সংক্ষেপে
জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিকানা কেনা, ওয়ারিশ, হেবা, ডিক্রি বা নিলাম সূত্রে বদলালে সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম তুলতে নামজারির আবেদন করতে হয়। আবেদন হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেম mutation.land.gov.bd -তে। লগইন করে উপজেলা বেছে আগে ২০ টাকা কোর্ট ফি দিন, তারপর দলিল, খতিয়ান, NID, ছবি আর দাখিলার স্ক্যান কপি জুড়ে ফরম পূরণ করুন এবং ৫০ টাকা নোটিশ জারি ফি দিয়ে আবেদন জমা দিন।
আবেদন মঞ্জুর হলে মোবাইলে এসএমএস আসে। তখন ১১০০ টাকা DCR ফি (রেকর্ড সংশোধন ১০০০ আর খতিয়ান সরবরাহ ১০০ টাকা) অনলাইনে দিলে নতুন খতিয়ান আর কিউআর কোডযুক্ত DCR পোর্টাল থেকেই নামানো যায়। সব মিলিয়ে সরকারি খরচ ১১৭০ টাকা।
লগইন, কোর্ট ফি, ফরম, নোটিশ ফি আর পরে DCR ফি, সবই এই পোর্টালে হয়।
এই লেখায়
১. কখন নামজারি করাতে হয়
সরকারি রেকর্ডে জমির মালিক তিনিই, খতিয়ানে যাঁর নাম লেখা। জমি কিনে দলিল রেজিস্ট্রি করলেই খতিয়ানে আপনার নাম ওঠে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি মঞ্জুর করলে তবেই আপনার নামে খতিয়ান আর ভূমি উন্নয়ন করের হোল্ডিং তৈরি হয়। এরপর নিজের নামে খাজনা দেওয়া যায়, আর পরে জমি বিক্রিও সহজ হয়।
- জমি বা ফ্ল্যাট কিনেছেন (সাব-কবলা দলিল)
- বাবা, মা বা অন্য কারও মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সূত্রে জমি পেয়েছেন
- হেবা বা দানপত্রে জমি পেয়েছেন
- আদালতের রায় বা ডিক্রি, নিলাম কিংবা সরকারি বন্দোবস্তে মালিক হয়েছেন
- ফ্ল্যাট বা ফ্লোর স্পেস কিনেছেন; এ ক্ষেত্রে ফরমে অ্যাপার্টমেন্ট নম্বরও দিতে হয়
একই মৌজার একাধিক খতিয়ান আর দাগ এক আবেদনে যোগ করা যায়। কিন্তু জমি দুই মৌজায় হলে প্রতিটি মৌজার জন্য আলাদা আবেদন আর আলাদা ফি লাগবে।
২. আবেদনের আগে যে কাগজ স্ক্যান করে রাখবেন
ফরম পূরণের মাঝপথে কাগজ খুঁজতে গেলে ভুল বাড়ে। তাই সব কাগজ আগেই স্ক্যান করে কম্পিউটার বা ফোনের একটি ফোল্ডারে রাখুন। খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর আর জমির পরিমাণ একটি নোটে লিখে রাখলে ফরমে কপি করে বসানো যায়।
যা লাগবে
| কী আপলোড করবেন | ফরম্যাট ও মাপ |
|---|---|
| ছবি | JPG বা PNG, ৩০০×৩০০ পিক্সেল, ৩০০ KB-এর কম |
| স্বাক্ষর | JPG বা PNG |
| দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদসহ অন্য কাগজ | শুধু PDF, প্রতিটি ফাইল ১.২৫ MB-এর মধ্যে |
| সব সংযুক্তি মিলিয়ে | সর্বোচ্চ ২৫ MB |
উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির আবেদন করতে পোর্টাল আগে মৃত ব্যক্তির হোল্ডিং থেকে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে বলে। বকেয়া থাকলে আবেদনের আগেই সেটা মিটিয়ে নিন।
৩. অনলাইন ফরম পূরণের ধাপ
- ১লগইন করে উপজেলা বাছুনmutation.land.gov.bd খুলে নতুন আবেদনে যান। পোর্টাল এখন আবেদনের আগে লগইন বা রেজিস্ট্রেশন চায়, আর লগইন করা ব্যক্তিকে হতে হবে গ্রহীতা নিজে বা তাঁর প্রতিনিধি। এরপর যে উপজেলা বা সার্কেলের জমি, সেটি বেছে নিন।
- ২২০ টাকা কোর্ট ফি দিনফরম খোলার আগেই ২০ টাকা কোর্ট ফি দিতে হয়, আর ফিটি বাছাই করা উপজেলার জন্যই খাটে। পোর্টাল যত দিনের সময় দেখায়, তার মধ্যে আবেদন জমা না দিলে কোর্ট ফি আবার দিতে হবে।
- ৩মালিকানার সূত্র আর জমির তথ্য দিনক্রয়, ওয়ারিশ, হেবা, ডিক্রি, নিলাম বা বন্দোবস্ত, কোন সূত্রে জমি পেয়েছেন বাছুন। তারপর বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা আর জরিপ বেছে খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর আর জমির পরিমাণ একরে লিখুন। নামজারি হয় এলাকার সর্বশেষ জরিপের রেকর্ড ধরে, আর লম্বা তালিকায় মৌজা চিনতে জেএল নম্বর কাজে লাগে।
- ৪আবেদনকারী, দাতা আর রেকর্ডীয় মালিকের তথ্যআবেদনকারীর নাম, বাবা-মায়ের নাম আর জন্মতারিখ NID-র সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে, না মিললে পোর্টাল এগোতে দেয় না। দলিল নম্বর, তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিক্রেতা বা দাতা আর খতিয়ানে লেখা মালিকের তথ্যও দিন। যাঁদের নাম কেটে আপনার নাম উঠবে, নোটিশের জন্য তাঁদের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লাগে।
- ৫কাগজ জুড়ে ঘোষণা দিনস্ক্যান করা ফাইল আপলোড করে প্রতিটির ধরন (দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ) বেছে দিন। এরপর ঘোষণা দিতে হয়: মালিকানার ধারাবাহিকতা আছে কি না, জমি দখলে কি না, খাস বা অর্পিত অংশ, মামলা বা নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত খাজনা দেওয়া কি না, আর কৃষিজমি ৬০ বিঘার বেশি নেই। ভুল ঘোষণায় আবেদন বাতিল হয়, আইনি ঝামেলাও হতে পারে।
- ৬প্রিভিউ দেখে নোটিশ ফি দিনজমার আগে প্রিভিউ খুঁটিয়ে পড়ুন। ৫০ টাকা নোটিশ জারি ফি দেওয়ার পর আর কোনো তথ্য বদলানো যায় না। টাকা জমা হলে আবেদন নম্বর এসএমএসে আসে; আবেদনের কপি আর রসিদ PDF করে রেখে দিন।
ওটিপি, শুনানির তারিখ আর সিদ্ধান্তের এসএমএস যায় আবেদনে দেওয়া নম্বরে। নিয়ম হলো অন্তত একজন গ্রহীতার নিজের নম্বর দেওয়া। পরিবারের অন্য কারও নম্বর দিলে শুনানির দিন মূল গ্রহীতার অনুমতিপত্র এসি ল্যান্ডকে দেখাতে হয়, না হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৪. কোন ফি কখন দেবেন
| ফি | পরিমাণ | কখন দেবেন |
|---|---|---|
| আবেদনের কোর্ট ফি | ২০ টাকা | ফরম খোলার আগে |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ টাকা | ফরম পূরণ শেষে, জমার সময় |
| DCR ফি (রেকর্ড সংশোধন ১০০০ + খতিয়ান সরবরাহ ১০০) | ১১০০ টাকা | আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর |
| মোট সরকারি খরচ | ১১৭০ টাকা | পুরো প্রক্রিয়ায় |
টাকা দেওয়া যায় নগদ, বিকাশ, রকেট, উপায়, ভিসা বা মাস্টারকার্ড আর ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে। পেমেন্ট গেটওয়ের সামান্য চার্জ যোগ হতে পারে, পেমেন্ট পাতার চার্জ তালিকায় তা দেখায়। আবেদন নামঞ্জুর হলে রিভিউ আবেদনে কোর্ট ফি আর নোটিশ জারি ফি মিলিয়ে ৭০ টাকা, আর রিভিউ মঞ্জুর হলে আবার ১১০০ টাকা DCR ফি লাগে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ফি তালিকায় নামজারির মোট খরচ ১১৭০ টাকা। কেউ ফাইল তাড়াতাড়ি চালানোর নামে বাড়তি টাকা চাইলে দেবেন না, ১৬১২২ নম্বরে জানান।
৫. জমা দেওয়ার পর কী হয়
- উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিস আবেদন পায় এবং ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে তদন্তে পাঠায়।
- ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রতিবেদন দেয় আর খতিয়ান ও হোল্ডিং মিলিয়ে দেখে।
- শুনানির তারিখ ঠিক হয়, নোটিশ যায়। পেমেন্টের সময় চাইলে অনলাইন শুনানির অনুরোধ করা যায়, অনুমতি দেন এসি ল্যান্ড।
- শুনানির পর এসি ল্যান্ড সিদ্ধান্ত দেন, ফল এসএমএসে জানানো হয়।
- মঞ্জুর হলে ১১০০ টাকা DCR ফি দিন। এরপর পোর্টাল থেকে নতুন খতিয়ান, DCR আর হস্তান্তর বৃত্তান্ত নামানো যায়।
পোর্টালের নির্দেশিকা বলছে, সাধারণত ২৮ দিনে একটি নামজারি নিষ্পত্তি হয়। কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন DCR হাতে লেখা DCR-এর সমান বৈধ, তাই এর জন্য অফিসে যেতে হয় না। মঞ্জুরের পর DCR ফি ফেলে রাখবেন না; পোর্টালের হিসাবে ৩০ দিনের মধ্যে ফি না দিলে আবেদনটি আর্কাইভে চলে যায়।
৬. অনেকে যা জানতে চান
বিদেশে থাকি, অন্য কেউ কি আমার হয়ে আবেদন করতে পারবেন?
এই মুহূর্তে সব কাগজ আপলোড করতে না পারলে কী করব?
রাজউক বা গৃহায়নের প্লটের ফ্ল্যাট কিনেছি, বাড়তি কিছু লাগবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।