
সংক্ষেপে
কৃষি জমিতে বাড়ি করা যাবে, তবে আগে অনুমতি নিয়ে। জাতীয় সংসদ ৯ এপ্রিল ২০২৬ যে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল ২০২৬ পাস করেছে, বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাতে জমির মালিক নিজের কৃষিজমিতে বসতবাড়ি, উপাসনালয়, পারিবারিক পুকুর বা ছোট কুটির শিল্পের মতো প্রয়োজনীয় স্থাপনা করতে পারবেন, শর্ত মেনে ও পূর্বানুমোদন নিয়ে।
দুই ফসলি, তিন ফসলি বা বহু ফসলি জমি আর বিশেষ কৃষি এলাকা অকৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না, শুধু জাতীয় প্রয়োজনের কঠোর শর্তে ব্যতিক্রম। অনুমতি কার কাছে নেবেন আর কোন কাগজ লাগবে, তা বিধিমালায় ঠিক হওয়ার কথা, তাই কাজ শুরুর আগে উপজেলা ভূমি অফিসে জেনে নিন।
আইন, বিধিমালা আর নতুন প্রজ্ঞাপন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাইটে প্রকাশ হয়।
এই লেখায়
১. কৃষি জমি সুরক্ষা আইন ২০২৬: কবে, কীভাবে এল
প্রথমে এটি এসেছিল অধ্যাদেশ হিসেবে। বাসসের ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ১৯ জানুয়ারি 'ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬' জারি করেন। নতুন সংসদ বসার পর ভূমিমন্ত্রী ৬ এপ্রিল বিলটি উত্থাপন করেন, আর ৯ এপ্রিল কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়।
পাস হওয়া বিল আগের অধ্যাদেশটি বাতিল করেছে, তবে অধ্যাদেশের অধীনে যা করা হয়েছে তা বৈধ থাকবে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি, এই তিন পার্বত্য জেলা বাদে সারা দেশের জমি এই আইনের আওতায়।
| তারিখ | যা হয়েছে |
|---|---|
| ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | অধ্যাদেশ জারি |
| ৬ এপ্রিল ২০২৬ | সংসদে বিল উত্থাপন |
| ৯ এপ্রিল ২০২৬ | সংসদে বিল পাস, অধ্যাদেশ বাতিল |
২. কৃষি জমিতে বাড়ি করা যাবে কি
হ্যাঁ, তবে নিজে থেকে নয়। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমির মালিক নিজের কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় স্থাপনা করতে পারবেন, যেমন বসতবাড়ি, উপাসনালয়, পারিবারিক পুকুর বা ছোট কুটির শিল্প। এর জন্য আগে অনুমোদন নিতে আর শর্ত মানতে হবে।
জানুয়ারির অধ্যাদেশেও প্রায় একই কথা ছিল: নিজের কৃষিজমিতে বসতবাড়ি, উপাসনালয় বা পারিবারিক কবরস্থান করা যাবে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুমতি নিয়ে। কিন্তু বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্প, রিসোর্ট, শিল্পকারখানা কৃষিজমি, জলাধার বা জলাভূমিতে করা যাবে না।
- নিজের বসবাসের বাড়ি: পূর্বানুমতি নিয়ে করা যায়
- মসজিদ, মন্দির বা অন্য উপাসনালয়: পূর্বানুমতি নিয়ে
- পারিবারিক পুকুর বা ছোট কুটির শিল্প: পূর্বানুমতি নিয়ে
- আবাসন ব্যবসা, প্লট প্রকল্প, রিসোর্ট বা কারখানা: কৃষিজমিতে নয়
- দুই বা তার বেশি ফসলি জমি আর বিশেষ কৃষি এলাকা: অকৃষি কাজে নিষেধ, জাতীয় প্রয়োজনের কঠোর ব্যতিক্রম ছাড়া
খতিয়ানে জমির শ্রেণি কী লেখা আছে আর জমিটি কয় ফসলি, দুটোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জমির অবস্থা উপজেলা ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তরে মিলিয়ে নিন, তারপর অনুমতির আবেদন করুন।
৩. অনুমতি নেবেন যেভাবে: এখন যা করা যায়
আইন পাস হলেও অনুমতির আবেদন কোন দপ্তরে, কোন ফরমে আর কত দিনে নিষ্পত্তি হবে, তা বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়নি। এসব সাধারণত বিধিমালায় আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী সুরক্ষিত জমির তালিকা তৈরি আর অবৈধ রূপান্তর ঠেকানোর দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের।
- ১খতিয়ান আর দাগ নম্বর বের করুনযে জমিতে বাড়ি করতে চান, তার হালনাগাদ খতিয়ান, দাগ নম্বর আর জমির শ্রেণি অনলাইনে বা ভূমি অফিস থেকে নিয়ে রাখুন।
- ২খাজনা আর নামজারি হালনাগাদ রাখুনজমি আপনার নামে নামজারি করা আর ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা থাকলে মালিকানা প্রমাণ সহজ হয়।
- ৩উপজেলা ভূমি অফিসে জিজ্ঞেস করুনসহকারী কমিশনার (ভূমি) বা ইউএনও অফিসে গিয়ে জানতে চান, এই আইনে বসতবাড়ির অনুমতির আবেদন কোথায় ও কীভাবে নেওয়া হচ্ছে।
- ৪লিখিত অনুমতি হাতে পেয়ে কাজ শুরু করুনমুখের কথায় নির্মাণ শুরু করবেন না। অনুমতিপত্র বা আদেশের কপি রেখে দিন, পরে অভিযোগ উঠলে এটিই আপনার সুরক্ষা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ১৬১২২-এ ফোন করেও জমির সেবা নিয়ে তথ্য নেওয়া যায়। বিরোধ বা দলিল নিয়ে প্রশ্ন থাকলে এসি ল্যান্ড অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৪. জোনিং ম্যাপ: আপনার জমি কোন অঞ্চলে পড়ল
আইনটির মূল ভিত্তি জমির অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন বা জোনিং। বাসসের ইংরেজি প্রতিবেদন অনুযায়ী ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ছবি আর মাঠ যাচাই করে জোনিং ম্যাপ তৈরি হবে। একসঙ্গে সারা দেশে বা ধাপে ধাপে চালু হতে পারে।
খসড়া ম্যাপ প্রকাশের পর নাগরিকেরা ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপত্তি বা মতামত দিতে পারবেন, আর ম্যাপ প্রতি ১০ বছরে হালনাগাদ হবে। আপনার এলাকার খসড়া ম্যাপ প্রকাশ হলে নিজের দাগগুলো কোন অঞ্চলে পড়ল দেখে নিন। ভুল মনে হলে ওই সময়ের মধ্যেই আপত্তি দিন।
মোট কৃষিজমির সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অকৃষি কাজে ব্যবহারের সীমাও রাখা হয়েছে। সরকারি আর বেসরকারি সব উন্নয়ন প্রকল্পকেই এই আইন মানতে হবে, অর্থাৎ রাস্তা, কারখানা বা আবাসন প্রকল্পের জন্য জমি বাছাইয়েও এখন জোন দেখতে হবে। তিন বা তার বেশি ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধ, এক বা দুই ফসলি জমিতে ধীরে ধীরে সীমিত করা হবে।
৫. অনুমতি ছাড়া বাড়ি বা মাটি কাটলে শাস্তি কী
পাস হওয়া আইনে অনুমতি ছাড়া ভূমির ব্যবহার বদল বা অবৈধ নির্মাণ দণ্ডনীয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী কিছু অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা দুটোই। জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশও হতে পারে। কোম্পানি অপরাধ করলে জানুয়ারির অধ্যাদেশে পরিচালক বা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার কথা ছিল, পাস হওয়া আইনে শাস্তির পুরো তালিকা গেজেট প্রকাশের পর মিলিয়ে নিন।
ইটভাটার জন্য উপরিভাগের মাটি কাটা, জলাধার ও জলাভূমি ভরাট, পাহাড় কাটা আর বনের ক্ষতি করা কাজ নিষিদ্ধ। মামলা চলবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে, আর মোবাইল কোর্টও আইনটি প্রয়োগ করতে পারবে।
কৃষিজমি প্লট আকারে বিক্রি করে ক্রেতাকে বাড়ি করার আশ্বাস দিলে পরে দুপক্ষই বিপদে পড়তে পারেন। কেনাবেচার আগে জমির শ্রেণি আর জোন মিলিয়ে নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
কৃষি জমিতে বাড়ি করা যাবে কি?
কৃষি জমি সুরক্ষা আইন ২০২৬ কবে পাস হয়েছে?
নাল জমিতে কি বাড়ি করা যায়?
অনুমতি ছাড়া কৃষিজমিতে স্থাপনা করলে কী হবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।