
সংক্ষেপে
জমি বিক্রি, দান বা হেবার দলিল রেজিস্ট্রি হয় সেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে, যার এলাকায় জমির বেশির ভাগ অংশ পড়েছে। রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী দলিলের সঙ্গে বিক্রেতা বা দাতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান, জমির ধরন ও মূল্য, চৌহদ্দিসহ নকশা, গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ আর দাতার হলফনামা না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি-ফ্ল্যাট হস্তান্তরে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণও লাগে। দলিল সম্পাদনের ৩ মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রির জন্য জমা দিতে হয়, আর বায়নানামা রেজিস্ট্রির সময় ২০২৬ সাল থেকে ৬০ দিন।
ফি ও করের সরকারি তালিকা, হস্তান্তর দলিলের নমুনা ফরম, চালান ফরম আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তালিকা এখানে।
এই লেখায়
১. জমি রেজিস্ট্রি করতে কি কি কাগজ লাগে
বিক্রয়, দান বা হেবা দলিলের ক্ষেত্রে কোন তথ্য দলিলে থাকতে হবে আর কোন কাগজ সঙ্গে জুড়তে হবে, তা রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৫২ক-তে বলা আছে। ২০২৬ সালের সংশোধনে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ব্যক্তিগত আইনের দান বা হেবার ঘোষণাও এই ধারার আওতায় এসেছে।
দলিলের সঙ্গে যা থাকতে হবে
এর বাইরে, এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রি, লিজ, হস্তান্তর, বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধনে রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) দেখাতে হয়। ইউনিয়ন এলাকার জমির ক্ষেত্রে এই তালিকায় কিছু বলা নেই, তবু অফিসে আগে জেনে নিন।
দলিল সম্পাদনকারী হিসেবে যাঁরা হাজির হন, আইন অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রারকে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হতে হয়। তাই ক্রেতা আর বিক্রেতা দুজনেই জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিন। শহরের জমি হলে ক্রেতা নিজের রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপত্রও রাখুন।
২. দলিল রেজিস্ট্রেশনের ধাপ: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যা হয়
- ১কাগজ মিলিয়ে নিনবিক্রেতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান আর আগের মালিকদের দলিল দেখে ২৫ বছরের মালিকানার ধারা মেলান। দরকার হলে আগের দলিলের নকল তুলে নিন।
- ২দলিল লেখাননিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে হস্তান্তর দলিলের নমুনা ফরম আছে। লাইসেন্সধারী দলিল লেখককে দিয়ে সেই ছকে দলিল তৈরি করান, তফসিলে দাগ, খতিয়ান আর মৌজার তথ্য খতিয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
- ৩ফি ও কর জমা দিন২০২৬ সালের সংশোধন অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রির সব ফি, কর, সার্ভিস চার্জ ও শুল্ক দলিল জমা দেওয়ার সময়ই পরিশোধ করতে হয়। কোন খাতে কত টাকা, কীভাবে জমা হবে, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে লিখিতভাবে জেনে নিন।
- ৪ঠিক অফিসে দলিল জমা দিনজমির বেশির ভাগ অংশ যে সাব-রেজিস্ট্রারের এলাকায়, দলিল সেখানেই জমা দিতে হয়। দলিলের দাতা, গ্রহীতা বা আমমোক্তারনামা পাওয়া প্রতিনিধি দলিল জমা দিতে পারেন।
- ৫সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে হাজির হোনদলিলে যাঁরা সই করেছেন, তাঁদের নিজে বা বৈধ প্রতিনিধির মাধ্যমে হাজির হতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রার জানতে চাইবেন দলিল আপনারা সম্পাদন করেছেন কি না, আর পরিচয় যাচাই করবেন।
- ৬রসিদ নিনদলিল জমা নেওয়ার সময় তাতে দিন, সময়, স্থান আর জমাদাতার সই লেখা হয়, আর জমাদাতাকে একটি রসিদ দেওয়া হয়। মূল দলিল ফেরত পেতে এই রসিদই লাগবে।
৩. সময়সীমা: বায়না থেকে আপিল পর্যন্ত
| কাজ | সময় | আইনের ভিত্তি |
|---|---|---|
| বায়নানামা লিখিত করে রেজিস্ট্রির জন্য জমা | সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে (আগে ছিল ৩০ দিন) | ধারা ১৭ক, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর |
| সম্পাদিত দলিল রেজিস্ট্রির জন্য জমা | সম্পাদনের ৩ মাসের মধ্যে | ধারা ২৩ |
| রেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল নিষ্পত্তি | আপিল দায়েরের ৪৫ দিনের মধ্যে | ২০২৬ সালের সংশোধন, ধারা ৭২ |
| রেজিস্ট্রারের কাছে করা আবেদন নিষ্পত্তি | আবেদনের ৩০ দিনের মধ্যে | ২০২৬ সালের সংশোধন, ধারা ৭৩ |
জমি কেনার চুক্তি মুখে বা সাদা কাগজে করলে চলবে না। ধারা ১৭ক অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির চুক্তি লিখিত হতে হবে, দুই পক্ষ সই করবেন, আর তা রেজিস্ট্রি করতে হবে। বায়নার টাকা দেওয়ার আগে এই সময়সীমা মাথায় রাখুন।
৪. জমি রেজিস্ট্রি খরচ কোথায় মিলিয়ে নেবেন
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের রেজিস্ট্রেশন ফি পাতায় ‘দলিল রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ফিস, স্ট্যাম্প শুল্ক ও করাদির হার’ নামে সর্বশেষ যে তালিকা আছে, তার প্রকাশের তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সেখানে দলিলের ধরন অনুযায়ী স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর, আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১২৫ ও ১২৬-এর উৎসে কর আর কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট আলাদা ঘরে দেখানো আছে।
জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন অর্থ আইন কার্যকর হয়েছে, কিন্তু জমি হস্তান্তরের উৎসে কর বদলেছে কি না, তা সরকারি সূত্রে নিশ্চিত হতে পারিনি। তাই আমরা এখানে কোনো হার দিচ্ছি না। দলিল লেখানোর আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে আপনার দলিলের হিসাব লিখিতভাবে নিন।
২০২৬ সালের সংশোধনে বলা হয়েছে, প্রাপ্য ফি, কর বা শুল্ক না নিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করলে তা কর্মকর্তার অসদাচরণ। পরে কোনো ঘাটতি ধরা পড়লে টাকা আদায় হবে দলিলের যে পক্ষের দেওয়ার কথা ছিল তাঁর কাছ থেকে। তাই প্রতিটি টাকার সরকারি রসিদ নিন, দলিল লেখক বা দালালের হাতে নগদ টাকা দেবেন না।
৫. রেজিস্ট্রির পর যা করবেন
- মূল দলিল: রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ হলে দলিল ফেরত দেওয়া হয় যিনি জমা দিয়েছেন তাঁকে, অথবা রসিদে তিনি লিখিতভাবে যাঁর নাম দিয়েছেন তাঁকে। রসিদটি হারাবেন না।
- নকল: মূল দলিল হাতে আসার আগেই দরকার হলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সার্টিফাইড কপি তোলা যায়।
- নামজারি: দলিল রেজিস্ট্রি হলেই খতিয়ানে নাম ওঠে না। ক্রেতাকে আলাদা করে ই-নামজারির আবেদন করতে হয়, শহরে এখানেও রিটার্নের প্রমাণ লাগতে পারে।
- খাজনা: নামজারি হলে নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর দিন, দাখিলা সংরক্ষণ করুন।
২০২৬ সালের সংশোধনে সরকারের অনুমোদিত সফটওয়্যারে ডিজিটালভাবে দলিল জমা, গ্রহণ ও রেজিস্ট্রির বিধান যোগ হয়েছে। এর বিধিমালা গেজেটে আসার কথা। চালু হলে নিবন্ধন অধিদপ্তরের নোটিশে জানানো হবে, ততদিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হাজির হয়েই রেজিস্ট্রি হবে।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জমি রেজিস্ট্রি করতে ক্রেতার কি কি কাগজ লাগে?
জমি রেজিস্ট্রি খরচ কত ২০২৬?
জমি রেজিস্ট্রি করার কতদিন পর দলিল পাওয়া যায়?
বায়না দলিল কত দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।