
সংক্ষেপে
মাঠ পর্চা হলো জমি জরিপ চলার সময় বুঝারত ধাপে আমিন দল জমির মালিককে খতিয়ানের যে খসড়া কপি দেয়। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সিটিজেন চার্টারে লেখা আছে, এ ধাপে খতিয়ান বা পর্চা মালিককে সরবরাহ করা হয় এবং সেটিই মাঠ পর্চা নামে পরিচিত। তাই মাঠ পর্চা পাওয়া যায় জরিপের মাঠ থেকে, জরিপ শেষ হওয়ার পর অনলাইনে যা পাবেন তা চূড়ান্ত খতিয়ান।
মাঠ পর্চা চূড়ান্ত দলিল নয়, তবে এটি হাতে পাওয়ার মুহূর্তই ভুল ধরার সবচেয়ে সহজ সময়। ভুল থাকলে বুঝারতে Dispute ফরম, তসদিকে আবার দাবি, আর খসড়া প্রকাশনার সময় ১০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩০ বিধিতে আপত্তি করা যায়।
জরিপের প্রতিটি ধাপ, আপত্তি ও আপিলের নিয়ম আর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ঠিকানা এখানে আছে।
এই লেখায়
১. মাঠ পর্চা কি: জরিপের কোন ধাপে আসে
একটি মৌজায় নতুন জরিপ শুরু হলে কাজটি কয়েকটি স্তরে এগোয়। আগে মাইকিং ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, তখন মালিকদের নিজের জমির আইল বা সীমানা চিহ্নিত করে রাখতে আর কাগজপত্র হালনাগাদ রাখতে বলা হয়। এরপর আমিন দল প্রতিটি খণ্ড জমি মেপে নকশা আঁকে, তারপর দাগ নম্বর দিয়ে মালিকের নাম, ঠিকানা আর দখলের তথ্য খতিয়ানে লেখে। এর পরের স্তর বুঝারত, আর মাঠ পর্চা আসে এই স্তরেই।
| স্তর | কী হয় | বিধি (প্রজাস্বত্ব বিধিমালা) |
|---|---|---|
| কিস্তোয়ার | আমিন দল প্রতিটি খণ্ড জমি মেপে মৌজার নকশা আঁকে | ২৭(এ) বিধি |
| খানাপুরী | দাগ নম্বর দেওয়া, মালিকের নাম ও দখলের তথ্য খতিয়ানে লেখা | ২৬ বিধি |
| বুঝারত | খসড়া খতিয়ান বা মাঠ পর্চা মালিকের হাতে দেওয়া, Dispute ফরমে ভুল জানানো | ২৭ বিধি |
| তসদিক | ক্যাম্প অফিসে কাগজপত্র মিলিয়ে প্রতিটি খতিয়ান সত্যায়ন | ২৮ বিধি |
| খসড়া প্রকাশনা (ডিপি) | রেকর্ড ৩০ দিন খোলা রাখা, নতুন ডিপি নম্বর | ২৯ বিধি |
| আপত্তি ও আপিল | ১০ টাকা কোর্ট ফিতে আপত্তি, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল | ৩০ ও ৩১ বিধি |
| চূড়ান্ত প্রকাশনা | ছাপা খতিয়ান ও নকশা প্রকাশ, ৩০ কার্যদিবস দেখার সুযোগ | ৩৩ বিধি |
বুঝারত মানে বুঝিয়ে দেওয়া। আমিন দল যা লিখেছে, তা মালিককে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার কাগজটিই মাঠ পর্চা। এতে সাধারণত খতিয়ানের মতোই মালিকের নাম, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি আর পরিমাণ থাকে, তবে তখনো এটি খসড়া।
২. মাঠ পর্চা কোথায় পাওয়া যায়
মাঠ পর্চা কোনো অফিস থেকে কিনে আনার কাগজ নয়। অধিদপ্তরের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী পর্চা বিতরণের তারিখ নোটিশ, পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি বা এলাকায় মাইকিং করে জানানো হয়, আর সেই দিন আমিন দল জমির মালিকের হাতে পর্চা তুলে দেয়। তাই জরিপ চলার সময় এলাকার ঘোষণায় কান রাখাই প্রথম কাজ।
- জরিপ চলছে কি না জানতে আপনার ইউনিয়ন বা উপজেলায় জরিপ ক্যাম্প আছে কি না খোঁজ নিন। তসদিক ও খসড়া প্রকাশনার কাজ ক্যাম্প অফিসে হয়।
- বিদেশে থাকলে বা বিতরণের দিন উপস্থিত থাকতে না পারলে পরিবারের কাউকে কাগজপত্রসহ পাঠান, আর পরে ক্যাম্প অফিসে নিজের খতিয়ানের খোঁজ নিন।
- জরিপ শেষ হয়ে গেলে মাঠ পর্চা আর পাওয়ার প্রশ্ন থাকে না। তখন অনলাইনে বা ভূমি অফিসে চূড়ান্ত খতিয়ানের কপি তুলতে হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-পর্চা ও খতিয়ান সেবায় চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত জরিপের খতিয়ান খোঁজা যায়। চলমান জরিপের খসড়া পর্চা সেখানে থাকে না। চূড়ান্ত খতিয়ান তোলার নিয়ম আলাদা গাইডে দেওয়া আছে।
৩. মাঠ পর্চা আর খতিয়ানের পার্থক্য
সাধারণ কথায় খতিয়ানের কপিকেই পর্চা বলা হয়, তাই অনেকে দুটোকে এক ভাবেন। তফাত হলো সময় আর আইনগত অবস্থানে। মাঠ পর্চা বুঝারত স্তরের খসড়া। এরপর তসদিক স্তরে একজন রাজস্ব কর্মকর্তা আপনার দলিল, নামজারি, দাখিলা মিলিয়ে খতিয়ানটি সত্যায়ন করেন। চার্টারে বলা আছে, তসদিক করা পর্চা জমির মালিকানার প্রাথমিক আইনগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব আপত্তি ও আপিল শেষে খতিয়ান ও নকশা ছাপা হয়ে চূড়ান্ত প্রকাশনা হয়। তখন ক্যাম্পে মৌজার রেকর্ড ৩০ কার্যদিবস সবার দেখার জন্য খোলা থাকে। চার্টার অনুযায়ী এ সময় সরকার নির্ধারিত প্রতিটি ছাপা খতিয়ান ৬০ টাকা আর প্রতিটি ছাপা নকশা ৩৫০ টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে নেওয়া যায়। চূড়ান্ত খতিয়ানই পরে নামজারি, খাজনা আর কেনাবেচায় কাজে লাগে।
৪. মাঠ পর্চায় ভুল থাকলে কী করবেন
- ১হাতে পেয়েই মিলিয়ে নিননিজের ও বাবার নাম, প্রতিটি দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি, অংশ আর পরিমাণ দলিল ও আগের খতিয়ানের সঙ্গে মেলান। শরিকদের নাম বাদ পড়েছে কি না দেখুন।
- ২বুঝারতেই Dispute ফরম দিনসংশোধন দরকার হলে নির্দিষ্ট Dispute ফরম পূরণ করে আমিনের কাছে জমা দিন। হল্কা অফিসার দুই পক্ষের কথা শুনে বিরোধ মেটান।
- ৩তসদিকে প্রমাণ দেখানতসদিক স্তরেও মালিক পর্চা বা নকশার সংশোধন চেয়ে দাবি জানাতে পারেন। মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ সঙ্গে নিন।
- ৪ডিপি নম্বর নিন, দরকারে আপত্তি করুনখসড়া প্রকাশনায় খতিয়ান নতুন নম্বর পায়। পর্চা নিয়ে ক্যাম্পে গিয়ে ডিপি নম্বর জেনে নিন। তখনো ভুল থাকলে ১০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট ফরমে ৩০ বিধিতে আপত্তি করুন।
- ৫রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আপিলআপত্তির রায়ের নকল তুলে ৩১ বিধিতে আপিল করা যায়। নকলের জন্য কোর্ট ফি ও কার্টিজ পেপারসহ সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আবেদন করতে হয়।
চূড়ান্ত প্রকাশনার পর করণিক ভুল থাকলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যায়। এর বাইরে মালিকানার বিরোধে আদালতের পথ লাগে, সেটি আমাদের জমির রেকর্ড সংশোধনের লেখায় আছে। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. কোন কাগজ সঙ্গে রাখবেন, কোথায় সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
বুঝারত ও তসদিকে যা সঙ্গে রাখবেন
অধিদপ্তরের এক তালিকায় দেখা যায়, ওয়ারিশ গোপন করে রেকর্ড, রেজিস্ট্রি বণ্টননামা না থাকা, আর বাবা-মা জমি বিক্রির পরও আগের রেকর্ড তাঁদের নামে থাকা থেকে সবচেয়ে বেশি আপত্তি মামলা হয়। বুঝারতে এসব কাগজ দেখাতে পারলে পরে মামলায় যেতে হয় না।
৬. অনেকে যা জানতে চান
মাঠ পর্চা আর খতিয়ান কি এক?
মাঠ পর্চা কোথায় পাওয়া যায়?
math porcha ki online e paowa jay?
মাঠ পর্চায় ভুল থাকলে কত টাকায় আপত্তি করা যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।