
সংক্ষেপে
শরিকি জমির কোনো অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি হলে, যিনি উত্তরাধিকার সূত্রে ওই জোতের শরিক, তিনি আদালতে আবেদন করে বিক্রি হওয়া অংশটা নিজে কিনে নিতে পারেন। এটাই অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন, যার বিধান রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৯৬-এ।
আবেদন করতে হয় বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে, নোটিশ না পেলে বিক্রির কথা জানার ২ মাসের মধ্যে। তবে দলিল রেজিস্ট্রির ৩ বছর পেরোলে আর আবেদন চলে না। আবেদনের সময়ই আদালতে জমা দিতে হয় দলিলে লেখা দাম, তার ২৫% ক্ষতিপূরণ, আর দলিল সম্পাদনের দিন থেকে আবেদনের দিন পর্যন্ত দামের ওপর বছরে ৮% সরল সুদ। বসতবাড়ির জমিতে এই ধারা খাটে না।
বিক্রির দলিলের তারিখ আর দাম জানতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সার্টিফায়েড কপি তুলুন, শরিকানা দেখাতে খতিয়ান লাগবে।
এই লেখায়
১. অগ্রক্রয় কখন আসে
একই জোত বা খতিয়ানে কয়েকজন শরিক থাকলে, তাঁদের কেউ নিজের অংশ বাইরের লোকের কাছে বেচে দিতে পারেন। আইন এখানে বাকি শরিকদের একটা সুযোগ দিয়েছে, যাতে অপরিচিত কেউ জমিতে ঢুকে না পড়ে। শর্ত হলো, ক্রেতা ওই জোতের শরিক নন।
একই আইনের ধারা ৮৯ অনুযায়ী এমন বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রির সময় যেসব শরিক বিক্রির পক্ষ নন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়, আর নোটিশের কপি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে টানানো হয়। নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি তালিকায় অগ্রক্রয় প্রযোজ্য হলে প্রতি শরিকের নোটিশের জন্য ৫ টাকা কোর্ট ফি ধরা আছে। এই নোটিশ হাতে পাওয়ার দিন থেকেই আপনার সময় গোনা শুরু।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শরিকি জমির অংশ কিনলে বাকি উত্তরাধিকারী শরিকেরা আইনের সময়সীমার মধ্যে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে পারেন, আর দলিল রেজিস্ট্রির পর ৩ বছর পর্যন্ত এই ঝুঁকি থাকে। রেজিস্ট্রির সময় শরিকদের নোটিশ ঠিকমতো দেওয়া হলো কি না দেখে নিন, কারণ নোটিশ জারির ২ মাস পর তাঁদের আবেদনের সুযোগ ফুরিয়ে যায়।
২. কে আবেদন করতে পারেন, কে পারেন না
- পারবেন: যিনি উত্তরাধিকার সূত্রে ওই জোতের শরিক, এবং ধারা ৯০ অনুযায়ী যাঁর কাছে জমি বিক্রি করা আইনত চলে।
- পারবেন না: শুধু কিনে শরিক হয়েছেন এমন কেউ। আইনে স্পষ্ট শর্ত, আবেদনকারীকে উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক হতে হবে।
- খাটে না: বসতবাড়ির জমিতে ধারা ৯৬ প্রযোজ্য নয়।
- খাটে না: ক্রেতা নিজেই ওই জোতের শরিক হলে।
- খাটে না: প্রজাস্বত্ব (সংশোধন) আইন, ২০০৬ কার্যকর হওয়ার আগের হস্তান্তর বা আবেদনে।
মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের যে অধিকার আছে, ধারা ৯৬ তা কেড়ে নেয়নি। আর শহরের অকৃষি জমির অগ্রক্রয় চলে আলাদা আইনে, অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯-এর ধারা ২৪-এ, যেখানে শর্ত ও সময়ের নিয়ম ভিন্ন। আপনার জমি কোন আইনে পড়বে, আইনজীবীর সঙ্গে খতিয়ান দেখে ঠিক করুন।
৩. কত দিনের মধ্যে করতে হয়
| পরিস্থিতি | আবেদনের শেষ সময় |
|---|---|
| ধারা ৮৯-এর নোটিশ পেয়েছেন | নোটিশ জারির তারিখ থেকে ২ মাস |
| নোটিশ পাননি | বিক্রির কথা জানার তারিখ থেকে ২ মাস |
| যেকোনো অবস্থায় | বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৩ বছর পেরোলে আর আবেদন চলবে না |
| অন্য শরিক মূল আবেদনে যোগ দিতে চাইলে | ওপরের সময়সীমার মধ্যে, অথবা আদালতের নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে, যেটি আগে আসে |
যে শরিক মূল আবেদন বা যোগ দেওয়ার আবেদন কোনোটাই করেননি, ধারা ৯৬ অনুযায়ী পরে আর তাঁর কেনার অধিকার থাকে না। তাই নোটিশ এলে ফেলে রাখবেন না।
৪. আদালতে কত টাকা জমা দিতে হয়
আবেদনের সঙ্গেই পুরো টাকা জমা না দিলে আবেদন খারিজ হয়ে যায় (ধারা ৯৬ এর উপ-ধারা ৩)। জমা দিতে হয় তিনটি অঙ্ক:
- নোটিশে বা বিক্রির দলিলে লেখা দাম।
- সেই দামের ২৫% ক্ষতিপূরণ।
- দলিল সম্পাদনের তারিখ থেকে আবেদনের তারিখ পর্যন্ত দামের ওপর বছরে ৮% সরল সুদ।
উদাহরণ: দলিলে দাম ৫,০০,০০০ টাকা, আর দলিল সম্পাদনের ঠিক এক বছর পর আবেদন করছেন। ক্ষতিপূরণ ১,২৫,০০০ টাকা, সুদ ৪০,০০০ টাকা। মোট ৬,৬৫,০০০ টাকা জমা দিতে হবে। এর বাইরে বিক্রির পর ক্রেতা খাজনা বা জমির উন্নয়নে কিছু খরচ করে থাকলে, শুনানির পর আদালত আরও টাকা জমা দিতে বলতে পারেন।
৫. মামলা থেকে রায় পর্যন্ত ধাপ
- ১দলিল আর খতিয়ান জোগাড় করুনসাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিক্রির দলিলের সার্টিফায়েড কপি নিন, যাতে দাম, সম্পাদন আর রেজিস্ট্রির তারিখ থাকে। উত্তরাধিকার সূত্রে শরিকানা দেখাতে খতিয়ান আর ওয়ারিশ সনদ রাখুন।
- ২সঠিক আদালতে আবেদন করুনওই জমির দখলের মামলা যে আদালতে চলত, সেখানেই আবেদন করতে হয়। ক্রেতা আর উত্তরাধিকার সূত্রে বাকি সব শরিককে পক্ষ করতে হয়।
- ৩টাকা জমা দিনদাম, ২৫% ক্ষতিপূরণ আর ৮% সুদ একসঙ্গে আদালতে জমা দিন। জমার রসিদ মামলার নথিতে থাকবে।
- ৪শুনানিতে হাজির থাকুনআদালত ক্রেতাকে নোটিশ দিয়ে জানতে চাইবেন বিক্রির পর তিনি খাজনা, দায়মুক্তি বা উন্নয়নে কত খরচ করেছেন। প্রয়োজনে বাড়তি টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে।
- ৫রায়ের পর দলিল নিনআবেদন মঞ্জুর হলে আদালত ক্রেতাকে ৬০ দিনের মধ্যে আপনার নামে বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দিতে বলবেন, এই রেজিস্ট্রিতে কোনো কর, শুল্ক বা ফি লাগে না। ক্রেতা না করলে পরের ৬০ দিনের মধ্যে আদালত নিজেই দলিল সম্পাদন করে রেজিস্ট্রিতে দেবেন।
- ৬দখল আর নামজারিদলিল রেজিস্ট্রির পর আদালতে আবেদন করে দখল বুঝে নিতে পারেন। তারপর নতুন দলিল দিয়ে নামজারি করান।
এই আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ দেওয়ানি আপিল আদালতে আপিল করা যায় (উপ-ধারা ১৫)। আবেদন মঞ্জুরের ফলে বিক্রির পর জমিতে তৈরি হওয়া দায় মুছে যায়, তবে একাধিক শরিকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া মানেই জোত বিভাজন নয় (উপ-ধারা ১১ ও ১৩)।
অগ্রক্রয় আদালতের মামলা। কোর্ট ফি, আদালতের এখতিয়ার আর জমিটা বসতবাড়ি না কৃষিজমি, এসব প্রশ্নে ভুল হলে আবেদন খারিজ হতে পারে। জমা দেওয়ার আগে একজন দেওয়ানি আইনজীবীর সঙ্গে কাগজ মিলিয়ে নিন, আর রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে যান।
৬. অনেকে যা জানতে চান
অগ্রক্রয় মামলা কতদিনের মধ্যে করতে হয়?
কিনে শরিক হয়েছি, আমি কি অগ্রক্রয় মামলা করতে পারব?
অগ্রক্রয়ে জমি পেলে নতুন দলিলের রেজিস্ট্রি খরচ কে দেবে?
ক্রেতা হিসেবে আমার খরচের টাকা কি ফেরত পাব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।