
সংক্ষেপে
নামজারি ছাড়া জমি বিক্রি করা যায় কি না, তা নির্ভর করে জমিটা আপনার হাতে কীভাবে এসেছে তার ওপর। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৫২ক ধারা বলছে, জমি কিনে বা দান পেয়ে মালিক হলে বিক্রির দলিলের সঙ্গে আপনার নিজের নামে সর্বশেষ খতিয়ান দিতে হবে। তাই কেনা জমি নামজারি না করে আবার বিক্রি করতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল নেবেন না।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির বেলায় আইন একটু ছাড় দিয়েছে। বিক্রেতা বা তাঁর পূর্বসূরির, অর্থাৎ বাবা বা মায়ের নামে সর্বশেষ খতিয়ান থাকলেও দলিল হতে পারে। তবে নিজের অংশের বেশি বিক্রি করলে, বা অন্য ওয়ারিশদের না জানিয়ে পুরো জমি বেচলে, ভূমি অপরাধ আইনে শাস্তির ঝুঁকি আছে।
খতিয়ান দেখা আর ই-নামজারির আবেদন এখান থেকেই শুরু হয়।
এই লেখায়
১. নামজারি ছাড়া কি জমি বিক্রি করা যায়: আইন কী বলে
জমি বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রি করেন সাব-রেজিস্ট্রার। ২০০৪ সালে রেজিস্ট্রেশন আইনে যোগ হওয়া ৫২ক ধারায় বলা আছে, কয়েকটি তথ্য আর কাগজ দলিলের সঙ্গে না থাকলে তিনি বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না। ২০২৬ সালের এক অধ্যাদেশে হেবা ও দানের দলিলেও একই শর্ত টানা হয়েছে।
| আপনি জমির মালিক হয়েছেন যেভাবে | দলিলের সঙ্গে কোন খতিয়ান লাগবে | বিক্রির আগে নামজারি লাগবে কি |
|---|---|---|
| কিনে বা দান-হেবা পেয়ে | আপনার নিজের নামে সর্বশেষ খতিয়ান | হ্যাঁ, নামজারি করে নিজের নামে খতিয়ান খুলতে হবে |
| উত্তরাধিকার সূত্রে | আপনার নামে, অথবা বাবা-মা বা অন্য পূর্বসূরির নামে সর্বশেষ খতিয়ান | আইনে বাধ্যতামূলক নয়, তবে অংশ নিয়ে বিরোধ এড়াতে করে নেওয়াই ভালো |
খতিয়ান ছাড়াও ৫২ক ধারায় আরও কয়েকটি জিনিস চাওয়া হয়েছে: জমির ধরন, দাম, চৌহদ্দিসহ নকশা, গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, আর বিক্রেতার হলফনামা যে তিনি জমিটা আগে কাউকে হস্তান্তর করেননি এবং তাঁর বৈধ স্বত্ব আছে।
গ্রামে অনেকে নামজারিকে খারিজ বা জমা খারিজ বলেন। আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম তোলাই নামজারি, ইংরেজিতে Mutation।
২. ওয়ারিশ সম্পত্তি নামজারি ছাড়া বিক্রি: যেখানে মানুষ বেশি বিপদে পড়েন
ধরুন, বাবার নামে ৬০ শতাংশ জমির খতিয়ান। তিনি মারা গেছেন, ওয়ারিশ মা, দুই ভাই আর এক বোন। বড় ভাই একা ক্রেতার কাছে পুরো ৬০ শতাংশ বিক্রির কথা পাকা করলেন। আইনে বাবার নামের খতিয়ান দিয়ে দলিল হওয়ার সুযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু বড় ভাই বিক্রি করতে পারেন কেবল নিজের অংশটুকু।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৪ ধারায় অন্যের জমি হস্তান্তরের ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও হস্তান্তর করা, জমির তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা বিবরণের দলিলে সই করাকে অপরাধ ধরা হয়েছে। শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা। অন্য ওয়ারিশের অংশ না জানিয়ে বেচে দেওয়া এই ঝুঁকিতে পড়ে।
- দলিলে নিজের অংশ কতটা, তা ওয়ারিশ সনদ আর মুসলিম বা প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইনের হিসাব মিলিয়ে লিখুন।
- ভাই-বোনেরা মিলে আগে বণ্টননামা দলিল করলে কার ভাগে কোন দাগের কতটা, তা পরিষ্কার থাকে। ক্রেতাও তখন নিশ্চিন্তে কেনেন।
- ডেইলি স্টারের আগস্ট ২০২৬-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপনে ওয়ারিশসূত্রে নামজারিতে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে দিয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছে। বণ্টন না হলে সবার নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে ওঠে, বণ্টননামা থাকলে পৃথক নামজারি হয়।
৩. নামজারি ছাড়া কি দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়, আর খাজনা দেওয়া যায় কি
ক্রেতার দিক থেকে প্রশ্নটা উল্টো। দলিল রেজিস্ট্রির সময় শর্তটা বিক্রেতার খতিয়ান নিয়ে, ক্রেতার নামজারি নিয়ে নয়। তাই কেনার দলিল রেজিস্ট্রি হয় নামজারির আগেই। কিন্তু দলিল হাতে পেয়ে বসে থাকলে পরে আপনিই আটকাবেন, কারণ জমিটা আবার বেচতে গেলে তখন নিজের নামে খতিয়ান লাগবে।
খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ হয় খতিয়ান ধরে। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৬ ধারা বলছে, উত্তরাধিকার বা অন্য হস্তান্তরে মালিক একাধিক হলে এবং তাঁরা পৃথক নামজারি না করলে জমিটা একই খতিয়ানভুক্ত ধরে কর ঠিক হবে। খতিয়ানে অংশ আলাদা লেখা না থাকলে বণ্টননামা আর তার ভিত্তিতে নামজারি করে তবেই আলাদা কর নির্ধারণ হয়।
সহজ কথায়, ওয়ারিশরা বাবার খতিয়ানেই একসঙ্গে খাজনা দিতে পারেন। কিন্তু কেনা জমির খাজনা নিজের নামে দিতে আর দাখিলায় নিজের নাম দেখতে চাইলে নামজারিই পথ।
৪. ক্রেতা হলে কেনার আগে যা মিলিয়ে নেবেন
বিক্রেতা নামজারি করেননি, তবু দলিল করতে চাইছেন, এমন প্রস্তাব পেলে আগে দেখুন জমিটা তাঁর হাতে কীভাবে এসেছে। কেনা জমি হলে বিক্রেতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রারের দলিল নেওয়ারই কথা নয়, তাই নামজারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা দেবেন না।
- ওয়ারিশি জমি হলে ওয়ারিশ সনদে মোট কতজন ওয়ারিশ, আর বিক্রেতার অংশ কতটা, মিলিয়ে নিন।
- দলিলে লেখা ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণ আগের দলিল আর পুরোনো খতিয়ানের সঙ্গে মেলে কি না দেখুন।
- সব ওয়ারিশ একসঙ্গে বিক্রি করলে প্রত্যেকে দলিলে সই করছেন কি না নিশ্চিত হোন।
- দলিল রেজিস্ট্রির পর দেরি না করে নিজের নামে নামজারির আবেদন করুন।
৫. বিক্রির আগে বিক্রেতা যা করবেন
- ১সর্বশেষ খতিয়ান খুঁজে দেখুনভূমিসেবা পোর্টালে মৌজা, খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে দেখুন খতিয়ানটা কার নামে। কেনা জমি হলে আপনার নাম না থাকলে আগে নামজারি।
- ২নামজারির আবেদন করুনকেনা জমির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি দলিল, আগের মালিকের খতিয়ান আর NID দিয়ে ই-নামজারির আবেদন করুন। ওয়ারিশি হলে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে দিন, সঙ্গে ওয়ারিশ সনদ।
- ৩ওয়ারিশদের মধ্যে অংশ ঠিক করুনএকাধিক ওয়ারিশ থাকলে কে কতটা পাবেন তা লিখিতভাবে ঠিক করুন, সম্ভব হলে বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করে নিন।
- ৪২৫ বছরের মালিকানার কাগজ সাজানআগের দলিল (বায়া দলিল), পুরোনো খতিয়ান আর নামজারির কাগজ মিলিয়ে মালিকানার ধারাবাহিকতা লিখে রাখুন। দলিলে এই বিবরণ দিতে হয়।
- ৫দলিল লেখকের কাছে যানখতিয়ান, নকশা আর হলফনামার তথ্য নিয়ে দলিল প্রস্তুত করুন। জমির দাম ও দাগ নম্বর দলিলে ঠিকঠাক আছে কি না নিজে পড়ে দেখুন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার আগে হাতে রাখুন
৬. অনেকে যা জানতে চান
নামজারি ছাড়া কি জমি বিক্রি করা যায়?
ওয়ারিশ সম্পত্তি নামজারি ছাড়া বিক্রি করা যাবে কি?
নামজারি ছাড়া কি দলিল রেজিষ্ট্রেশন হয়?
নামজারি ছাড়া কি খাজনা দেওয়া যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।