
সংক্ষেপে
জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ ঠিক হয় স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী। জেলা প্রশাসক জমির বাজারদর ধরেন ৪ ধারার নোটিশের আগের ১২ মাসে আশপাশের একই রকম জমির গড় দামে। সরকারি প্রয়োজনে অধিগ্রহণ হলে এই বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ২০০ শতাংশ দিতে হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য হলে ৩০০ শতাংশ। ফসল, গাছ, স্থাপনা সরানোর মতো ক্ষতিতে আরও ১০০ শতাংশ।
টাকা দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এল এ) শাখা। মালিকানার কাগজ, খতিয়ান, নামজারি, খাজনার রসিদ আর এনআইডি নিয়ে আবেদন করতে হয়। রোয়েদাদের অঙ্ক কম মনে হলে আপত্তিসহ টাকা নিয়ে নোটিশের ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে আরবিট্রেটরের কাছে আবেদন করুন।
অধিগ্রহণের তালিকায় দাগ আর মালিকের নাম সঠিক আছে কি না, আগে খতিয়ান দেখে নিন।
এই লেখায়
১. জমি অধিগ্রহণের নিয়ম: নোটিশ থেকে রোয়েদাদ পর্যন্ত
অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক জমির ওপর বা কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য জায়গায় ৭ ধারার নোটিশ জারি করেন। জ্ঞাত সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও আলাদা নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ধাপগুলো আইনে বাঁধা সময়ে চলে।
- ১৭ ধারার নোটিশে হাজিরানোটিশ জারির ১৫ কার্যদিবস পর, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ৭ কার্যদিবস পর, নির্ধারিত স্থানে হাজির হয়ে নিজের দাবি আর ক্ষতিপূরণে নিজের অংশ জানাতে হয়।
- ২প্রাক্কলন৭ ধারার নোটিশের পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ১৫ কার্যদিবসে, ক্ষতিপূরণের প্রাক্কলন তৈরি হওয়ার কথা।
- ৩রোয়েদাদ ও নোটিশ৮ ধারায় জেলা প্রশাসক রোয়েদাদ (award) তৈরি করেন, যাতে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক আর প্রত্যেক দাবিদারের অংশ লেখা থাকে। রোয়েদাদ তৈরির ৭ কার্যদিবসের মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়া হয়।
- ৪টাকা জমা ও পরিশোধপ্রত্যাশী সংস্থা প্রাক্কলন পাওয়ার ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা জমা দেয়। জমার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসক ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করবেন।
রোয়েদাদে অংশ ঠিক হয় অধিগ্রহণাধীন মৌজার সর্বশেষ জরিপের রেকর্ড আর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। তাই খতিয়ানে নাম না থাকলে বা নামজারি না হলে টাকা পেতে দেরি হয়। নোটিশ পাওয়ার পরপরই কাগজ গুছিয়ে ফেলুন।
২. জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ কীভাবে হিসাব হয়
আইনের ৯ ধারায় জেলা প্রশাসক পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করেন: জমির বাজারদর, দাঁড়িয়ে থাকা ফসল ও গাছের ক্ষতি, জমি ভাগ হয়ে যাওয়ায় বাকি জমির ক্ষতি, অন্য সম্পত্তি বা উপার্জনে ক্ষতিকর প্রভাব, আর বাড়ি বা ব্যবসা সরাতে বাধ্য হলে যুক্তিসংগত খরচ।
| ক্ষতির ধরন | বাড়তি ক্ষতিপূরণ (৯ ধারা) |
|---|---|
| সরকারি প্রয়োজনে অধিগ্রহণ, জমির বাজারদর | বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ২০০% |
| বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিগ্রহণ, জমির বাজারদর | বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ৩০০% |
| ফসল, গাছ, জমি ভাগের ক্ষতি, উপার্জনের ক্ষতি, স্থানান্তরের খরচ | অতিরিক্ত ১০০% |
| বাস্তুচ্যুত পরিবার | নির্ধারিত পদ্ধতিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় |
একটা সহজ উদাহরণ: সরকারি সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা আপনার জমির বাজারদর রোয়েদাদে ১০ লাখ টাকা ধরা হলো। ২০০% বাড়তি হিসেবে আরও ২০ লাখ যোগ হবে, জমির জন্য মোট ৩০ লাখ। জমিতে থাকা গাছের দাম ১ লাখ ধরা হলে সেখানে ১০০% বাড়তি, অর্থাৎ ২ লাখ। আসল অঙ্ক নির্ভর করবে আপনার রোয়েদাদে কী লেখা, তার ওপর।
১০ ধারা অনুযায়ী ৪ ধারার নোটিশের পর জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়া জমিতে পরিবর্তন, উন্নয়ন বা বিক্রি ক্ষতিপূরণের হিসাবে ধরা হয় না। শুধু বেশি টাকা পাওয়ার আশায় নতুন ঘর তুললে তার দাম পাবেন না।
৩. অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন
আবেদন করতে হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল এ শাখায়। কিছু জেলায় অনলাইনেও আবেদন নেওয়া হয়। যেমন ঢাকা জেলার এল এ শাখার অনলাইন ফরমে প্রকল্প, মামলা নম্বর, মৌজা, দাগ আর খতিয়ান বেছে নিয়ে আবেদনকারীর তথ্য, ক্ষতিপূরণের ধরন, নামজারির তথ্য আর মালিকানার ধারাবাহিকতা দিতে হয়।
ঢাকা জেলার অনলাইন আবেদনে যে কাগজ যুক্ত করতে বলা হয়
অন্য জেলায় তালিকা কিছুটা আলাদা হতে পারে, তাই নিজের জেলার এল এ শাখার নোটিশ বা সহায়তা ডেস্কে মিলিয়ে নিন। মালিক মারা গিয়ে থাকলে ওয়ারিশ সনদ আর ওয়ারিশদের মধ্যে অংশের কাগজ লাগবে। আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী রোয়েদাদের ওপর স্ট্যাম্প ডিউটি আর রোয়েদাদের অনুলিপির জন্য দাবিদারের কাছ থেকে কোনো ফি নেওয়া যাবে না।
টাকা পাওয়ার পর রসিদ বা চেকের কপি আর রোয়েদাদের অনুলিপি রেখে দিন। পরে খতিয়ান থেকে অধিগ্রহণকৃত অংশ বাদ যাবে, তখন বাকি জমির হিসাব মেলাতে এই কাগজ কাজে লাগে।
৪. ক্ষতিপূরণ কম মনে হলে বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে
মালিকানা নিয়ে আপত্তি, দাবিদার না পাওয়া বা অংশ নিয়ে বিরোধ থাকলে জেলা প্রশাসক টাকা সরকারি হিসাবে জমা রাখেন। এতে দখল নেওয়া আটকায় না। অঙ্ক নিয়ে আপত্তি থাকলে মনে রাখুন, ১১ ধারায় বলা আছে, আপত্তি ছাড়া টাকা নিলে পরে আরবিট্রেটরের কাছে আবেদন করার যোগ্যতা থাকে না।
- টাকা নেওয়ার সময় লিখিতভাবে জানান যে আপনি অঙ্ক নিয়ে আপত্তিসহ নিচ্ছেন।
- রোয়েদাদের নোটিশ জারির ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে আরবিট্রেটরের কাছে আবেদন করুন। আরবিট্রেটর যুগ্ম জেলা জজের নিচে নন এমন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা।
- আবেদনে আপত্তির কারণ লিখুন আর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে প্রত্যাশী সংস্থাকেও পক্ষ করুন।
- আরবিট্রেটর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শুনানি করে আদেশ দেবেন।
প্রত্যাশা ঠিক রাখুন: ৩৩ ধারার শর্ত অনুযায়ী আরবিট্রেটর জেলা প্রশাসকের রোয়েদাদের অঙ্কের ১০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে কোনো মালিকের ক্ষতিপূরণ ধার্য করতে পারেন না। বাড়তি অঙ্ক দিতে দেরি হলে ৩৪ ধারায় প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের বিধান আছে। মালিকানার জটিল বিরোধে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের রেকর্ড আর আইনজীবীর সাহায্য নিন।
৫. অনেকে যা জানতে চান
জমি অধিগ্রহণের টাকা কত দিনে পাওয়া যায়?
অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির আবেদন ফরম কোথায় পাব?
খতিয়ানে বাবার নাম, বাবা মারা গেছেন। টাকা কে পাবে?
দালাল টাকা তুলে দেওয়ার কথা বললে কী করব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।