ভূমি ও নামজারি

জমি কেনার আগে কি কি দেখতে হয়: খতিয়ান, নামজারি, খাজনা, দলিলের ২৫ বছরের ইতিহাস আর দখল

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
জমি কেনার আগে কি কি দেখতে হয়: খতিয়ান, নামজারি, খাজনা, দলিলের ২৫ বছরের ইতিহাস আর দখল

সংক্ষেপে

জমি কেনার আগে চারটি জিনিস মিলিয়ে নিন: বিক্রেতার নামে হালনাগাদ খতিয়ান বা নামজারি, হালনাগাদ খাজনার দাখিলা, অন্তত ২৫ বছরের মালিকানার ধারাবাহিক দলিল, আর জমিটা আসলে কার দখলে। রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী এসব তথ্য দলিলে না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলই নিবন্ধন করবেন না।

খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, নামজারি আর খাজনার তথ্য এখন অনলাইনে দেখা যায়। পুরোনো দলিলের নকল তুলতে হয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে। কাগজে অমিল বা মামলার আভাস পেলে টাকা দেওয়ার আগে এসি ল্যান্ড অফিস বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের খতিয়ান ও ম্যাপ সেবা

মৌজা আর খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে রেকর্ড আর ম্যাপ দেখা যায়।

খতিয়ান খুঁজুন
এই লেখায়
  1. আইন যা দেখতে বলে: ধারা ৫২ক
  2. অনলাইনে যা নিজেই মিলিয়ে নেবেন
  3. দলিলের ২৫ বছরের ধারাবাহিকতা
  4. সরেজমিন দখল আর মামলার খোঁজ
  5. বায়না থেকে রেজিস্ট্রি পর্যন্ত
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. আইন যা দেখতে বলে: ধারা ৫২ক

রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রয় দলিলের সঙ্গে কয়েকটি তথ্য যুক্ত না থাকলে নিবন্ধন হবে না। ২০২৬ সালের সংশোধনে হেবা আর দানের দলিলেও একই শর্ত যোগ হয়েছে, কার্যকর ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে। ক্রেতার জন্য এই তালিকাটাই যাচাইয়ের সবচেয়ে ভালো শুরু।

দলিলের সঙ্গে যা থাকতেই হবে

২. অনলাইনে যা নিজেই মিলিয়ে নেবেন

  • ১
    খতিয়ান আর দাগবিক্রেতার কাছ থেকে মৌজা, খতিয়ান আর দাগ নম্বর নিন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের খতিয়ান সেবায় খুঁজে দেখুন রেকর্ডে কার নাম, অংশ কত আর জমির শ্রেণি কী। বিক্রেতা যত শতক বেচতে চান, তাঁর অংশ তত আছে কি না হিসাব করুন।
  • ২
    নামজারি হয়েছে কি নারেকর্ডে আগের মালিকের নাম থাকলে দেখুন বিক্রেতার নামে নামজারি হয়েছে কি না। নামজারি খতিয়ানের কপি চেয়ে নিন, আর ই-নামজারির পোর্টালে আবেদনের অবস্থা মিলিয়ে নিন।
  • ৩
    খাজনা হালনাগাদ কি নাভূমি উন্নয়ন কর পোর্টালে হোল্ডিংটি বিক্রেতার নামে আছে কি না আর বকেয়া আছে কি না দেখুন। বিক্রেতার কাছ থেকে চলতি বছরের দাখিলা চেয়ে নিন, বকেয়া থাকলে রেজিস্ট্রির আগেই পরিশোধ করাতে বলুন।
  • ৪
    মৌজা ম্যাপে জমির অবস্থানমৌজা ম্যাপে দাগটি খুঁজে দেখুন রাস্তা, খাল বা সরকারি জমির সঙ্গে সীমানা কেমন। দেখানো জমি আর ম্যাপের দাগ এক কি না, এখানেই অনেক প্রতারণা ধরা পড়ে।
রেকর্ড মানেই মালিকানার শেষ কথা নয়

খতিয়ানে নাম থাকার পরও কেউ জমিটা আগে বিক্রি করে থাকতে পারেন, আর সেই দলিলের নামজারি হয়তো হয়নি। তাই খতিয়ানের পাশাপাশি দলিলের ধারাবাহিকতাও মেলাতে হয়।

৩. দলিলের ২৫ বছরের ধারাবাহিকতা

বিক্রেতা কীভাবে মালিক হলেন, সেই সূত্র ধরে পেছনের দলিলগুলো দেখুন: কার কাছ থেকে কিনেছেন, তিনি কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ আর বণ্টননামা দেখুন, সব ওয়ারিশ রাজি কি না জানুন। মূল দলিল দেখার পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি দিয়ে দলিলের নকল তুলে মিলিয়ে নিলে জাল দলিলের ঝুঁকি কমে।

  • দলিলে লেখা দাগ, খতিয়ান আর পরিমাণ রেকর্ডের সঙ্গে মেলে কি না
  • একই দাগের অংশ আগে কাউকে বিক্রি হয়েছে কি না, তল্লাশিতে দেখা যায়
  • জমিটি ব্যাংকে বন্ধক আছে কি না, বিক্রেতার কাছে লিখিত জেনে নিন
  • আমমোক্তারনামায় বিক্রি হলে মূল মালিকের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিবন্ধিত ও বহাল কি না
  • শরিকি জমি হলে অন্য শরিকেরা পরে অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন কি না

৪. সরেজমিন দখল আর মামলার খোঁজ

কাগজ ঠিক থাকলেও জমিতে গিয়ে দেখুন কে দখলে আছেন, সীমানা খুঁটি কোথায়, প্রতিবেশীরা কী বলেন। আমিন দিয়ে মাপ করিয়ে নিন। দখল নিয়ে বিরোধ বা আদালতে মামলা চললে জমি কিনে আপনিও সেই বিরোধে জড়িয়ে পড়বেন।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর ধারা ৪ অনুযায়ী অন্যের জমি নিজের বলে প্রচার করা, তথ্য গোপন করে হস্তান্তর করা বা নিজের অংশের বেশি জমি বিক্রি করা প্রতারণার অপরাধ, শাস্তি অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। পুরো দাম দেওয়ার পরও বিক্রেতা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া দখল না দিলে ধারা ৯ অনুযায়ী অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।

৫. বায়না থেকে রেজিস্ট্রি পর্যন্ত

রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭ক অনুযায়ী জমি বিক্রির চুক্তি বা বায়নানামা লিখিত হতে হয় এবং নিবন্ধন করাতে হয়। ২০২৬ সালের সংশোধনে চুক্তি সম্পাদনের পর নিবন্ধনের জন্য দাখিলের সময় ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৬০ দিন করা হয়েছে। মুখের কথায় বা সাদা কাগজে বায়নার টাকা দেবেন না।

টাকা দেওয়ার আগে শেষবার

৬. অনেকে যা জানতে চান

নাম দিয়ে কি জমির মালিকানা খোঁজা যায়?
খতিয়ান সেবায় সাধারণত মৌজা ঠিক করে খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজতে হয়। তাই বিক্রেতার কাছ থেকে মৌজা আর দাগ নম্বর আগে নিয়ে নিন।
বিক্রেতার নামে নামজারি নেই, কিন্তু বাবার নামে রেকর্ড আছে। কেনা যাবে?
ধারা ৫২ক অনুযায়ী উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে পূর্বসূরির নামের খতিয়ান দিয়ে দলিল হতে পারে। তবে সব ওয়ারিশের অংশ আর সম্মতি পরিষ্কার না হলে পরে বিরোধ হয়। আগে ওয়ারিশদের বণ্টন আর নামজারি করিয়ে নেওয়া নিরাপদ।
জমি কিনতে কি টিন বা রিটার্ন লাগে?
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি বিক্রয় বা বায়নানামা নিবন্ধনে আয়কর আইনের ধারা ২৬৪ অনুযায়ী রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগে। ইউনিয়নের জমিতে এই শর্ত নেই।
বিক্রেতা দলিল করার পরও দখল দিচ্ছেন না, কী করব?
ভূমি অপরাধ আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী পুরো দাম দেওয়ার পর যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া দখল না দেওয়া অপরাধ। কোন আদালতে কী প্রতিকার চাইবেন, তা ঠিক করতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৯ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন