
সংক্ষেপে
দুজন মানুষ নিজেদের জমি একে অপরকে দিয়ে দিলে যে দলিল হয়, সেটাই এওয়াজ বদল বা বিনিময় দলিল। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী এই হস্তান্তর বিক্রির মতো একই পদ্ধতিতে করতে হয়, মানে দলিল লিখে রেজিস্ট্রি করাতে হয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি তালিকায় এওয়াজ দলিলের স্ট্যাম্প শুল্ক ১%, হলফনামা ৩০০ টাকা। রেজিস্ট্রেশন ফি আর স্থানীয় সরকার কর সাফ কবলার মতো, কিন্তু উৎসে কর আর ভ্যাট প্রযোজ্য নয়। রেজিস্ট্রির পর দুই পক্ষকেই নিজের পাওয়া জমির নামজারি করাতে হয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তালিকার ক্রমিক ২-এ এওয়াজ বা বিনিময় দলিলের স্ট্যাম্প, ফি আর কর দেওয়া আছে।
এই লেখায়
১. এওয়াজ দলিল কি, কখন লাগে
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ১১৮ ধারায় বিনিময়ের সংজ্ঞা আছে: দুজন ব্যক্তি যখন একটি জিনিসের মালিকানার বদলে আরেকটি জিনিসের মালিকানা পরস্পরকে দেন, আর দুটির কোনোটিই শুধু টাকা নয়, তখন সেটা বিনিময়। গ্রামে একে বলা হয় এওয়াজ বদল বা জমি অদলবদল।
একটা উদাহরণ ধরুন। করিমের ১০ শতাংশ জমি রহিমের বাড়ির পাশে, আর রহিমের ১০ শতাংশ জমি করিমের পুকুরের পাশে। দুজনেই চান নিজের দিকের জমিটা। টাকা লেনদেন না করে তাঁরা একটি এওয়াজ দলিলে জমি বদলে নিলেন। দুটি সাফ কবলা দলিল করার চেয়ে এতে খরচও কম।
- বাড়ির রাস্তা বা উঠানের জন্য পাশের প্লটের একটি অংশ দরকার, বদলে নিজের অন্য জায়গার জমি দিচ্ছেন
- দুই ভাইয়ের ভাগের জমি ছড়ানো ছিটানো, পাশাপাশি আনতে অদলবদল করছেন
- চাষের সুবিধার জন্য দুই কৃষক পাশাপাশি দাগ মিলিয়ে নিচ্ছেন
- দুই জমির দাম এক না হলে অনেকে বাকি টাকা আলাদা লেনদেন করেন; তখন কোন দলিল ঠিক হবে, দলিল লেখকের সঙ্গে আলাপ করুন
নাম কাছাকাছি হলেও ফি তালিকায় হেবাবিল এওয়াজ দলিল আলাদা ধরন, তার স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫%। আপনার লেনদেন কোন ধরনে পড়ে, দলিল লেখার আগে দলিল লেখক বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিশ্চিত হোন।
২. এওয়াজ দলিল খরচ কত
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে হালনাগাদ করা তালিকা অনুযায়ী হিসাব নিচে। রেজিস্ট্রেশন ফি আর স্থানীয় সরকার করের ঘরে তালিকায় লেখা আছে সাফ কবলার মতো।
| খাত | হার |
|---|---|
| স্ট্যাম্প শুল্ক | দলিল মূল্যের ১% |
| হলফনামার স্ট্যাম্প | ৩০০ টাকা |
| রেজিস্ট্রেশন ফি (এ ফি) | ১%, সর্বনিম্ন ১০০ টাকা |
| স্থানীয় সরকার কর | ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ৩%; সিটি করপোরেশনে ২% |
| উৎসে কর ও ভ্যাট | প্রযোজ্য নয় |
| ই ফি, এন ফি, এনএন ফি, কোর্ট ফি | ১০০ টাকা; প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ ও ৩৬ টাকা; ১০ টাকা |
ধরা যাক ইউনিয়ন এলাকায় এওয়াজ দলিলে মূল্য লেখা হলো ৫ লাখ টাকা। তাহলে স্ট্যাম্প ৫,০০০, রেজিস্ট্রেশন ফি ৫,০০০, স্থানীয় সরকার কর ১৫,০০০, হলফনামা ৩০০ আর ই ফি ১০০, মোট ২৫,৪০০ টাকা। এর সঙ্গে পৃষ্ঠার সংখ্যা অনুযায়ী এন আর এনএন ফি যোগ হবে। একই মূল্যের সাফ কবলায় স্ট্যাম্প ১.৫% আর উৎসে কর থাকায় খরচ বেশি পড়ে।
আরেকটা তুলনা মাথায় রাখুন। এওয়াজ না করে দুজন যদি একে অপরের কাছে আলাদা দুটি সাফ কবলা দলিলে জমি বিক্রি করেন, তাহলে দুটি দলিলের জন্য আলাদা স্ট্যাম্প, ফি আর উৎসে কর দিতে হয়। টাকার লেনদেন না থাকলে এওয়াজই আইনসম্মত আর সস্তা পথ।
বিনিময়ে দুটি জমি থাকে, তাই কোন জমির মূল্য বা কোন অঙ্ক ধরে শতাংশ হিসাব হবে, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন। আমাদের উদাহরণ শুধু হিসাবের ধরন বোঝাতে।
৩. এওয়াজ দলিল করার নিয়ম: ধাপগুলো
দুই পক্ষেরই যা লাগবে
একটা সাধারণ ভুল হলো শুধু নিজের জমির কাগজ নিয়ে যাওয়া। এওয়াজে আপনি দাতাও, গ্রহীতাও। তাই অন্য পক্ষের জমির কাগজও আপনাকে নিজে মিলিয়ে দেখতে হবে, ঠিক যেমন জমি কেনার আগে দেখতেন।
- ১দুই জমির কাগজ মিলিয়ে নিনদুজনের জমিরই হালনাগাদ খতিয়ান, নামজারি আর খাজনার দাখিলা দেখুন। দুজনকেই নিজের জমির বৈধ মালিক হতে হবে। কোনো জমিতে মামলা বা বন্ধক আছে কি না খোঁজ নিন।
- ২দাগ, পরিমাণ আর সীমানা ঠিক করুনকে কোন দাগের কতটুকু দিচ্ছেন, তা লিখিতভাবে ঠিক করুন। প্রয়োজনে আমিন দিয়ে দুই জমি মাপিয়ে নিন, পরে দখল নিয়ে ঝামেলা কম হয়।
- ৩দলিল লেখানদুই পক্ষের নাম, দুই জমির তফসিল আলাদা করে আর বিনিময়ের কথা পরিষ্কার লিখতে হবে। একই দলিলে দুজনই দাতা, দুজনই গ্রহীতা।
- ৪ফি জমা দিয়ে রেজিস্ট্রিসাধারণত জমি যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এলাকায়, সেখানে রেজিস্ট্রি হয়। দুজনই উপস্থিত থেকে সই দেবেন। ফি জমার চালান বা রসিদ রেখে দিন।
- ৫দুজনেই আলাদা নামজারি করুনরেজিস্ট্রির পর প্রত্যেকে নিজের পাওয়া জমির জন্য ই-নামজারির আবেদন করবেন। ভূমি তথ্য বাতায়নের তালিকায় নামজারিতে কোর্ট ফি ২০, নোটিশ জারি ফি ৫০ আর ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা।
৪. এওয়াজের পর যদি সমস্যা হয়
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১১৯ ধারা একটা সুরক্ষা দিয়েছে। অন্য পক্ষের মালিকানায় ত্রুটি থাকায় আপনি যদি পাওয়া জমির পুরো বা আংশিক হারান, তাহলে দলিলে ভিন্ন কিছু লেখা না থাকলে অন্য পক্ষ আপনার ক্ষতিপূরণ দিতে দায়ী। চাইলে আপনার দেওয়া জমি তাঁর দখলে থাকলে সেটা ফেরতও চাইতে পারেন।
- এওয়াজ দলিল বাতিল করতে চাইলে পথ দেওয়ানি আদালত, যেমন অন্য দলিলের ক্ষেত্রে হয়। এর তামাদির সময় আছে, তাই দেরি করবেন না।
- দলিলে নাম বা দাগ ভুল হলে দুই পক্ষ মিলে ভ্রম সংশোধন দলিল করা যায়।
- বিরোধ দেখা দিলে কাগজ নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিস বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. অনেকে যা জানতে চান
এওয়াজ দলিল করতে কত টাকা লাগে?
এওয়াজ দলিলে কি উৎসে কর লাগে?
এওয়াজ দলিল কি বাতিল করা যায়?
এওয়াজ বদলের পর নামজারি কে করবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।