
সংক্ষেপে
দলিল রেজিস্ট্রি হলেই সরকারি রেকর্ডে জমি আপনার হয়ে যায় না। জমি কেনার পর অন্তত পাঁচটি কাজ বাকি থাকে: মূল দলিল তোলা, নামজারি, নিজের নামে খাজনার হোল্ডিং, সরেজমিন দখল আর সীমানা, আর প্রয়োজনে বিদ্যুৎ-গ্যাসের মিটারে নাম বদল।
নামজারির জন্য অপেক্ষার কোনো সময় নেই, রেজিস্ট্রির পরই আবেদন করা যায়। ভূমি তথ্য বাতায়নের তালিকায় সরকারি ফি কোর্ট ফি ২০, নোটিশ জারি ফি ৫০ আর ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা। আর মূল দলিল দুই বছরের বেশি না তুললে রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী তা নষ্ট করে ফেলা যায়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টালে লগইন করে নামজারির আবেদন আর ফি দেওয়া যায়।
এই লেখায়
১. রেজিস্ট্রির দিন যা হাতে রাখবেন
রেজিস্ট্রির দিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মূল দলিল রেখে দেয়, আপনাকে দেয় একটি রশিদ। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৬১ ধারা অনুযায়ী দলিলের কপি বহিতে তোলা শেষ হলে মূল দলিল ফেরত পান যিনি দলিল দাখিল করেছেন, অথবা তিনি রশিদে লিখে যাঁকে মনোনীত করেছেন। তাই রশিদে ক্রেতার নাম আর মোবাইল নম্বর ঠিক আছে কি না সেদিনই দেখে নিন।
সেদিনের কাগজ
২. জমি কেনার পর কি কি করতে হয়: ৫টি কাজ
- ১মূল দলিল তুলুনঅফিস থেকে খবর এলে বা খোঁজ নিয়ে রশিদ দেখিয়ে মূল দলিল তুলুন। মূল দলিল দেরিতে এলে নামজারির জন্য দলিলের অবিকল নকল তুলে নিতে পারেন।
- ২ই-নামজারির আবেদন করুনদলিল, বায়া দলিল, বিক্রেতার খতিয়ান, NID আর সর্বশেষ দাখিলা স্ক্যান করে ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন করুন। শুনানির নোটিশ এলে মূল কাগজ নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসে যান। আবেদনের ট্র্যাকিং নম্বর আর মোবাইলে আসা প্রতিটি এসএমএস সংরক্ষণ করুন, কারণ শুনানির তারিখ সেখানেই আসে।
- ৩নিজের নামে খাজনার হোল্ডিং খুলুননামজারি মঞ্জুর হলে আপনার নামে খতিয়ান আর ভূমি উন্নয়ন করের হোল্ডিং তৈরি হয়। ldtax.gov.bd-তে সেই খতিয়ান যুক্ত করে খাজনা দিন, দাখিলা নামিয়ে রাখুন।
- ৪দখল আর সীমানা বুঝে নিনবিক্রেতার উপস্থিতিতে জমি মাপিয়ে সীমানা চিহ্ন দিন। প্রয়োজনে সাইনবোর্ড দিন, যাতে আশপাশের সবাই জানেন জমির নতুন মালিক কে। খালি জমি দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসুন, কেউ দখল নিচ্ছে কি না।
- ৫মিটার আর অন্য সংযোগে নাম বদলানবাড়িসহ জমি কিনলে বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির সংযোগ আগের মালিকের নামে থাকে। ডেসকোর সেবা প্রতিশ্রুতিতে নাম বদলের কাগজের তালিকায় জমির দলিল, হালনাগাদ খাজনার রসিদ বা নামজারির খতিয়ান চাওয়া হয়েছে।
৩. জমি কেনার কতদিন পর দলিল পাওয়া যায়
আইনে মূল দলিল ফেরতের নির্দিষ্ট দিন বেঁধে দেওয়া নেই, অফিসের কাজের চাপের ওপর সময় নির্ভর করে। তবে দেরিতে তোলার একটা ঝুঁকি আইনে আছে। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৮৫ ধারা বলছে, উইল ছাড়া অন্য কোনো দলিল দুই বছরের বেশি সময় অফিসে না তোলা অবস্থায় পড়ে থাকলে তা নষ্ট করে ফেলা যায়।
মূল দলিল তুলতে রশিদ লাগে। রশিদ হারালে কী করতে হয় আর দলিল উত্তোলনে কত খরচ, তা আমাদের মূল দলিল উত্তোলন নিয়ে লেখায় আছে।
মূল দলিল হাতে পেলে প্রথম কাজ হলো লেখা মিলিয়ে দেখা। নাম, বাবার নাম, দাগ, খতিয়ান, মৌজা আর জমির পরিমাণ আপনার কেনা জমির সঙ্গে মেলে কি না দেখুন। ভুল থাকলে এখনই বিক্রেতাকে নিয়ে ভ্রম সংশোধন দলিল করানো সহজ, নামজারির পরে ধরা পড়লে কাজ দ্বিগুণ হয়।
৪. জমি কেনার পর যে ভুলগুলো বেশি হয়
- মূল দলিল না তুলে বছরের পর বছর রশিদ রেখে দেওয়া, পরে রশিদটাই হারিয়ে যাওয়া
- নামজারি না করে বিক্রেতার নামের দাখিলায় খাজনা দিতে থাকা, যাতে রেকর্ডে আপনার কোনো চিহ্ন থাকে না
- জমি না মাপিয়ে শুধু কাগজ দেখে কেনা, পরে পাশের মালিকের সঙ্গে সীমানা নিয়ে বিরোধ
- বাড়িসহ জমি কিনে মিটার আগের মালিকের নামে রেখে দেওয়া, বকেয়া বিলের দায় নিয়ে পরে ঝামেলা
- নামজারির শুনানির নোটিশের এসএমএস খেয়াল না করা, ফলে আবেদন নামঞ্জুর হওয়া
জমি নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে বা দখল বুঝে পেতে বাধা এলে কাগজ নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. জমি কেনার কতদিন পর নামজারি করা যায়, খরচ কত
রেজিস্ট্রির পরদিন থেকেই আবেদন করা যায়, অপেক্ষার নিয়ম নেই। দেরি করলে বরং ঝুঁকি বাড়ে। নামজারি না হলে সরকারি খতিয়ানে বিক্রেতার নামই থেকে যায়, আপনি নিজের নামে খাজনা দিতে পারেন না। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৫২ক ধারায় বিক্রির দলিলে সর্বশেষ খতিয়ানের তথ্য দিতে হয়, তাই পরে আপনি জমি বিক্রি করতে গেলেও নিজের নামের খতিয়ান লাগবে।
| নামজারির ফি | টাকা |
|---|---|
| আবেদনের কোর্ট ফি | ২০ |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ |
| ডিসিআর ফি | ১,১০০ |
| মোট | ১,১৭০ |
সংখ্যাগুলো ভূমি তথ্য বাতায়নের ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি তালিকা থেকে নেওয়া। এর বাইরে কেউ টাকা চাইলে তা সরকারি ফি নয়। কোর্ট ফি আবেদনের সময় দিতে হয়, আর ডিসিআর ফি দেওয়ার পর খতিয়ান আর ডিসিআর নামিয়ে প্রিন্ট করে রাখুন।
একটা উদাহরণ। সাথী বেগম মার্চে একটি প্লট কিনে রেজিস্ট্রি করলেন। মূল দলিল তখনো অফিসে, তাই তিনি দলিলের অবিকল নকল তুলে এপ্রিলেই ই-নামজারির আবেদন করলেন। শুনানির দিন মূল দলিলের রশিদ, নকল আর বায়া দলিল নিয়ে গেলেন। নামজারি মঞ্জুর হওয়ার পর নিজের নামের হোল্ডিংয়ে প্রথম বছরের খাজনা দিয়ে দাখিলা রেখে দিলেন। পুরো কাজ শেষ হলো মূল দলিল হাতে আসার আগেই।
প্রথম আলোর ১৯ জুন ২০২৬ তারিখের খবর অনুযায়ী ২০২৬-২৭ বাজেটে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের নামজারিতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ছিল। এটি চূড়ান্ত হয়েছে কি না, আবেদনের আগে ভূমি অফিসে জেনে নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জমি কেনার কতদিন পর নামজারি করা যায়?
জমি কেনার কতদিন পর দলিল পাওয়া যায়?
জমি কেনার পর নামজারি না করলে কী হয়?
জমি কেনার পর কি কি করতে হয়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।