সংক্ষেপে
জমির দলিল হারালে বা পুরোনো দলিলের প্রমাণ লাগলে যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখান থেকে নকল (সার্টিফাইড কপি) তোলা যায়। দলিলের নম্বর, সাল আর বহি-ভলিউম জানা থাকলে সরাসরি নকলের দরখাস্ত দিন। না জানলে আগে তল্লাশের দরখাস্ত দিয়ে সূচিবহি (ইনডেক্স) খুঁজে নম্বর বের করতে হয়।
২০২৩ সালের সংশোধিত ফি তালিকা অনুযায়ী নকলে প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠায় ২৪ টাকা ফি আর ৩৬ টাকা নকলনবিশের পারিশ্রমিক লাগে, দরখাস্তে ২০ টাকার কোর্ট ফি। জরুরি নকলে বাড়তি টাকা দিতে হয়, আর নকলে স্ট্যাম্প শুল্ক লাগে ১০০ বা ২০০ টাকা।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফরম পাতায় তল্লাশ ও পরিদর্শন আর নকলের দরখাস্তের ফরম আছে।
এই লেখায়
১. তল্লাশ, পরিদর্শন আর নকল: কোনটা আপনার দরকার
দলিল রেজিস্ট্রি হলে তার পুরো লেখা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেজিস্ট্রি বহিতে (বালাম) নকল করে রাখা হয়, আর নাম ও মৌজা ধরে সূচিবহি বা ইনডেক্স তৈরি হয়। মূল দলিল হারালেও এই বহি থেকে আইনসম্মত কপি পাওয়া যায়।
| কাজ | কখন লাগে | ফলাফল |
|---|---|---|
| তল্লাশ | দলিলের নম্বর বা সাল জানা নেই, শুধু দাতা-গ্রহীতার নাম বা মৌজা জানেন | সূচিবহি খুঁজে দলিল নম্বর, বহি, ভলিউম ও পৃষ্ঠা বের হয় |
| পরিদর্শন | রেজিস্ট্রি বহিতে দলিলটি নিজে দেখতে চান | নির্দিষ্ট দলিলের পাতা দেখা যায় |
| নকল | দলিলের সার্টিফাইড কপি দরকার | সাব-রেজিস্ট্রারের সই করা কপি হাতে পান |
দলিলের নকল আর খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি এক জিনিস নয়। দলিলের নকল দেয় নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। খতিয়ান বা পর্চার কপি আসে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থায়, তার নিয়ম আলাদা লেখায় আছে।
২. কোথায় আবেদন করবেন, কে পারেন
আবেদন করতে হয় যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখানে। দুটি দরখাস্তের ফরমেই অফিসের নাম লিখতে হয়। অনেক পুরোনো বহি জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে রাখা থাকতে পারে, তাই দলিলটি বহু বছর আগের হলে কোথায় আবেদন করবেন, আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জেনে নিন।
- রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী ১ নম্বর বহির দলিল আর তার সূচি ফি দিয়ে যে কেউ দেখতে ও নকল নিতে পারেন। জমি কেনাবেচা, দান বা বন্টনের দলিল সাধারণত এই বহিতে থাকে।
- ৩ বা ৪ নম্বর সূচি বা বহির ক্ষেত্রে দরখাস্তে লিখতে হয় দলিলে আপনার স্বার্থ কী: আপনি সম্পাদনকারী, দাবিদার, নাকি তাঁদের প্রতিনিধি।
- নিজে যেতে না পারলে কাউকে পাঠাতে পারেন, তবে দরখাস্তে আবেদনকারীর নাম ও ঠিকানা ঠিকঠাক লিখুন।
৩. দলিল নম্বর না জানলে: তল্লাশের ধাপ
তল্লাশের সরকারি ফরমের নাম 'তল্লাস কিংবা পরিদর্শনের জন্য দরখাস্তের ফরম' (বাংলাদেশ ফরম নং ১৫৩৫)। ফরমের ঘর দেখলেই বোঝা যায় কোন তথ্য গুছিয়ে নিতে হবে।
- ১তথ্য গুছিয়ে নিনকোন সাল বা সালগুলোতে খুঁজবেন, কোন ব্যক্তির নাম বা কোন মৌজা ধরে খুঁজবেন, আর দলিলটি কী ধরনের (সাফ কবলা, দান, হেবা, বন্টন ইত্যাদি), লিখে রাখুন। পুরোনো খাজনার রসিদ, খতিয়ান বা পরচায় দলিলের সূত্র থাকলে সেটিও নিন।
- ২তল্লাশের দরখাস্ত দিনসাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ফরমটি পূরণ করুন: দরখাস্তের তারিখ, আপনার নাম-ঠিকানা, সাল, নাম বা স্থান, দলিলের ধরন আর কোন নম্বরের সূচিপত্র (১, ২, ৩ বা ৪) খুঁজতে হবে।
- ৩ফি জমা দিনফরমের 'প্রদত্ত ফি' ঘরে তল্লাশ ও পরিদর্শনের ফি (দফা চ) লেখা হয়। সাধারণত কত সাল খুঁজতে হবে তার ওপর ফি নির্ভর করে। অফিস হিসাব করে দেবে, রসিদ নিন।
- ৪খুঁজে পেলে নম্বর লিখে নিনতল্লাশে দলিল পাওয়া গেলে ফরমের মন্তব্যের ঘরে দলিলের নম্বর আর যে ভলিউম ও পৃষ্ঠায় রেজিস্ট্রি করা আছে, তা লেখা হয়। এই তথ্য দিয়েই পরে নকলের দরখাস্ত করবেন।
তল্লাশের ফি আর সময় সাধারণত নির্ভর করে কত বছরের সূচি খুঁজতে হচ্ছে তার ওপর। পরিবারের বড়দের কাছে, পুরোনো খাজনার রসিদে বা নামজারির কাগজে দলিলের সাল খুঁজে দেখুন।
৪. নকলের দরখাস্ত
নকলের সরকারি ফরম হলো '৩৭ নং ফরম, নকলের জন্য দরখাস্তের ফরম' (বাংলাদেশ ফরম নং ১৫৮০)। দলিলের নম্বর জানা থাকলে তল্লাশ ছাড়াই সরাসরি এই দরখাস্ত দেওয়া যায়।
নকলের দরখাস্তে যা লিখবেন
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি তালিকায় বলা আছে, তল্লাশ ও পরিদর্শন ছাড়া সরাসরি নকলের আবেদন করলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তল্লাশ ও পরিদর্শনের ফিও (এফ(১) ও এফ(২)) দিতে হবে। অর্থাৎ অফিসকে খুঁজে দেখতে হলে সেই খরচ নকলের সঙ্গেই যোগ হতে পারে।
৫. নকলের সরকারি ফি
২০২৩ সালের ৫ জুলাই গেজেটে প্রকাশিত সংশোধনী আর নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফিসের তালিকা অনুযায়ী নকলের খরচ কয়েক ভাগে হয়। পৃষ্ঠা মানে ৩০০ শব্দের এক পৃষ্ঠা বা তার অংশ, ভাষা বাংলা, ইংরেজি বা দুটোই হোক।
| খাত | হার |
|---|---|
| নকলের ফি, দফা ছ(ক) | প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা |
| নকলনবিশের পারিশ্রমিক, দফা ছছ | প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা |
| জরুরি নকল, দফা ছ(খ) | বাড়তি ৫০ টাকা; নকল ৪ পৃষ্ঠার বেশি হলে বাড়তি প্রতি পৃষ্ঠা ১৫ টাকা |
| দরখাস্তের কোর্ট ফি | ২০ টাকা |
| স্ট্যাম্প শুল্ক | মূল দলিলের স্ট্যাম্প শুল্ক ১,০০০ টাকা বা কম হলে ১০০ টাকা, অন্য ক্ষেত্রে ২০০ টাকা |
যেমন সাধারণ নকল ৫ পৃষ্ঠার হলে ফি আর পারিশ্রমিক মিলে পৃষ্ঠাপ্রতি ৬০ টাকা হিসাবে ৩০০ টাকা, সঙ্গে ২০ টাকা কোর্ট ফি আর ১০০ বা ২০০ টাকার স্ট্যাম্প। তল্লাশ লাগলে তার ফি আলাদা। নিজের টাইপ করা কপি জমা দিয়ে সেটিকে 'অবিকল নকল' হিসেবে প্রত্যয়ন করাতে চাইলে ফি আর পারিশ্রমিক অর্ধেক হয়।
অফিসের বাইরে অনেকে নির্দিষ্ট দিনে নকল এনে দেওয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের টাকা চান। ফি আর পারিশ্রমিকের হার সরকারি, প্রতিটি টাকার রসিদ চেয়ে নিন। অনিয়ম দেখলে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।
৬. নকল হাতে পেয়ে যা মিলিয়ে নেবেন
কবে নকল দেওয়া হবে, দরখাস্ত জমার সময় অফিস সাধারণত তারিখ জানিয়ে দেয়। জরুরি ফি দিলে আগে পাওয়ার কথা। হাতে পেলে বাড়ি ফেরার আগেই এগুলো দেখে নিন:
- দলিল নম্বর, সাল আর দাতা-গ্রহীতার নাম আপনার দরখাস্তের সঙ্গে মিলছে কি না।
- তফসিলে মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর আর জমির পরিমাণ ঠিকঠাক এসেছে কি না।
- নকলে অফিসের সিল আর সাব-রেজিস্ট্রারের সই আছে কি না।
- পৃষ্ঠা সংখ্যা রসিদে যত লেখা, নকলে ততটাই আছে কি না।
মূল দলিল হারালে নামজারি বা মামলার মতো কাজে এই সার্টিফাইড কপিই ভরসা। ই-নামজারির আবেদনে মূল দলিল বা নকলের সব পাতা স্ক্যান করে দিতে হয়, তাই নকলটি যত্ন করে রাখুন। কোনো প্রতিষ্ঠান মূল দলিল চাইবে কি না, তা তাদের নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
৭. অনেকে যা জানতে চান
দলিলের নকল কি অনলাইনে তোলা যায়?
অন্যের নামে রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলের নকল কি আমি নিতে পারব?
শুধু বাবার নাম আর মৌজা জানি, দলিল নম্বর জানি না। কী করব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।