
সংক্ষেপে
না দাবি দলিল হলো এমন রেজিস্ট্রি করা দলিল, যাতে একজন সহ-মালিক বা ওয়ারিশ কোনো জমিতে নিজের দাবি বা অংশ আরেকজনের পক্ষে ছেড়ে দেন। নিবন্ধন অধিদপ্তরের হার তালিকা অনুযায়ী না দাবি দলিলে স্ট্যাম্প শুল্ক ৩০০ টাকা, হলফনামার স্ট্যাম্প ৩০০ টাকা আর নিবন্ধন ফি দলিল মূল্যের ১%, তবে কমপক্ষে ১০০ টাকা।
এর সঙ্গে সাফ কবলার মতোই স্থানীয় সরকার কর লাগে, যা ইউনিয়ন এলাকায় ৩% আর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২%। উৎসে কর লাগে না। নিকট আত্মীয়কে অংশ দিতে চাইলে হেবা বা বণ্টননামায় সরকারি খরচ অনেক কম হতে পারে, তাই দলিল বাছার আগে তুলনাটা দেখে নিন।
কোন দলিলে কত স্ট্যাম্প, নিবন্ধন ফি আর কর, তার সরকারি তালিকা এখানে ডাউনলোড করা যায়।
এই লেখায়
১. না দাবি দলিল কি, কখন করা হয়
ধরুন বাবা মারা যাওয়ার পর তিন ভাইবোন একটি জমির ওয়ারিশ হলেন। বড় বোন ঢাকায় থাকেন, জমিতে তাঁর আগ্রহ নেই, তিনি চান ছোট ভাই পুরো জমিটা দেখাশোনা করুক এবং নিজের নামে নামজারি করুক। এই অবস্থায় বোন রেজিস্ট্রি দলিল করে নিজের অংশের দাবি ছেড়ে দিতে পারেন। এটাই না দাবি দলিল, কেউ কেউ নাদাবি দলিল বা না দাবী নামাও বলেন।
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭(১)(খ) ধারা বলে, যে দলিল স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো অধিকার তৈরি, হস্তান্তর, সীমিত বা নিঃশেষ করে, তা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। না দাবি দলিলে একজনের অধিকার শেষ হয়ে যায়, তাই সাদা কাগজে বা স্ট্যাম্পে লিখে সই নিলেই কাজ শেষ হয় না, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করাতে হয়।
বিদ্যুৎ বা গ্যাসের মিটার ওয়ারিশের নামে নিতে অনেক সময় অন্য ওয়ারিশদের একটি না দাবি পত্র চাওয়া হয়, যাতে চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের সত্যায়ন থাকে। সেটি সেবা সংস্থার কাগজ। জমির মালিকানার জন্য লাগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত না দাবি দলিল।
২. না দাবি দলিল খরচ কত
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত হার তালিকার ২৩ নম্বর সারিতে না দাবি দলিলের খরচ দেওয়া আছে। যেসব ঘরে লেখা 'সাফ কবলার ন্যায়', সেগুলোর হার তালিকার ১ নম্বর সারি থেকে নেওয়া।
| খাত | না দাবি দলিলে সরকারি হার |
|---|---|
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ৩০০ টাকা |
| হলফনামার স্ট্যাম্প | ৩০০ টাকা |
| নিবন্ধন ফি (এ ফি) | দলিল মূল্যের ১%, সর্বনিম্ন ১০০ টাকা |
| স্থানীয় সরকার কর | সাফ কবলার মতো: ইউনিয়ন, উপজেলা বা জেলা এলাকায় ৩%, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২% |
| ই ফি | ১০০ টাকা |
| এন ফি | ৩০০ শব্দের প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা |
| এনএন ফি ও কোর্ট ফি | প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা, কোর্ট ফি ১০ টাকা |
| উৎসে কর ও উৎসে আয়কর | প্রযোজ্য নয় |
একটা উদাহরণ দিই, শুধু হার বোঝার জন্য। ইউনিয়ন এলাকার জমিতে আপনার অংশের দলিল মূল্য যদি ৫ লাখ টাকা লেখা হয়, তাহলে ১% নিবন্ধন ফি হয় ৫,০০০ টাকা আর ৩% স্থানীয় সরকার কর হয় ১৫,০০০ টাকা। সঙ্গে স্ট্যাম্প, হলফনামা, ই ফি আর পৃষ্ঠার হিসাবে এন ও এনএন ফি যোগ হবে। দলিলের মূল্য কীভাবে ধরা হবে আর চূড়ান্ত অঙ্ক কত, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই ঠিক করে, তাই রেজিস্ট্রির আগে সেখানে হিসাব মিলিয়ে নিন।
৩. হেবা, বণ্টননামা না না দাবি: কোনটায় খরচ কম
একই কাজ, মানে একজনের অংশ আরেকজনের হাতে যাওয়া, অন্য দলিলেও হতে পারে। একই হার তালিকা অনুযায়ী তিন ধরনের দলিলের মূল খরচ পাশাপাশি রাখলে তফাতটা পরিষ্কার হয়।
| দলিল | স্ট্যাম্প শুল্ক | নিবন্ধন ফি | স্থানীয় সরকার কর |
|---|---|---|---|
| না দাবি দলিল | ৩০০ টাকা | ১%, সর্বনিম্ন ১০০ টাকা | লাগে (৩% বা ২%) |
| হেবার ঘোষণা | ১,০০০ টাকা | ১০০ টাকা | লাগে না |
| বণ্টননামা | ১০০ টাকা | ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা, সম্পত্তির মূল্যভেদে | লাগে না |
- হেবায় ১০০ টাকার নিবন্ধন ফি শুধু স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি আর আপন ভাইবোনের মধ্যে প্রযোজ্য। আপন ভাইকে অংশ দিতে চাইলে হেবা সস্তা পড়তে পারে।
- সব ওয়ারিশ মিলে জমি ভাগ করে নিতে চাইলে বণ্টননামা দলিলই উপযুক্ত, সেখানে প্রত্যেকে নিজের ভাগ বুঝে পান।
- কোন দলিল আপনার পরিস্থিতিতে আইনি দিক থেকে ঠিক, তা দলিল লেখক বা আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করুন। শুধু খরচ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
৪. না দাবি দলিল করতে কি কি লাগে, ধাপগুলো কী
- ১ওয়ারিশ আর অংশ ঠিক করুনওয়ারিশ সনদ আর জমির হালনাগাদ খতিয়ান দেখে কে কত অংশ পান, তা আগে মিলিয়ে নিন। যে অংশ ছাড়ছেন, দলিলে তার দাগ নম্বর আর পরিমাণ পরিষ্কার লিখতে হবে।
- ২দলিল লেখককে দিয়ে খসড়া করানসাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক খসড়া করবেন। কে দাবি ছাড়ছেন, কার পক্ষে ছাড়ছেন আর কোন জমিতে, তা মিলিয়ে পড়ে নিন।
- ৩খরচ জমা দিনহার তালিকা অনুযায়ী স্ট্যাম্প, নিবন্ধন ফি আর স্থানীয় সরকার করের হিসাব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিশ্চিত করে নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমা দিন।
- ৪সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে সম্পাদনযিনি দাবি ছাড়ছেন, তাঁকে নিজে বা বৈধ প্রতিনিধির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে দলিল সম্পাদনের কথা স্বীকার করতে হয়। বিদেশে থাকলে আমমোক্তারনামার নিয়ম আলাদা, সে বিষয়ে আগে জেনে নিন।
- ৫রশিদ নিন, পরে মূল দলিল তুলুনরেজিস্ট্রির রশিদ যত্ন করে রাখুন। মূল দলিল পরে অফিস থেকে তুলতে হয়, তখন এই রশিদ লাগে।
দলিল লেখকের কাছে যাওয়ার আগে হাতে রাখুন
৫. না দাবি দলিল দিয়ে কি নামজারি করা যায়
নিবন্ধিত না দাবি দলিল একটি রেজিস্ট্রি দলিল, তাই যার পক্ষে দাবি ছাড়া হলো, তিনি ই-নামজারির আবেদনে এটিকে মালিকানার কাগজ হিসেবে দিতে পারেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-মিউটেশন নির্দেশিকায় বলা আছে, দলিলসূত্রে মালিক হলে আবেদনে দলিল নম্বর, দলিলের তারিখ আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম দিতে হয়, আর কাগজ আপলোডের সময় দলিল, খতিয়ান বা ওয়ারিশ সনদ আলাদা করে বেছে দিতে হয়।
ওয়ারিশি জমিতে সাধারণত ওয়ারিশ সনদ আর না দাবি দলিল দুটোই দিতে হবে, কারণ একটি দেখায় আপনি ওয়ারিশ, অন্যটি দেখায় বাকিরা দাবি ছেড়েছেন। আবেদন গ্রহণ হবে কি না, তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস শুনানি আর যাচাইয়ের পর ঠিক করে। নামজারির সরকারি খরচ ভূমি সেবার নির্ধারিত ফি তালিকায় দেওয়া আছে।
কোনো ওয়ারিশ নাবালক হলে তিনি নিজে দলিল সম্পাদন করতে পারেন না। অভিভাবক তাঁর অংশ ছাড়তে পারবেন কি না, সে প্রশ্নে আদালতের অনুমতির বিষয় জড়িত, তাই আগে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৬. না দাবি দলিল কি বাতিল করা যায়
রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর মন বদলালেই না দাবি দলিল বাতিল হয় না। প্রতারণা, ভয় দেখিয়ে সই নেওয়া বা জাল সইয়ের মতো কারণ থাকলে দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা করতে হয়, আর এমন মামলার সময়সীমা সাধারণত দলিলের কথা জানার পর থেকে ৩ বছর। বিস্তারিত আমাদের দলিল বাতিলের মামলা নিয়ে লেখায় আছে। জমির বিরোধে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৭. অনেকে যা জানতে চান
না দাবি দলিল খরচ কত?
না দাবি দলিল দিয়ে কি নামজারি করা যায়?
na dabi dolil ki, স্ট্যাম্পে লিখলেই কি চলে?
না দাবি দলিল কি বাতিল করা যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।