধারা অনুযায়ী উইলকারী নিজে উইল রেজিস্ট্রির জন্য দিলে সেটি অন্য দলিলের মতোই নিবন্ধিত হয়। নিজের এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিন।
  • ২
    মৃত্যুর পর অন্য কেউ দিলেউইলকারীর মৃত্যুর পর অধিকারপ্রাপ্ত কেউ উইল রেজিস্ট্রির জন্য দিলে নিবন্ধন কর্মকর্তা আগে নিশ্চিত হবেন যে উইলটি উইলকারীই করেছিলেন, তিনি মারা গেছেন, আর যিনি দিচ্ছেন তিনি আইনত দেওয়ার অধিকারী।
  • ৩
    সিলমোহর খামে জমা রাখা৪২ ধারা অনুযায়ী উইলকারী নিজে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে সিলমোহর করা খামে উইল জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে জমা রাখতে পারেন। খামের ওপর উইলকারীর নাম আর মৃত্যুর পর কাকে উইলটি দেওয়া হবে তার নাম-ঠিকানা লিখতে হয়। খামে দলিলের ধরনও উল্লেখ করতে হয়।

ডেইলি স্টারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য হতে পারে। কত লাগবে, তা নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি তালিকা দেখে বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জেনে নিন।

৫. মৃত্যুর পর উইলের জমি নিজের নামে আনবেন যেভাবে

উইল শুধু কাগজে থাকলে জমি নিজে নিজে আপনার নামে আসে না। উইলকারীর মৃত্যুর পর সাধারণত উইলের কপি, মৃত্যু সনদ আর ওয়ারিশ সনদ নিয়ে নামজারির আবেদন করতে হয়। কোন কাগজ লাগবে, তা ই-নামজারির আবেদনের সময় বা উপজেলা ভূমি অফিসে মিলিয়ে নিন।

ওয়ারিশদের কেউ উইল নিয়ে আপত্তি তুললে বিষয়টি আদালতে যেতে পারে। তাই উইল করার সময়ই পরিবারের মানুষকে জানিয়ে রাখা, সাক্ষী রাখা আর সম্ভব হলে রেজিস্ট্রি করানো পরের ঝামেলা কমায়। বিরোধ দেখা দিলে এসি ল্যান্ড অফিস বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরেকটি বাস্তব কথা মনে রাখুন। উইল যত যত্ন করেই লেখা হোক, সেটি কোথায় রাখা আছে তা কেউ না জানলে মৃত্যুর পর কাজে আসে না। তাই উইলের একটি কপি বিশ্বস্ত কারও কাছে রাখুন, আর মূল কপি কোথায় আছে তা নির্বাহককে জানিয়ে দিন। রেজিস্ট্রি করা থাকলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পরে সার্টিফাইড কপিও তোলা যায়, যা দলিল তল্লাশির মতোই আবেদন করে পাওয়া যায়। জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে সিলমোহর খামে জমা রাখলে খামের ওপর যাঁর নাম-ঠিকানা লেখা থাকে, নিবন্ধনের পর মূল উইলটি তাঁকেই দেওয়ার কথা।

৬. অনেকে যা জানতে চান

উইল দলিল কি?
উইল হলো মৃত্যুর পর নিজের সম্পত্তি কে কতটুকু পাবেন, সেই ঘোষণা। মুসলিম আইনে ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল করা যায় না।
উইল কি রেজিস্ট্রি করতে হয়?
রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী উইল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক নয়, তবে যেকোনো সময় রেজিস্ট্রি করা যায়। রেজিস্ট্রি করা বা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে সিলমোহর খামে জমা রাখা উইল পরে প্রমাণে সুবিধা দেয়।
উইল কি একটি দলিল?
লিখিত উইল একটি দলিল, যা চাইলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করা যায়। মুসলিম আইনে মৌখিক উইলও বৈধ, তবে লিখিত আর সাক্ষীসহ উইল প্রমাণ করা সহজ।
will dolil korar niyom ki?
সম্পত্তির বিবরণ, কে কতটুকু পাবেন, নির্বাহক আর সাক্ষীর সইসহ লিখিত উইল করুন। মুসলিম হলে এক-তৃতীয়াংশের সীমা মানুন, আর খসড়া আইনজীবীকে দিয়ে দেখিয়ে নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন